Friday, November 20, 2020

অশ্রুবর্ণের কবিতা

ব্রাজিলে যেমন ফুটবল-সংস্কৃতি বাংলায় তেমনই কবিতা-কালচার। শতশত কবি, লক্ষ লক্ষ কবিতা। ২০২০-র বইমেলাতেই সহস্রাধিক বাংলা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে, এত এত রচনার মধ্যে মৌলিক-এর সন্ধান করতে গেলে সাধারণ পাঠকের সম্মুখে পেল্লাই খড়ের গাদা। পরিশ্রমী গবেষকদের কী দশা তা অবশ্য আমরা জানি না। শিয়ালদা মেইন-লাইনের ভিড়ের মত গায়ে গা সেঁটে থাকা বিষয়বস্তু, বাজার-চলতি ফ্যাশনের মত ছাঁচে ঢালা লিখনশৈলী। যেন বাঙালির চোখে চিনাম্যানদের মস্ত একটা মেলা। এরই মধ্যে দৈবাৎ এক-একটা অন্যরকম প্রয়াস, যা আনমনা পাঠককেও চমকিত করে দিতে পারে। হরপ্রসাদ সাহুর “আমার আমিকে বলি” তেমনই এক কাব্য-পুস্তিকা। 
            
            মাত্র দু-ফর্মার আয়তন, ক্রম-চিহ্নিত আটাশটি ছোটো-ছোটো লেখা। কবি হিসেবে হরপ্রসাদ সাহু প্রধানত রোম্যান্টিক, প্রেমই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। কিন্তু এই বইতে তিনি একেবারে অচেনা অবতারে। এতদিনের লেখালেখির সূত্রে তাঁর কলমে জমে ওঠা সুন্দরের সমস্ত সংস্কার চৌচির হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে। অবশ্য এই বইতে সৌন্দর্য নির্মাণের কোনও চেষ্টা করা হয়নি। নিজেকে আড়ালে রেখে হোমোজিনিয়াস ফ্ল্যাটবাড়ির মতো শব্দের কৃত্রিম ইমারৎ গড়ার বদলে এখানে হাজির করা হয়েছে নিজেরই ঘাম-রক্তমাখা হতশ্রী জীবন। কবিতা তো আসলে একটি বিশেষ ভাষা মাত্র। অধিকাংশ কবিতা-লেখক সারাজীবন ব্যাপী সেই ভাষার পরিচর্যা এবং অনুশীলনেই কাটিয়ে দেন, ভাষাটি ব্যবহার করে উঠতে পারেন না। হরপ্রসাদ পরিণত বয়সে এসে সেই ভাষাকে এবার কাজে লাগালেন। না, কোনও প্রতিবাদ বা পালটা মারের কথা নেই এখানে। অসহায় অপমানিত একজন মানুষ, যার চারপাশ থেকে আচমকাই সরে গিয়েছে সমস্ত বন্ধু ও নিকটজন, তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন। নিজেকে নিজেই ধুলো ঝেড়ে টেনে তুলছেন, চেষ্টা করছেন আবার সোজা হয়ে দাঁড়াবার। প্রসিদ্ধ জনপ্রিয় কোনও রাগের আলাপ নয়, হঠাতই শিল্পী যেন শোনাতে শুরু করেছেন নিজের দুঃখের কথা হতাশার কথা। এই পথেই তো আর্টের অঙ্গনের মধ্যে জীবনের জরুরি অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে। 
            
            অনুমান করা চলে, এই কবিতাগুলি রচনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অন্তত তিন বছর আগে, যখন প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর চারফর্মার কবিতাসংগ্রহ “এবং একটি গাধা” (২০১৭)। সে-বইয়ের পাতায় পাতায় ছিল নিজের প্রতি তীব্র শ্লেষ আর বর্তমান বইটিতে ছড়ানো রয়েছে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া নিজের জন্য সান্ত্বনা করুণা ভালোবাসা। পড়লে বোঝা যায়, কবিতাগুলি রচিত হয়েছে একটানা, হয়তো বা দুয়েক সপ্তাহ সময়সীমার মধ্যে, কোনও এক আবেগে আচ্ছন্ন অবস্থায়। কবি হিসেবে এ এক নতুন নিরীক্ষা হরপ্রসাদ সাহুর। এই বইয়ের ভাবগত একাগ্রতার উপমা খুঁজতে গেলে মনে পড়ে যায় সম্প্রতি প্রকাশিত জয় গোস্বামীর “মরীচিকা”-র কথা। আসুন পাঠক, আমরা একগুচ্ছ আনকোরা কবিতার উত্তাপ নিই। 

আমার আমিকে বলি/ হরপ্রসাদ সাহু, বাকপ্রতিমা, মহিষাদল, ২০২০, ৩২ পৃষ্ঠা, ৫০ টাকা।

Friday, November 13, 2020

একটি কিশোরী, তার হাঁস এবং অন্ধ চরাচর

দিনের আজ মাত্র দ্বিতীয় প্রহরেই, যেন অসময়ে জাগ্রত কামেচ্ছার মত, অন্ধ হয়ে এল চরাচর। আষাঢ় মাস। খালপাড়ে ঝুপসি হিজলগাছের তলায় অন্ধকার গভীরতর। দুপাশে কোমর সমান উঁচু ঘাস, মাঝখানে ঘোলা জলের উচ্ছল ধারা আর তার ওপর এসে নেমেছে হিজলগাছের আওতার পরত। দিগন্তের গ্রামগুলির সবুজ সীমারেখা ধোঁয়াটে আবছায়ার ভেতর ডুবে গেছে। জাম রঙের গুরুভার মেঘ ঝুলে নেমে এসেছে মাঠের ওপর। মাথার অতি নিকটেই যেন তার গুমোট শ্বাসবায়ু টের পাওয়া যায়। বিস্তৃত মাঠের অধিকাংশই জলমগ্ন, আউশধানের মাথা জেগে আছে কোনও কোনও জমিতে। আর চিহ্ন বলতে প্রায় নিমজ্জিত আলপথগুলির ওপর ভেসে থাকা গুচ্ছ নরম সবুজ কাঁটার মত ঘাসের ডগা। হঠাত চাপা গম্ভীর গুরুগুরু ধ্বনি বেজে উঠল দূর আকাশে। আর সেই ধ্বনির গা থেকে গড়ানো প্রতিধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে আরও ক্ষীণ হয়ে এল আলো। এমত সময়ে কাদের বাড়ির এতগুলি হাঁস হারিয়ে গেল? জলের ভেতর কোথাও কোনও বাঁধ নেই আজ। কত গৃহস্থের পুকুরডোবা ভেসে গেছে, ঘাটের জল মাঠের জল খালবিলের জল সব একাকার। ইতিউতি ঘাই দিচ্ছে পাড় ডিঙ্গিয়ে আসা রুইকাতলা। কই ল্যাটা সিঙ্গি মাগুর শোল এরা সব শ্রমজীবী অন্ত্যজ রমণীদের মত। খালে বিলে ধানক্ষেতে তাদের দর্শন পাওয়া কোনও বিশেষ ঘটনা নয়। কিন্তু রুই কাতলা মৃগেল যেন অভিজাত অন্তঃপুরচারিনী। তাদের দৈবাৎ চোখের নাগালে পেলে হাটুরে মানুষের দেহে মনেও রোমাঞ্চ লাগে। চার পাঁচ ছয় সাত, না আরও আরও, ঐ দূরে বুড়িডাঙ্গার দিকে আরও দুজন। গাঁয়ের তাক জানা লোকজন দুর্যোগের ভেতর মাছ শিকারে বেরিয়েছে আজ। তাদের হাতে হাতে চাবিজাল, কোমরে মাছ রাখার খালুই। হঠাত তাদের দেখলে একপায়ে দাঁড়ানো স্তিতধী বকের উপমা মনে আসে। চাবিজাল মানে আড়াই-তিন হাত ব্যাসের একটি বাঁশবাখারির বৃত্তের সঙ্গে আটকানো শঙ্কু আকৃতির জাল। আর ঠিক তাঁবুর মত করে বাঁশের তিনটি টুকরো ঐ বৃত্তের গায়ে সমদূরত্বে বাঁধা, এগুলি হাতল। দিগন্তবিস্তারী প্লাবিত প্রান্তরে ধ্যানমগ্ন নির্জনতা। এই কয়েকটি মানুষের উপস্থিতিতে তা বিঘ্নিত হয়নি, বরং আরও যেন স্থিতধর্ম। কারণ মানুষগুলি প্রকৃতির এই তমোরূপের সঙ্গে অব্যর্থভাবে লগ্ন হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের চারপাশে পর্যাপ্ত পরিসর, এবং এই পর্যাপ্ততা কোনোরকম দ্বন্দ্ব বা প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। মাঠের সংলগ্ন তিন-চারটি গ্রাম থেকে মাত্র এই কজন এমন অসাধারণ দুর্যোগ মাথায় নিয়ে শিকারে বেরিয়ে আসতে পেরেছে আজ। তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও প্রাণহীন নিশ্চল প্রস্তর মূর্তির মত মনে হয়। এমনিই নিষ্ঠা ও একাগ্রতা। এদিকে, এক, দুই, তিন, চারটি হাঁস ঘাসের জঙ্গল থেকে সার দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। অসম্ভব শুভ্র সুঠাম হাঁসগুলি, একে একে প্রকাশিত হতে যেন চারটি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল হিজলগাছের তলায়। কমলা রঙের সুচারু ঠোঁট ও পা-জোড়া। তাদের শরীরের সীমারেখায় আলোর চতুস্পার্শে বিচ্ছুরিত চোখধাঁধানো দ্যুতি। এমন অনুপম শ্রী বর্ণনায় ‘স্বর্গীয়’ শব্দটির ব্যবহার চিরকালের রীতি। হাঁসগুলি নিতান্তই নবীন এবং অবোধ, তাই এমন স্বচ্ছন্দ ও নির্ভয়। খালের স্রোতের বিপরীতে তারা সাঁতার দেয়, তাদের গতি আর জলের বেগ পরস্পর কাটাকুটি করে তাদেরকে মোটামুটি এক জায়গাতেই আটকে রাখে। ঘোলা জলের স্রোত বাড়ছে, আরও ঘন হয়ে আসছে আকাশের কালিমা। গুরুগুরু করে মেঘ ডেকে উঠল আবার, জোলো হাওয়া এক ধাক্কায় যেন দ্রুততর হয়ে উঠল। জীবনের এই প্রথম আষাঢ়, এই প্রথম প্লাবন, এই প্রথম সীমানা অতিক্রম করে আসা। জ্যোৎস্নার মত নরম নিষ্কলুষ এই আলো, উদার ভাবে জলকাদা অন্ধকার মাখা প্রান্তরে ফুটে উঠেছে। পালকগুলি অতিশয় তৈলাক্ত ও চিকন, তাই পিছলে যাচ্ছে প্লাবনের ক্লেদ। দূরবর্তী মানুষগুলি সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা দিতে যাওয়া বৃথা, কেননা তাদের বিষয়ে আপনারা অর্থাৎ এই আখ্যানের পাঠকবর্গ যথেষ্টই জানেন। তারা মোটামুটি মধ্য বয়সী, তবে কুড়ি-বাইসের এদিক ওদিক দুএকটি তরুণ অথবা ষাটোর্ধ এক-আধজন প্রবীণের উপস্থিতিও অস্বাভাবিক নয়। সবাই দক্ষ শিকারি, শিকারের নেশা তাদের রক্তের মধ্যে ঢেউ তোলে। নিজস্ব পুকুর-ডোবাও আছে অনেকের। তবে এই কূলহারা দুর্যোগের দিনে, অপরের ঘরে পালিত পুষ্টিপ্রাপ্ত মাংসের স্বাদই আলাদা। এরা সবাই যে খুব মাছমাংস পছন্দ করে এমন নয়। যেমন ঐ গোবর্ধন দাসের জমির কোনায় যে মানুষটি জাল হাতে দাঁড়িয়ে, বলরাম মণ্ডল, তার বয়স পঞ্চাশের ওপাশে। বাম চোখের দৃষ্টি তার অস্বচ্ছ। দুবছর হল মাছ-পেঁয়াজ ত্যাগ করে গলায় তুলসীর মালা নিয়েছে। তাছাড়া শেষের দিকে নাছোড় অম্বলের জ্বালায় বড্ড কষ্ট পাচ্ছিল সে। আমিষ ত্যাগের ক্ষেত্রে সেটাও একটা প্ররোচনা হতে পারে। তবে তার মাছ ধরার নেশাটি এখনও অটুট। আগে তার কথাবার্তা ছিল ভারী অমার্জিত আর অশ্লীল, এখন তাতে যুক্ত হয়েছে খানিকটা আরোপিত বিনয়। সুদের কারবারি রাধেশ্যাম দের বয়স বোঝা দায়, কারণ মাথার কেশ থেকে শুরু করে সারা অঙ্গের রোম প্রথম যৌবনেই পাক ধরে সাদা হয়ে গেছে। আর মেদ-মাংসহীন সিড়িঙ্গে চেহারা তার। বড় ছোট মিলিয়ে নিজেরই চার-পাঁচটি পুকুর, দুবেলা ভাতের সঙ্গে আঁশগন্ধ না হলে তার চলে না। নিজের বাড়িতে মাছের অভাব নেই তবু যে কী তাড়নায় সে এই দুর্যোগ মাথায় করে বেরিয়েছে তা সেই বলতে পারে। নাকি সেও বলতে পারে না? তবে শুধু মাছ নয় যেকোনো ধরণের মাংসর প্রতিই তার তীব্র লোভ। সে পাখপাখালি হোক ছাগল-ভেড়া হোক কি কাছিম। বিমল হাইতের বয়স গেল কিন্তু বাসনা গেল না। তার বউ ভারী শীতল প্রকৃতির মেয়েমানুষ, আর সে ছোঁক-ছোঁক করে বেড়ায় এপাড়া ওপাড়া। সারাদিন হতাশায় হাহুতাশ করাটা তার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। জগতের কিছুই যেন আজ আর তার রসনা তৃপ্ত করতে পারে না। নিন্দুকেরা বলে বিমলের সব চেয়ে বেশী অরুচি নাকি ফর্সা মেয়েমানুষে। একটি নারীঘটিত কারণে একবার তার বিঘে খানেক ধানি জমি জরিমানা হিসেবে লিখে দিতে হয়েছিল। যেখানে এই খাল গোটাকয়েক তাল-খেজুরকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে সেখানে ওঁত পেতে আছে মংলা মান্ডির ছোট ব্যাটা রিটু। রিটু একবার অভাবের তাড়নায় ব্রজ বেরার একটা ছাগলছানা চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়। সে আজ বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা, রিটুর তখন পনেরো চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স। বেধড়ক মার খেয়েছিল সে সেদিন। লোকে বলাবলি করেছিল, সাঁওতালদের ছেলে বলে এ যাত্রা টিকে গেল। এমন মার কোনও মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। সেই রিটু আজ হাট্টাকাট্টা যোয়ান, সুঠাম তেল চোয়ানো শরীর। তাকে দেখলেই এখন গড়পড়তা দুচারজন জন যুবকের বুক কেঁপে যাবে। রেল শহরে ট্রাকের মাল বওয়ার কাজ করে রিটু। আজ সকালে কাজে বেরোতে পারেনি বলে এই মাঠে এসেছে মাছের খোঁজে। এমন আরও কয়েকজন। সবার পরিচয় দিতে গেলে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তাছাড়া কিছুই তো আপনাদের অচেনা অজানা নয়। কারণ এই আষাঢ় এই চরাচর এই গাঁগেরস্থ সব সব আপনাদের সবার জীবনের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জীবন। ওদিকে, গ্রামের দিক থেকে জলে প্রায় তলিয়ে যাওয়া খালপাড় ধরে এগিয়ে আসছে, কাদের বাড়ির মেয়ে গো? সদ্য ফোটা পত্রমুকুলের মত একটি কিশোরী। তার হাঁসগুলি হারিয়ে গেছে এই অন্ধকার বাদল দিনে। প্রথমে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে নিজেদের ঘাট-ঘাটলা। তারপর পাড়াপড়শির পুকুরডোবা, গোয়াল, হাঁসমুরগির ঘর। কোথাও নেই, জীবনের চেয়ে অধিক প্রিয় হাঁসগুলি এমন নিঃসাড়ে গেল কোথায়। সকালে সূর্যোদয়ের ঠিক পরে পরেই ধূমল পর্দার মত বৃষ্টি নেমেছিল। একটানা প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা সময়। সেই সুযোগেই কি পালিয়েছে, নাকি চুরি হয়ে গেছে নিরীহ প্রানীগুলি। বাবা মা পই-পই করে নিষেধ করেছিল। ওসব জলের পাখি জলে জলেই আছে ঠিক কোথাও। তোকে এমন উতলা হতে হবে না। কোথায় খুঁজবি এই বানের দিনে। যদি কোথাও চলেই যায় তো যাক। আবার এনে দেব, এবার আর পাতিহাঁস নয়, রাজহাঁস। আরও সুন্দর আরও ফর্সা। এই দুর্যোগে তুই যাসনি মা, কথা শোন। তখনকার মত কথা শুনেছিল মেয়েটি। তারপর সুযোগ মত মা-বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মাঠের দিকে। কারণ তার মন বলছে হাঁসগুলি নির্ঘাত কুল হারা জলের লোভে এদিকেই চলে এসেছে। উঠোন পেরলেই আজ যেহেতু সবখানে জল, তাদের কি আর আনন্দের সীমা থাকার কথা। পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড় পেরিয়ে এলেই মাঠ। গ্রামের পাশ দিয়ে একটি সঙ্কীর্ণ সেচখাল বয়ে গেছে। কৃষিকর্মের দিনগুলিতে এই খালপাড় পথের ভূমিকা পালন করে। সেই পথই নিয়েছে মেয়েটি। গ্রাম ছেড়ে মাঠের মধ্যে বেরিয়ে আসতেই নতুন জগত। প্রান্তরের রং নীল ও কালো মেশানো ঘন সবুজ, থৈ থৈ সাদা জলতল আর তার ওপর উপুড় হয়ে আছে একটি ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশ। মেঘের বুকে মেঘের পিঠে মেঘের গায়ে গায়ে মেঘের পরত। এমন পটভূমিতে মেয়েটির বাসন্তী ফ্রক উজ্জ্বল ভাবে আঁকা হয়েছে যেন। সে এখন অনেক দুরের অবস্থান থেকেও দৃশ্যমান। ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জলরঙের স্বচ্ছ পর্দার মত সিক্ত বাসন্তী বর্ণের আচ্ছাদন ভেদ করে ফুটে উঠেছে তার অর্ধস্ফুট স্তনবৃন্ত। শুভ্র পায়ের পাতা জল মাখা ঘাসের ওপর দিয়ে সঞ্চারমান। ঘাসের ধারালো আগার স্পর্শ পায়ের তলা থেকে স্নায়ুপথ ধরে ছড়িয়ে পড়ছে শরীরময়। মনের একচ্ছত্র দুশ্চিন্তাকে ঠেলে সরিয়ে যৎকিঞ্চিত স্থান করে নিয়েছে রোমাঞ্চ ও বিস্ময়। সদ্য ঋতুমতি কন্যা সে, চারপাশে তার অপার নবীনতা। যেন সকালবেলার প্রথম আলোয় প্রতীয়মান দৃশ্যাবলী। তার চক্ষুদুটি আয়ত ও স্বপ্নালু, দুটি রোগা লাউডগার মত সবুজ হাত হাওয়ায় উন্মুখ। ফেব্রুয়ারির স্কুলে স্কুলে যে দেবী সরস্বতীর আগমন ঘটে তাঁর নির্মাণ বোধকরি এই কিশোরীর রূপের অনুসরণেই। কেননা তাকে দেখলে বলতে ইচ্ছে করে, তোর বীণা কই গো মেয়ে? (প্রথমাংশ)