Showing posts with label বিদ্যাসাগর. Show all posts
Showing posts with label বিদ্যাসাগর. Show all posts

Tuesday, October 1, 2019

মানুষের ধর্ম, মানবধর্ম, মানবতা...



ধর্ম মানে যদি ধরা হয় বৈশিষ্ট বা গুণাগুণ তবে মানুষকে নিয়ে খুব বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হওয়াই যুক্তিযুক্ত। আগুন আবিষ্কারের পর থেকে অতিক্রান্ত এতগুলি শতাব্দীর ইতিহাস থেকে মনুষ্য-প্রবণতার যদি কোনও কালানুক্রমিক রেখাচিত্র আঁকা যায় তবে তাতে কি কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন বা অবনমনের চিহ্ন পাওয়া যাবে? সম্ভবত না। যেহেতু মূলত জন্তু এবং পরবর্তীকালে ঘটে গিয়েছে অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উন্নতি ফলত মানুষের ধর্ম দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-ঘনত্বে এক ব্যাপক বিচিত্র এবং জটিল আকার ধারণ করেছে। বিবর্তনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করতে করতে মানুষ তার পশু-ধর্মের কিছুই ফেলে আসেনি বরং অর্জিত বিদ্যার প্রয়োগে সে হয়ে উঠেছে আরও দক্ষ ও ধুরন্ধর এক প্রাণী। জান্তব হিংসা পেয়ে গেছে প্রকাশিত হওয়ার অসম্ভব জোরালো সব প্রহরণ। সেকালে একটি ভারী ও ভোঁতা পাথরের আঘাতে যেখানে হয়ত একটি প্রাণ নাশ করা যেত আজ সেখানে একটি মাত্র অস্ত্রের প্রয়োগে নিশ্চিত ভাবে ধ্বংস করে ফেলা যায় একটি আস্ত মহানগর, একটি গোটা দেশ অথবা একটি গ্রহের সম্পূর্ণ জীবজগৎ। ক্রমশ সভ্য হয়ে ওঠার পথে এবং ধারাবাহিক বিদ্যাচর্চার মাধ্যমে মানুষ ধর্মের নিরিখে পশ্চাদপসরণ হয়তো করেনি তবে তার অগ্রগমন ও প্রায় শূন্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে চলার যে ধারণাটি আমরা মনের মধ্যে পোষণ করি তা আসলে এক প্রকার ভ্রান্তিবিলাস। কেননা, জিঘাংসা বা ধর্ষকামের মত প্রবণতাগুলি মানুষ এখনও পরিত্যাগ করেনি। আজও, মৃত্যুসম্ভাবনা আছে এমন খেলাধুলো বা বিনোদনে তার আগ্রহ সবিশেষ, গণপ্রহারে অংশগ্রহণ এখনও অনেককেই বেশ তৃপ্তি দেয়। ধর্ষণের ঘটনাক্রম বর্ধমান কি না তা পরিসংখ্যানবিদেরাই বলতে পারেন, তবে ধর্ষণে অক্ষম অথবা যার কপালে তেমন সুযোগ ঘটেনি অথবা সাধারণ ছাপোষা সফ্‌ট-পর্ণবিলাসীও যে সময়মত ধর্ষণ দেখতে উৎসাহী তা ইন্টারনেট অনুসন্ধানের কিছু সাম্প্রতিক তথ্য-বিশ্লেষণ থেকেই জানা যাচ্ছে। অতএব, কমপক্ষে দশ হাজার বছর অতিক্রম করে যদি মানুষের ধর্মীয় উন্নয়ন কণামাত্র না সংঘটিত হয়ে থাকে তবে তা আর কতকাল পরে সম্ভব হয়ে উঠবে?
          মানুষের ধর্ম কী সেবিষয়ে মানুষের স্পষ্ট ধারণা না থাকলেও তার ব্যপকতা নিয়ে খানিকটা আন্দাজ তো আছেই। একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষেরও এটুকু অন্তত জ্ঞান আছে যে প্রাণহীন বস্তুর মত সুনির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় ধর্ম তার নয়, এমনকি মনুষ্যেতর জীবজন্তুরও যে রকম পরিচয়বাহী সাধারণ কিছু চরিত্রচিহ্ন থাকে মানুষের ক্ষেত্রে তেমন কিছু নির্ণয় করাও অত্যন্ত দুরূহ অথবা অসম্ভব কাজ। এখন অভিধানে খোঁজ নিয়ে দেখা যাক কী লেখা হয়েছে ধর্ম বিষয়ে।
          জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সম্পাদিত “বাঙ্গালা ভাষার অভিধান”-এ (ইন্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস, ২০১৪) ধর্ম্ম = ধৃ + ম = যে সকলকে ধারণ বা পোষণ করে। প্রত্যেক জীব, বস্তু বা বিষয়ের নিজস্ব গুণ, যার অভাবে সেই সেই জীব, বস্তু বা বিষয়ের অস্তিত্ব থাকে না।... [শাস্ত্রে] ঈশ্বরাজ্ঞা যথাবৎ পালন, অপক্ষপাত বিচার ও সকলের হিতকরণ, যা প্রত্যক্ষাদি প্রমাণদ্বারা সুপরীক্ষিত, বেদবিহিত, ও সকল মনুষ্যের একমাত্র মানিবার যোগ্য। [সাম্প্রদায়িক] দেশ ভেদে জাতি বিশেষের পরকাল প্রভৃতির অলৌকিক পদার্থ বিষয়ক বিশ্বাস এবং উপাসনা প্রণালি religion.
রাজশেখর বসু সংকলিত “চলন্তিকা” (এম.সি. সরকার, ২০১১) অনুযায়ী ধর্ম হল— সৎকর্ম, সদাচার, পুণ্যকর্ম, কর্তব্যকর্ম (‘অহিংসা পরমো-’)। সমাজ হিতকর বিধি, law; সুনীতি, morality (‘-সংগত’)। পরম্পরাগত সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান বা বিহিত কর্ম (‘হিন্দু-, ক্ষত্র-’)। সাম্প্রদায়িক উপাসনা পদ্ধতি, সংস্কার রীতিনীতি এবং ঈশ্বর পরকাল ইত্যাদি বিষয়ক মত, religion (‘মুসলমান-, ব্রাহ্ম-, বৈষ্ণব-’)। সাধনারমার্গ। স্বভাব, গুণ, শক্তি(‘পশু-, কাল-, যুগ-। যৌবনের, অগ্নির-’)।…
          আবার কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী প্রণীত “বঙ্গীয় শব্দার্থকোষে” (ভাষাবিন্যাস, ২০১১) ধর্ম্ম হল– ১. ধৃ + ম (মন্‌) –কর্তৃবাচ্যে। ২. ধর্‌ মিতি মিত যাহাতে। ৩. শ্রেয়ঃ, শুভ অদৃষ্ট, পুণ্য, চতুর্ব্বর্গের একতম, আচার, শাস্ত্রদৃষ্ট কার্য্যমাত্র, সম্প্রদায় বিশেষের সাস্ত্রবিধি, ন্যায়, নীতি, স্বভাব, অসাধারণ গুণ, উপমা, অভিধেয় বস্তু, অহিংসা, যজ্ঞাদি,...
          তিনটি প্রায় প্রতিনিধি স্থানীয় অভিধানেই ধর্মের তিনটি প্রধান মাত্রা নির্দেশিত হয়েছে— প্রথমত, ‘ধর্‌ মিতি মিত যাহাতে’ ও দ্বিতীয়ত, ‘সৎকর্ম, সদাচার, পুণ্যকর্ম, কর্তব্যকর্ম’ ইত্যাদি এবং তৃতীয়ত, এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অথবা পার্শ্ববর্তী (অনেকে বলেন অত্যন্ত জরুরী হৃত-সংযোগ বা missing link, কেউ কেউ বলেন অর্থহীন, নিষ্প্রয়োজন false link) religion। এর মধ্যে প্রথমটি অসম্পাদিত এবং স্বাভাবিক; দ্বিতীয়টি নির্বাচিত তাই কৃত্রিম, কাল্পনিকও বটে; আর তৃতীয় মাত্রাটি মানুষের ওপর আরোপিত এবং আলোছায়াময় অদ্ভুতুড়ে। প্রথমটি মানুষের স্বভাব বা গুণ অর্থাৎ মানুষের প্রকৃত ধর্ম (ধর্মের এটিই ব্যাপক অর্থ)। এখন একে কি আমরা মনুষ্যধর্ম বলবো না কি মনুষ্যত্ব। মনুষ্যত্ব শব্দটি সাধারণত কিঞ্চিৎ উন্নততর অর্থে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া আরও একটি শব্দ আমাদের লেখায় কথায় বারবার ফিরে ফিরে আসে তা হল মানবধর্ম। মানুষ ও মানব শব্দ দুটি তো সমার্থক নয়, যেহেতু ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও মানব থেকে যায়’, তাই মনুষের ধর্ম ও মানবধর্ম নির্ঘাত ভিন্নবস্তু। আবার মানবতা শব্দটি যদি হয় humanism-এর বাংলা তর্জমা তবে তা অবশ্যই মানবধর্মের অদূর প্রতিবেশী কিন্তু সমার্থক নয়।
          মনুষ্যধর্মের সংকলন করতে বসলে (যা প্রায় একটি অসম্ভব কাজ) মাথায় রাখতে হবে একজন হিংস্র নরখাদক থেকে অহিংস নিরামিষাশী পর্যন্ত সব্বাইকে। এবং সেই সংকলন অদ্যাবধি সম্ভবপর না হয়ে উঠলেও মনুষ্যধর্মের আদি ও অন্ত যে কত সুদূর বিস্তৃত সে সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা রয়েছে। আমরা আমাদের রক্তলোলুপতা চিনি, দয়া চিনি; স্বার্থপরতা ও পরার্থপরতাও চিনি। একজন নৃশংস খুনি এবং কুশলী কীর্তন গায়কের মত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত স্বত্ত্বাকে নিজের মধ্যে লালন করে দিব্যি বেঁচে থাকা মানুষও আমাদের দেখা হয়েছে। দেখা হয়ে গেছে সুগায়ক অথচ শিশুপাচারকারী মানুষকেও। একই শরীরে দয়াবান ও ঘুষখোর, সমাজসেবী ও লম্পট মানুষও বড় দুর্লভ নয়। অসাধারণ কোনও জনহিতকর কাজ কিংবা অকল্পনীয় কোনও নির্মমতার খবর পেয়ে সাময়িক ভাবে হয়তো হতবাক হয়ে পড়ি কিন্তু অল্পক্ষণেই তা আমাদেরস্মৃতিতে সহজ হয়ে যায়। ফলত, বহু বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই মানুষ জানে কয়েকটি শব্দে কয়েকটি বাক্যে কিংবা কয়েক পৃষ্ঠার পরিসরে মনুষ্যধর্মের বর্ণনা সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। বরং বলা চলে মনুষ্যধর্ম একটি অপার সম্ভাবনাময় একটি ধর্ম। মানুষের ক্ষেত্রে ‘ধর্‌ মিতি মিত যাহাতে’ প্রস্তুত করা কোনও এক যুগের এক পণ্ডিতের কাজ নয়।
          মানুষের স্বভাব আংশিক হলেও আমাদের জানা কিন্তু সাধারণ ভাবে ধর্ম শব্দটিকে আমরা ব্যবহার করি চলন্তিকা বর্ণিত “সৎকর্ম, সদাচার, পুণ্যকর্ম, কর্তব্যকর্ম”-এর জন্য, অর্থাৎ সঙ্কুচিত অর্থে। এই প্রচলিত অর্থে মনুষ্যধর্মের ভগ্নাংশ মাত্রই কেবল বর্ণনা করা যেতে পারে। কোনও ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান জীবের কাছে মানুষের তথাকথিত ‘ধর্মে’র বিবরণ দিলে মানুষ নামের জীবটির পরিচয় অসম্পূর্ণই থেকে যায়। অথবা একটি জীবের মধ্যে এই ধর্ম তথা এই বাছাই করা গুণাবলীর সমন্বয় ঘটালেও সেটি মানুষ হয়ে ওঠে না। দয়া মায়া সংবেদনশীলতা কর্তব্যপরায়ণতা যদি মানুষের ধর্ম হয় তবে নৃশংসতা পরশ্রীকাতরতা অথবা বহুগামিতাও মানুষের ধর্ম। পরমতসহিষ্ণুতা এবং সাম্প্রদায়িকতা দুটিই মানুষের ধর্ম। উদার মানুষটির সমাজে বিশেষ সমাদর হতেই পারে কিন্তু মৌলবাদীকেও মানুষ হিসেবে মেনে নিতে হবে। ক্ষমা যেমন পরম ধর্ম, প্রতিশোধস্পৃহাও মানুষের ধর্ম। আমরা সকাল হলেই চারপাশে যেসব লোকজন দেখি তাদের সমস্ত আচার আচরণেরসমগ্রতাই ধর্ম। দুচারজন অভিধানকার বা দশ-বিষজন পণ্ডিত কী আদর্শ ধর্মের কথা বললেন তার কতটুকু প্রাসঙ্গিকতা আছে একজন দিনমজুরির শ্রমিক কিংবা একজন রুগ্ন হাড়হাভাতে পকেটমার কিংবা ডেন্ড্রাইট-খোর একজন হাপু খেলোয়াড় কিংবা কোনও এক পার্ট-টাইম গণিকার কাছে। এই সব মানুষের কাছে বেঁচে থাকার লড়াইটাই সবচেয়ে বড় ধর্ম। কে মানুষ আর কে অমানুষ তা কে বলে দেবে? কী তার বিচারের কষ্টিপাথর। মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ হতে পারে তবুও মানুষের ওপর কিছুতেই ভরসা করা চলে না। ‘দানব’ ও ‘দেবতা’-র মাঝখানে যে বিস্তীর্ণ উপত্যকা তার সবটুকু জুড়েই তার অবাধ বিচরণ।
          মানব শব্দের আভিধানিক অর্থটি অনাড়ম্বর, তবে মানুষের মৃত্যু হলেও যে মানব থেকে যায় তা নিছক ‘মনুপ্রণীত জীব’ হতে পারে না, অবশ্যই তার চেয়ে উন্নততর কিছু। সাধারণ ভাবে আমরা মানব বলতে তাদেরই বুঝি যারা বিশেষ ভাবে কীর্তিমান এবং সে-কারনে স্মরণীয় অথবা অবিস্মরণীয়। কিন্তু মানবের শ্রেণি নির্ণয় করলেও মানবধর্মের সংজ্ঞা সহজে নির্দিষ্ট হয় না। কেননা কবি মধুসূদন দত্ত অবশ্যই মানব কিন্তু তাঁরসুরাসক্তিকে তো আমরা মানবধর্মের অন্তর্ভুক্ত ধরে নিতে পারি না। অথবা, রামকৃষ্ণ বা তাঁর প্রধান শিষ্য বিবেকানন্দ অবশ্যই মানব কিংবা মহামানব কিন্তু তাঁদের সংস্কারাচ্ছন্নতা (এঁরা সংস্কারাচ্ছন্ন ছিলেন কিনা সে-তর্ক জুড়বার পরিসর এখানে নেই) নিশ্চয়ই মানবধর্ম নয়। ইউরোপ আমেরিকার বহু বিখ্যাত শিল্পী বা লেখকের জীবনী ও আত্মজীবনী পাঠ করে আমরা ভারতীয়রা চমকে উঠি (এদেশের কবি-শিল্পীদের তেমন জীবনী বা আত্মজীবনী লেখার অনভ্যেস তাই রক্ষে), কেননা তাঁরা কেউ ছিলেন জেলখাটা দাগী আসামী, কেউ চূড়ান্ত মদ্যপ আবার কেউ কেউ ছিলেন অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়পরায়ণ লম্পট। আসলে মানবধর্ম হল আমাদের কিছুবাছাইকরা (ইচ্ছাপূরণকারী, অনেকটা বাজারচলতি বলিউডি সিনেমার নায়কের চরিত্রের মত) গুনের একটিকাল্পনিক সমাহার। তেমন ধর্মে ধার্মিক আর কজন, দুয়েক শতাব্দীর বঙ্গদেশের ইতিহাসে হয়তো একটা ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। নিরদ-সি তাঁর বাঙ্গালিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও তাঁর মানবত্ব নিয়ে কারও কণামাত্র সংশয় আছে বলে শোনা যায় না। পুরাণ বা মহাকাব্যের ঈশ্বর-কল্পনাতেও যে কিছু কিছু ত্রুটি থেকে যায় ঈশ্বরচন্দ্রের চরিত্রে তেমন ত্রুটিও আর কোথায়? (আসলে ঈশ্বরের কল্পনায় যদিও সর্বাঙ্গসুন্দর একটি প্রতিমা নির্মাণের প্রচেষ্টা থাকে তবু তাতে মিশে যায় কল্পনাকারীর অর্থাৎ লেখক-পাঠক অথবা কথক-শ্রোতার কিছু কিছু নিজস্ব মুদ্রাদোষ। ফলে কোনও কোনও দেবতা হয়ে পড়েন খামখেয়ালী, অতিরিক্ত রাগী, লোভী, লম্পট ইন্দ্রিয়পরায়ণ, ধূর্ত এবং প্রতিশোধস্পৃহ। উদাহরণ- ঋগ্বেদের ইন্দ্রদেব) হ্যাঁ ত্রুটি বলতে মানুষটি নিশ্চিত ভাবেই দেবতাদের বর্ণনার মত সুঠাম ও শ্রীমান ছিলেন না। কিন্তু তাঁর হৃদয়ের উদারতা ও সংবেদনশীলতা সুন্দরের যে সুউচ্চ মান বেঁধে দিয়ে গিয়েছে সেখানে পৌঁছতে পারেন কজন? ফলত ইন্দ্রমিত্র প্রণীত “করুণাসাগর বিদ্যাসাগর” গ্রন্থটি হয়ে উঠেছে যে কোনো ধর্মগ্রন্থ বা মহাকাব্যের তুলনায় অধিক উপাদেয় টেক্সট। এখন সমস্যা হল বিদ্যাসাগর যে ধর্মের উপাসক সেই ধর্মের সমর্থক বা ধার্মিক যে শয়ে শয়ে মিলবে না তা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। অতএব এই ধর্ম কখনওই মানুষের ধর্ম নয়।
          তবে কি ধর্মের ঐ তৃতীয় মাত্রা তথা religion-ই মানুষের ধর্ম? কিন্তু তা কী করে হবে, religion তো গোষ্ঠীর ধর্ম। গোষ্ঠীর হিতাহিত, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, বংশবিস্তার ইত্যাদির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর মানবসমাজের কল্যাণের চিন্তা করবার অবসর তার কোথায়? অনেকে বলেন এবং অনেকে তা শুনে বিশ্বাসও করেন যে religion-ই মানুষকে মানবধর্মের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ইতিহাসে তেমন উদাহরণ আমরা কবে দেখেছি (বাল্মীকির মত কিছু কাল্পনিক চরিত্রের কথা ছেড়ে দিলে এই নশ্বর পৃথিবীতে যে গুটিকয় দৃষ্টান্ত মেলে তাদের ব্যতিক্রম ধরে নেওয়াই কর্তব্য)? Religion কেবল দেশে দেশে ক্রুসেডের ধিকিধিকি অগ্নিতে অব্যর্থ ইন্ধন যুগিয়ে এসেছে চিরকাল। সমাজে সংসারে নিয়ে এসেছে সন্দেহ আর প্রতিহিংসার বাতাবরণ, সাধারণ মানুষের মনে বুনে দিয়েছে বিদ্বেষের বিষ। আসলে, religion তো মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম নয়, মন্দির বা চার্চ বা মসজিদ থেকে মানুষের ওপর আরোপ করা কিছু নীতি-নিয়ম, বিধি নিষেধ। এই ধর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানুষের কোনও হাত নেই কেননা তা জ্ঞানলাভের বহু পূর্বে তার ওপর বংশানুক্রমেই আরোপিত (স্মরণে আসতে পারে জয়ন্তানুজ বন্দ্যপাধ্যায়ের “আঠারোর আগে ধর্ম কেন” প্রবন্ধটির কথা)। অথচ সেই এলোপাথাড়ি ভাবে পাওয়া ধর্মের উত্তরাধিকার নিয়েই আমাদের কত আবেগ কত অভিমান কত আস্ফালন কত অহংকার কত উদ্বেগ কত প্রতিহিংসা। প্রতিটি ধর্মের প্রকাশিত ইশতেহারে সাজানো থাকে বছাবাছা মনোহরণ সমস্ত কথা। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা দেখি তাদের আদর্শ এবং বাস্তব আচরণের মধ্যে থেকে যায় বিস্তর ব্যবধান। শেষ পর্যন্ত সম্প্রদায়গুলি হয়ে ওঠে এক একটি জনপ্রিয় (স্পোর্টিং-স্পিরিট বর্জিত) স্পোর্টিং ক্লাবের মত, আর ধর্মগুলি হয়ে পড়ে তাদের জার্সি। সম্প্রদায়ভুক্ত সাধারণ মানুষেরা যতটা না ক্রীড়ামোদী (ভালোভাবে ফুটবল বা রাগবি বুঝতেও তো এলেম লাগে) তার চেয়ে বেশি দাঙ্গাপ্রিয় সংকীর্ণমনা ‘হুলিগান’। শতাব্দ বা সহস্রাব্দের ব্যবধান আর ভক্তকুলের নিরন্তর ভক্তি-সিঞ্চিত গুণকীর্তনের ফলে ধর্মগুরুরা একদিন রক্তমাংসের মানুষ থেকে স্বর্গের দেবদূত, দেবনন্দন অথবা স্বয়ং দেবতায় পরিণত হন। কিন্তু তবু এত সংঘবদ্ধ আয়োজনের মধ্যেও প্রকাশিত হয়ে পড়ে ধর্মগুরুটির চরিত্রের নানা দুর্বল দিক (উদাহরণত, হিন্দুদের আদি শঙ্করাচার্য যে খুব মহাত্মা ছিলেন না তা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। শাস্ত্রীমশাই লিখছেন- “শঙ্করাচার্য বিষয়ে কতকগুলি লোকায়ত কুসংস্কার আছে। ... প্রথম কুসংস্কার এই যে তিনি একজন সমাজসংস্কারক, কেহ তাঁহাকে বুদ্ধের সহিত, কেহ চৈতন্যের সহিত, কেহ লুথারের সহিত, কেহ অন্যান্য প্রসিদ্ধ সংস্কারকদিগের সহিত তুলনা করিয়া থাকেন। বাস্তবিক তিনি সমাজসংস্কারক ছিলেন না। পূর্বোক্ত মহাত্মাগণের সহিত তুলিত হইবার তাঁহার কোনো অধিকার নাই। তাঁহার হৃদয় অতি ক্ষুদ্র, স্বার্থপর ও উদারতাবিরহিত।” অথচ ‘শঙ্করদিগ্বিজয়’বা ‘শঙ্করবিজয়’ সহ বহু জীবনীগ্রন্থ রচনা করে সেই অষ্টম শতাব্দী থেকে তাঁকে দেবত্বদানে কম চেষ্টা তো তাঁর চেলাচামুণ্ডারা করেন নি।)। প্রচার প্রসার উপস্থাপনায় কোনও খামতি না থাকলেও তথাকথিত অবতারদের জীবনী বা বানীর সংকলন প্রায়শই শিক্ষিত ও মেধাবী মানুষের জরুরী পাঠতালিকার বাইরেই থেকে যায়। সুতরাং religion নিয়ে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের অশেষ আগ্রহ থাকতে পারে কিন্তু তা কখনওই আহার-নিদ্রা-মৈথুনের মত তার দৈনন্দিনের অনিবার্যতা নয়। ধর্মীয় নিদানগুলি যে সে খুব স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে পালন করে তা নয়, কখনও তেতো গেলার মত করে কখনও সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়ে আবার কখনও একান্তে অমান্য করে বজায় থাকে সাধারণের ধর্মাচরণ। মানুষের এই প্রকৃতির ধর্মবোধ তখনই জেগে ওঠে যখন অন্য কোনও ধর্মের সঙ্গে তার স্বধর্মের দ্বন্দের পরিস্থিতি উপস্থিত হয় (ঠিক যেমন যুদ্ধ-পরিস্থিতিতেই কেবল জনগণের হৃদয়ে দেশপ্রেমের বাঁধভাঙ্গা লহর বয়ে যায়, অন্যসময় ভূখণ্ডটিকে লাগামছাড়া দুর্নীতি রাহাজানি সন্ত্রাস বলাৎকারে ভরিয়ে নরক করে রাখতে কারও কণামাত্র সঙ্কোচ হয় না)। আসলে এই ধর্মে ধর্মে দ্বন্দই ধর্মগুলির প্রধান ঝাল-মশলা, নাহলে তো নিষ্ঠাবান ধার্মিকের জীবন আলুনি হয়ে যায়। স্বধর্মের মানুষের প্রতি মানুষের অনুরাগ নয় বরং বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মাচরণ। শেষপর্যন্ত religion মানুষের মৌল ফ্যাশনের পোশাকআশাক, গায়ের চামড়া কখনও নয়।
          এবার শেষ পর্যন্ত আমারা এসে থামি মানবতা বা Humanism শব্দটির কাছে। Humanism শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ humanitas থেকে, এবং ইংরেজি অভিধানে এর প্রবেশ উনিশ শতকে। ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা’ শব্দটির সংজ্ঞা দিচ্ছে- “Humanitas meant the development of human virtue, in all its forms, to its fullest extent. The term thus implied not only such qualities as are associated with the modern word humanity—understanding, benevolence, compassion, mercy—but also such more assertive characteristics as fortitude, judgment, prudence, eloquence, and even love of honour.”
ব্রিটানিকা-র দেওয়া সংজ্ঞা মেনে নিলে মানবতাবাদী হিসেবে আমাদের সম্মুখে ভেসে উঠতে পারে অনেক নাম, অবতার ধর্মগুরু সমাজসংস্কারক কবি শিল্পী মনিষী সবাই পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান করতে পারেন ‘মানবতা’ শব্দটির ছায়ায়। প্রায়শই আমাদের এই ভ্রান্তি ঘটে যায় হিউম্যানিজম ও হিউম্যানিটি শব্দদুটির অর্থবিভ্রাটের কারণে। তবে এই সংজ্ঞার তুলনায় humanism শব্দটির অনেক বেশি লক্ষ্যোন্মুখ বিবরণ পাই আমরা নিম্নপ্রদত্ত, যথাক্রমে ‘অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’ এবং ‘উইকিপিডিয়া’ থেকে নেওয়া উদ্ধৃতি দুটিতে। “a system of thought that regards people as capable of using their intelligence to live their lives, rather than relying on religious belief.” এবং “Humanism is a philosophical and ethical stance that emphasizes the value and agency of human beings, individually and collectively, and generally prefers critical thinking and evidence (rationalism and empiricism) over acceptance of dogma or superstition.” 
শব্দটি আরও স্পষ্ট হয়ে যায় “মানবতন্ত্রের ভূমিকা” প্রবন্ধে শিবনারায়াণ রায়ের স্বভাবসুলভ ধারালো বক্তব্য থেকে— “... এদেশে বিস্তর ব্যক্তি আছেন তাঁরা নিজেদের মানবতন্ত্রী বা হিউম্যানিস্ট মনে করেন এবং বলে থাকেন, কিন্তু তাঁরা নাস্তিক অথবা প্রকৃতিবাদী নন। উপনিষদ, বেদান্ত, তন্ত্র ও যোগশাস্ত্রের প্রবক্তাদের থেকে কবীর, দাদু, শ্রীচৈতন্য, সুফি, বাউল মায় রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ পর্যন্ত সকলেই এঁদের কাছে মানবতন্ত্রের সাধক। শব্দ নানা রকমের অত্যাচার সয় এবং যে সমাজে শিক্ষিতজনও অপরিচ্ছন্ন ও বিশৃঙ্খল চিন্তায় মোটামুটি অভ্যস্ত সেখানে এই ধরণের বলাৎকার ঠেকানো কঠিন।”
তাহলে মানবতা কী? যেখানে ‘মানুষই মনুষ্যত্বের একমাত্র উৎস’, ‘মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যবিধাতা’। মানবতা হল মানুষের নিজস্ব মেধা মনন ও দক্ষতার বলে তার অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার সার্থক বিকাশ। মানবতাবাদীই বা কারা? শিবনারায়ণের মতে ভারতীয় চিন্তার ইতিহাসে যেমন মানুষের খোঁজ বড় একটা মেলে না, এবং পশ্চিমে মেলে। যেমন লুক্রেশিয়াস (Titus Lucretius Carus), দিদরো (Denis Diderot), মার্ক্স, রাসেল প্রমুখ।
বর্তমান রচনাটির জন্য মানবতার অধিকতর ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন। এইটুকু স্পষ্ট যে যে ধর্ম মার্ক্সের রাসেলের সেই ধর্ম সাধারণ মানুষের হতে পারে না। এই ধর্মে অটল বিশ্বাস রাখার জন্য যে সুগভীর আত্মপ্রত্যয়ের প্রয়োজন তা কত শতাংশ মানুষের আছে বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সেবিষয়ে বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। রাসেলের নাম শুনেছে এমন মানুষের সংখ্যা নগণ্য, যারা নামটি শুনেছে তাদের বেশির ভাগ তাঁকে বেশ শ্রদ্ধা-সম্ভ্রম করে এবং অতি সামান্য শতাংশ তার মতামত জীবনে পরখ করে দেখার সাহস রাখে। রামভক্ত গান্ধীজীর মতামত যদি এই ভক্তিভাবাপন্ন দেশে ছিন্নপোস্টারের মত হেলাফেলা হতে পারে তাহলে রাসেলের কঠোর যুক্তিবাদ কতটা সমাদর পাবে তা সহজ অনুমেয়। অন্যদিকে মার্ক্সের নাম (প্রায় হরিনামের মত) মানুষের না শুনে উপায় নেই, কারণ দেশে-দেশে তাঁর মতাবলম্বী অথবা তাঁর ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সংখ্যা অগণন। সম্প্রদায়গুলির মধ্যে খুব সদ্ভাব রয়েছে বলেও শোনা যায় না, মার্ক্সের ‘ইমেজটি’কে (পৌত্তলিকতা আর কাকে বলে?) মাঝখানে রেখে চুলচেরা তর্ক বিশ্লেষণ তো চলেই, এমনকি হাতাহাতি খুনোখুনি থেকে দাঙ্গাহাঙ্গামার ঘটনাও খুব বিরল নয়। মার্ক্সবাদী দলগুলি কে কতদূর নিষ্ঠাবান খাঁটি তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কযুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে কোনও পক্ষ কখনও চূড়ান্ত দক্ষিণপন্থী দলের আওতায় গিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে এমন ঘটনাও আমাদের সুপরিচিত। কিন্তু ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী শেষপর্যন্ত মার্ক্সের মতবাদ মানুষ বাতিল করেছে, বা বলা ভাল অতখানি গুরুপাক সাধারণের মগজে সয় নি। প্রায় আট-নয় দশকের অবিরাম মার্কসবাদ অনুশীলন ও যে মানুষের সহজাত ধর্মে কোনও আঁচড় কাটতে পারে না তা প্রমানিত হয়ে গেছে। গান্ধীর অহিংসা ও সত্যাগ্রহ এবং মার্ক্সের সমাজতন্ত্র জনসমাজে যত্নের সঙ্গে অবহেলিত এবং সশ্রদ্ধচিত্তে পরিত্যক্ত ও অপসারিত। মানবতাবাদী স্বয়ং মার্ক্সের যদি এই পরিণতি তবে মানবেন্দ্রনাথের ‘র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিজমে’-র যে দশা হতে পারে তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। শিবনারায়ণ রায় কর্তৃক প্রচারিত মতবাদটির অনুরাগীর সংখ্যা নিশ্চিত ভাবে কমলকুমার বা অমিয়ভূষণের পাঠকসংখ্যার চেয়েও কম।
তাহলে মানুষ কী করে, কোথায় যায়? মানুষ নিজের ভেতরেই বুঁদ হয়ে থাকে, মানুষ তার মৃত্যু অভিমুখী জীবনের পথটিতে হেঁটে চলে। একদিকে অধিগত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অন্যদিকে সহজাত স্ব-ভাব তার চলার পথের পাথেয়। তার পথ প্রায়শই মনিষী মহাপুরুষ নির্দেশিত আদর্শ পথ থেকে দূরে সরে যায়। অবতার বা ধর্মগুরু তাকে মুক্তির পথ বাতলে দেয় আর সে বন্ধনের ভেতরেই শান্তি খুঁজে খুঁজে মরে। পণ্ডিত যুগপুরুষেরা রচনা করে দিয়ে যান ভালো থাকার মন্ত্র, শিখিয়ে দিয়ে যান সমাজে ন্যায় ও সাম্য প্রতিষ্ঠার কৃতকৌশল। মানুষ সে মন্ত্র কানে নেয় না অথবা কানে নিলেও ভুলে যায়, অবহেলায় হারিয়ে ফেলে সুখশান্তির চাবিকাঠি। মানুষ আরও সুন্দর আরও উন্নত হয়ে উঠতে চায় কিন্তু ভালো হওয়া তার হয় না। মানুষ আর ফিরে যেতে চায় না সেই বোধবুদ্ধিহীন পশুত্বের অবস্থাতে তবু মাঝে মাঝে যেন অনিবার্যভাবেই তার পদস্খলন ঘটে যায়। আসলে বিদুরের অশ্রু মানুষের আকুলতা, গান্ধীর সত্যাগ্রহ তার কল্পনা, মার্ক্সের সমাজ তার স্বপ্ন। মানুষের সেই আকুলতা চিরকালব্যর্থ হয়ে যায়, নির্মম ভাবে ভেঙ্গে যায় তার স্বপ্ন।   
তাহলে মানুষের ধর্ম কী? আসুন আমরা এই বিষয়ে মেদিনীপুরের একজন খেতমজুর, সুন্দরবনের একজন মাঝি, দৈবাৎ দলে ভিড়ে যাওয়া এবং বেরোতে না পারা একজন ছুটকো মস্তান, পরিত্যক্ত একজোড়া অশক্তমা-বাবা, প্রায় বয়ঃসীমা ছুঁয়ে ফেলা একজন শিক্ষিত বেকার, মেয়ের বিয়ে দিতে না পারা একজন বিধবা অথবা জীবনে বারংবার ব্যর্থ অপমানিত একজন মানুষের সঙ্গে আলাপ করি। ওরাই জানেন মার খেতে খেতে ঘুরে দাঁড়াবার কায়দা, পড়ে যেতে যেতে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াবার মনের জোর। নিরানব্বই ভাগ সততার সঙ্গে একভাগ চালাকি মিশিয়ে জীবনে টিকে যাওয়ার খেলা ওদের চেনা। ওরাই পারেন অন্ধকারে তলিয়ে যেতে যেতে আচমকা দশদিক উদ্ভাসিত করে জ্বলে উঠতে। ওরা জানেন পায়ে পায়ে পেতে রাখা ভুলের ফাঁদ, ফাঁদে পা ফেলা, আবার কখনও সেসব এড়িয়ে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল। একজন সংসার ত্যাগী সন্ন্যাসী বা একজন আত্মমগ্ন পণ্ডিত জীবনের কতটুকুই বা জানেন! তাই তাঁদের রচিত ধর্মের অভিধান অসার ও কাল্পনিক হতে বাধ্য। মানুষের ধর্মে কেবল মানুষের জীবন যাপন করতে করতেই দীক্ষিত হওয়া সম্ভব।

Wednesday, September 18, 2019

বিদ্যাসাগরের ধর্ম ও আমরা


শ্রীনিরদচন্দ্র চৌধুরীর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় (রবিবাসরীয় নিবন্ধ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ জুলাই ১৯৮৮) ঠাঁই জোটে নি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। এই নির্বাচন যে বাঙালি মননে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল এবং ফলস্বরুপ শ্রী চৌধুরীকে যে কত ক্রোধমিশ্রিত সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল তা আমরা সবাই জানি। এই নির্বাচনের ছ’বছর পর একই পত্রিকায় প্রকাশিত (১ ও ৮ মে ১৯৯৪) অন্য দুটি নিবন্ধে শ্রী চৌধুরী কিছুটা যেন কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়াস করেন। তবে নির্বাচনের যথার্থতার প্রমাণ স্বরূপ তিনি যে কারণ গুলি উপস্থিত করলেন তার মধ্যে কয়েকটি অতি মামুলি, হাস্যকরও বটে। যেমন বঙ্গীয় ভট্‌চাজ পণ্ডিতদের মত বিদ্যাসাগরের ভুঁড়ি ছিল না; তিনি বঙ্গসমাজে তখনও অপ্রচলিত একটি কাজ-- নিজস্ব একটি লাইব্রেরী বানিয়েছিলেন; তাঁর চরিত্রে ‘আদর্শপরায়ণতা’, ‘কর্তব্যপরায়ণতা’, ‘নীতিপরায়ণতা’-র মত গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল, যে ধারণাগুলি নাকি (নিরদ সি-র মতে) ইংরেজি শিক্ষার ফলে এদেশে আমদানি হয়েছিল, এবং শব্দগুলি ছিল বাংলায় অপ্রচলিত, ইংরেজির অনুবাদ। যাই হোক, এই কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ে বিদ্যাসাগরের মহত্ব তথা শ্রেষ্ঠত্ব তিনি মেনে নিতে বাধ্যই হয়েছিলেন। বাঙালিদের সঙ্গে আরও যে ব্যাপারটিতে মৌলিক মতভেব ছিল বিদ্যাসাগরের, অথবা অন্যভাবে বললে যা ছিল প্রধান প্রভেদ, তা হল তাঁর ধর্মমত ও ঈশ্বরভাবনা। নিরদ সি এই বিষয়ে বিশেষ বাক্যব্যায় করেন নি (নাকি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন?), অন্য প্রসঙ্গে লিখিত একটি বাক্যে উল্লেখ টুকু আছে মাত্র। কিন্তু এই বিশেষ গুণটিই হতে পারত তাঁকে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার এক মস্ত অজুহাত।  
আজও সাধারণের মধ্যে বিদ্যাসাগরের অলৌকিক দয়া অথবা অবিশ্বাস্য সংবেদনশীলতা নিয়ে আলোচনা কিছুতেই শেষ হয় না। বিধবা বিবাহের প্রচলন, বহু বিবাহ রদ, নারী শিক্ষার প্রসার, কিংবা আদি বাংলা গদ্যের পরিকাঠামো রচনার মত বহু-চর্চিত বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা করতে আমরা অক্লান্ত। তাঁর ধর্মমত অথবা ঈশ্বরবিশ্বাস বিষয়ক প্রশ্নগুলিই বরাবর থেকে গিয়েছে আমাদের অভ্যস্ত মনোযোগের বাইরে। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের চিন্তাভাবনাকে এড়িয়ে চারিত্রিক দৃঢ়তা, অনমনীয় জেদ, অক্লান্ত কর্মতৎপরতা, সর্বোপরি মানুষের প্রতি তাঁর অপার করুণার মূলে নিহিত শক্তির সন্ধান সম্ভবপর নয়। সমসাময়িক মুষ্টিমেয় উদারপন্থী হিন্দু তাঁকে হিন্দু ভেবে আহ্লাদিত হয়েছেন, সংখ্যাগুরু গোঁড়ারা কেউ বলেছেন খ্রিষ্টান কেউ দেগে দিয়েছেন ব্রাহ্ম বলে, ওদিকে আবার ব্রাহ্মরা তাঁকে সতীর্থ বলে মেনে নেন নি। আর ঈশ্বরচন্দ্র একটি প্রায় নির্জন ধর্মমতের উপাসক হয়ে ক্রমাগত একা হয়ে পড়েছেন।
          ঈশ্বর ও ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের রচনা বা বক্তব্য খুবই বিরল, অথবা বলা চলে তিনি এই প্রসঙ্গে বরাবর নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। এবং সেকারণে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীকার বিহারিলাল সরকার প্রশ্ন তুলেছেন-- “অধ্যাপকের বংশে জন্ম লইয়া, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান হইয়া, হৃদয়ে অসাধারণ দয়া, পরদুঃখকাতরতা প্রবৃত্তি পোষণ করিয়া হিন্দু শাস্ত্রের প্রতি, হিন্দু ধর্মের প্রতি তিনি আন্তরিক দৃষ্টি রাখিলেন না কেন?” নানা সময়ে নানা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতামত বিচার করলে তাঁকে ঈশ্বর অবিশ্বাসী বলে মনে হয় না। কিন্তু জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে নিয়ে মাতামাতি যে তিনি পছন্দ করতেন না তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘বোধোদয়’-এর প্রথম সংস্করণে নানা পার্থিব বিষয় নিয়ে শিশুপাঠ্য রচনা থাকলেও ঈশ্বর সংক্রান্ত কোনও কথাই ছিল না। ছিল না প্রত্যাশিত ভাবেই, কেননা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক যেখানে আলোচনার বিষয়, ঈশ্বর প্রসঙ্গ তো সেখানে অপ্রাসঙ্গিক হবেই। প্রথম সংস্করণ দেখে বিদ্যাসাগরের অনুরাগী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এই বলে মৃদু সমালোচনা করেন যে, “মহাশয়, ছেলেদের জন্য এমন সুন্দর একখানি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিলেন, বালকদের জানবার সকল কথাই তাতে আছে, কেবল ঈশ্বর বিষয়ে কোন কথা নাই কেন?” এই মতামতের প্রেক্ষিতে পরের সংস্করণে ঈশ্বর বিষয়ক একটি ক্ষুদ্র অংশ সংযোজন করে দেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত একটি ব্যতিক্রম মাত্র, সারাজীবন তিনি ঈশ্বর প্রসঙ্গ বা ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্ন এড়িয়েই থেকেছেন বলা চলে। রামকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান সহকারেই আপ্যায়ন করেছেন, ব্রহ্ম বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা শুনে নিজের মুগ্ধতাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রামকৃষ্ণকে কথা দিয়েও তিনি দক্ষিণেশ্বরে যান নি, পরে তাই নিয়ে রামকৃষ্ণ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাছাড়া, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করতে গিয়ে আরও দুয়েকবার রুঢ় ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন রামকৃষ্ণ, যা স্মরণ করলে আজ তাঁর ভক্তরাও অস্বস্তিতে পড়বেন (দ্রষ্টব্য শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত)। যাক, সেবিষয়ে আলোচনা করা এই নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। আসলে দুস্থ অসহায় মানুষের কল্যাণ সাধনের যে ব্রত পালনে ব্রতী হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, ঈশ্বর চিন্তায় মেতে উঠলে তাঁর সেই সাধনা ব্যহত হতে পারত। তাঁর কাছে দুস্থ অসহায় হতদরিদ্র মানুষ গুলিই ছিল ঈশ্বর। সম্মুখে উপস্থিত সেই শতশত ঈশ্বরকে উপেক্ষা করে পরম ব্রহ্মের উপাসনায় নিয়জিত হতে তাঁর মন সায় দেয় নি। বিদ্যাসাগরের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায় তিনি প্রায়ই কেঁদে উঠছেন, অসহায় দীনদরিদ্র দুস্থ সংস্কারের শৃঙ্খলে বন্দী মানুষের কষ্টে সেই আপাত কঠোর দৃঢ়চেতা মানুষটি কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছেন না। যিনি দুঃখীর দুঃখে এমন ভাবে অস্থির কাতর, সহায়হীনের জন্য যার হৃদয়ে এতখানি করুণা, তিনি আর কী ঐশ্বর্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে নতজানু হবেন? আসলে মানুষই ছিল তাঁর কাছে সাক্ষাৎ ঈশ্বর, আর মানুষের কল্যাণের জন্য করা কর্মই ছিল তাঁর ধর্ম।
          ঈশ্বর বিষয়ে একান্ত নিজস্ব নিভৃত একটি মতামত থাকলেও ধর্ম বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন প্রচ্ছন্ন বিপ্লবী।  তাঁর অনুরাগী কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁকে বর্ণনা করেছেন একজন নাস্তিক রূপে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বলেছেন ‘অজ্ঞেয়বাদী’। তিনি একবার এক কাশীবাসি ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন যে তিনি কাশী মানেন না, বিশ্বেশ্বরও মানেন না। বেদ-বেদান্তে তাঁর তেমন আস্থা ছিল না, তিনি এগুলিকে বলেছেন “ভ্রান্ত দর্শন”, (“That the Vedanta and Sankhya are false system of philosophy is no more a matter of dispute”)। সংস্কৃত কলেজের পুনর্গঠন সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠাতে গিয়ে তিনি লেখেন, “True is that the most parts of the Hindu system in philosophy do not tally with the advanced idea of modern times.” এবং তাই তিনি সুপারিশ করেন এই কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য দর্শন পঠনপাঠনেরও সুযোগ ছাত্রদের দেওয়া উচিৎ। যাতে ছাত্ররা হিন্দু ধর্মের দোষত্রুটি গুলিও চিহ্নিত করতে পারে। তৎকালীন সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত হতাশ। তিনি তাঁদের তুলনা করেছেন সেই খালিফার সঙ্গে যার নির্দেশে একদা আলেকজান্দ্রিয়ার মহামূল্যবান লাইব্রেরিটি ধ্বংস করা হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের কথায়—“I regret to say that I cannot persuade myself to believe that there is any hope of reconciling the learned of India to the reception of new scientific truths”। এক্ষেত্রে learned বলতে সনাতন পণ্ডিত সামজের কথাই বলা হয়েছে।
সেই যুগে বিদ্যাসাগর ছিলেন নির্মোহ যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একজন বিরল প্রজাতির মানুষ। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সেকুলার। এ প্রসঙ্গে গোপাল হালদার লিখেছেন, “এ দেশে ধর্ম বলতে যা বোঝায়, এবং ধার্মিক লোকেরা ঈশ্বর বলতে যা বঝেন—বিদ্যাসাগর তাতে আস্থা রাখতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল মানবিক ধর্মে। … বিদ্যাসাগরের সমস্ত জীবনের মধ্য দিয়ে আমরা এই মানবধর্মেরই স্বীকৃতি দেখতে পাই—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ আর এ ‘মানুষ’ চণ্ডীদাসের আধ্যাত্মিক মানুষ নন, আধুনিক সভ্যতার সামাজিক মানুষ।” মাইকেল মধুসূদন বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর হলেন “প্রথম মানুষ”। নবজাগরণের কালে বাংলায় যে যুক্তিবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্যাসাগর ছিলেন তার অন্যতম প্রধান পুরোহিত। তাঁর কঠোর যুক্তিবাদ ও তীক্ষ্ণ মেধা তাঁকে সমাজ সংস্কারের বৈপ্লবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রাণিত করেছিল। সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের মত সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা যদি তাঁর থাকত তবে তিনি প্রবল তেজস্বী সংস্কারক হয়ে উঠতে পারতেন না। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম যুগের একজন মানবতাবাদী। বলা চলে, ঈশ্বর ও প্রথাগত ধর্ম বিষয়ে নীরব ও উদাসীন ছিলেন বলেই তিনি তাঁর অভীষ্টে পৌঁছতে পেরেছেন। তাঁর আগে ভারতবর্ষে সনাতন হিন্দু ধর্ম ছিল, বেদ-বেদান্ত ছিল, সেসব দর্শনের সটীক ব্যাখ্যা প্রদানকারী মেধাবী হিন্দু পণ্ডিতও ছিলেন অগণন। কিন্তু কেউ অনুভব করেন নি অকাল-বিধবা একটি রমণীর দুঃখ যন্ত্রণা অসহায়তার কথা, কেউ মাথা ঘামান নি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বা তা প্রচলনের উপায় নিয়ে, কারও মনে হয়নি বহুবিবাহ আসলে কোনও মহৎ কর্ম নয় একটি মূর্তিমান অভিশাপ যার হাত থেকে সমাজকে আশু মুক্ত করা প্রয়োজন। তথাকথিত এক নাস্তিক পণ্ডিতের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল এইসব যুগান্তকারী বিপ্লবের সম্ভাবনা। অতএব একথা কি বলা যায় না যে, ভারতবর্ষের মত একটি অশিক্ষা কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা ভূখণ্ডের পক্ষে নাস্তিকতাই অধিক প্রয়োজনীয়? নবজাগরণের প্রথম বিপ্লবী রাজা রামমোহন রায়ের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র এবং অক্ষয় দত্ত। আর বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি কে ছিলেন ? এ বিষয়ে প্রত্যয় নিয়ে কিছু বলবার আগে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াতে হয় পরবর্তী ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি।
আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে বিদ্যাসাগরের সেই বিপ্লবী চিন্তাধারার কিছুমাত্র মুল্য কি আমরা দিয়েছি? হাজার প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নির্ভর মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে, তার লালন পালন করা দূরে থাক আমরা তার প্রাপ্য মর্যাদা টুকুও দিইনি। বিদ্যাসাগর ছিলেন ভুল দেশে ধূমকেতুর মত দৈবাৎ আবির্ভূত হওয়া এক বৈপ্লবিক জ্যোতি। তাঁর উদ্দিষ্ট পথের কোনও অগ্রপথিক ছিল না, তাঁর অনুসারীও কেউ নয়। আমরা বিদ্যাসাগরের ধর্মে দীক্ষিত হতে পারি নি, তাঁর ধর্মের উত্তরাধিকারী আমরা নই। আজ আমাদের যা ধর্ম সেই ধর্মকে তিনি আজীবন ঘৃণা করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পর থেকেই তাঁর প্রবর্তিত ও অনুসৃত নির্জন ধর্মমতটিকে যত্ন করার পরিবর্তে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়াতেই আমাদের উৎসাহ ছিল বেশি। কঠোর ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের বলে তিনি বিজ্ঞান নির্ভর নির্মোহ যুক্তিবাদের, স্বার্থহীন মানবসেবার, আপসহীন সংস্কার কর্মের যে উজ্জ্বল ধারার প্রবর্তন করে গেলেন আমরা তা আন্তরিক ভাবে আগলে রাখতে পারিনি। নির্বোধের মত সেই অমূল্য সম্পদ অবহেলায় হারিয়ে যেতে দিয়েছি। যে সামগ্রিক জাগরণের আকুলতায় নবজাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার, আশ্চর্যজনক ভাবে ঠিক তার বিপরীত দিকে যাত্রা করেছে বাঙালি সমাজ। নানা মাপের ছোট বড় মাঝারি অবতারদের সামনে রেখে দেশব্যাপী ভক্তিবাদের লহর বইয়ে দিয়েছি আমরা। বঙ্গীয় রেনেসাঁ শেষপর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মের নবজাগরণে। ফিরে এসেছে, বেদ-বেদান্ত, মনুসংহিতা, আর সংগঠিত ধর্মীয় আন্দোলনের যুগ। নিজের শেষ বয়সেই বাঙালির এই অধোগামিতা প্রত্যক্ষ করে গিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র।
সেই ট্র্যাডিশন সোৎসাহে বহন করে চলেছি আমরা। আজ একবিংশ শতকে পা রেখেও অশিক্ষা কুশিক্ষা সংস্কারাচ্ছন্নতায় আবিল আমাদের সমাজ। চারপাশে গোঁড়ামি আর ভণ্ডামির বেসাতি, অসংখ্য সম্প্রদায়, শত শত ছোটবড় অবতার, হাজার হাজার ধর্মীয় আশ্রম। সংবাদপত্রের পাতায়, দূরদর্শনের চ্যানেল চ্যানেলে দিনরাত প্রচারিত হতে থাকে জ্যোতিষ আর গ্রহরত্নের বিজ্ঞাপন, অব্যর্থ বশীকরণের হাতছানি। কিছু কিছু চ্যানেল তো ধর্মের বানী প্রচারের জন্যই নির্দিষ্ট। সমাজে স্বমহিমায় বিরাজ করে জাতপাত আর অস্পৃশ্যতার মত মধ্যযুগীয় অন্ধকার। জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়েছে তাঁকে স্মরণ করবার নৈতিক অধিকার আমাদের আছে কি না। রামেন্দ্রসুন্দর যথার্থ লিখেছেন, “... ঐ নাম গ্রহণ করিতে আমাদের কোনরূপ অধিকার আছে কি না, এ বিষয়ে ঘোর সংশয় আরম্ভেই উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। বস্তুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এত বড় ও আমরা এত ছোট, তিনি এত সোজা ও আমরা এত বাঁকা, যে তাঁহার নাম গ্রহণ আমাদের পক্ষে বিষম আস্পর্ধার কথা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।”
বিদ্যাসাগর কোনও কালেই বাঙালির খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন না। জীবদ্দশায় বঙ্গসমাজকে তাঁর জাগরিত করবার প্রয়াস যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছিল তা ঐতিহাসিক সত্য। বঙ্গভাষীদের জনজীবনে তাঁর প্রভাব ক্ষয়ে যেতে যেতে মৃত্যুর মাত্র একশ আটাশ বছরের মধ্যে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। কাব্য বা সঙ্গীতের জন্য রবীন্দ্রনাথ নজরুল, ধর্মভাবনার কারণে চৈতন্য বিবেকানন্দ, গল্পকার শরৎ বিভূতি আমাদের নিত্যদিনের অনুশীলন, আহ্লাদ। এঁরা আমাদের প্রাণের কাছাকাছি থাকা মানুষ, এমনকি প্রিয় গায়ক নায়ক অথবা ক্রিকেটারের তুলনাতেও এঁরা বোধকরি খুব দূরের নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের মনের মানুষ নন, আমরা তাঁকে ঠাই দিয়েছি মাথার ওপরে, সহজ নাগালের বাইরে। ভালবাসা বা আত্মীয়তার বদলে আমরা তাঁর জন্য বরাদ্দ রেখেছি বাৎসরিক পূজার্চনার ফুল আর অসার ভক্তিময় গোলাকার স্তুতি। কেননা ভালবাসা বা আত্মীয়তার অনেক দায়, পূজা বা ভক্তির কোনও দায় নেই। তাঁর জন্মের এই দুশ’ বৎসর উপলক্ষ্যে রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষটিকে কল্পনা করতেও আমাদের ভয় করে, যেন সরাসরি মধ্যাহ্নের রোদ্রের দিকে তাকানো। তাঁকে তো ভুলে থাকবার বা অস্বীকার করার যো নেই আমাদের, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তাঁর উপস্থিতি সহ্য করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তাঁর মর্মর মূর্তি বানিয়ে মালা পরিয়ে দেওয়া বরং অনেক সহজ সমাধান। একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে ওঠে--আজ দুশ’ বছরের ব্যবধানে ঈশ্বরচন্দ্র যদি পুনরায় এই দেশে আবির্ভূত হয়ে নিজের মুদ্রাদোষে ‘সৃষ্টিছাড়া’ সব সংস্কার কর্মে মেতে ওঠেন তাহলে আমাদের সমাজে মহামান্য রাধাকান্ত দেবের খুব অভাব পড়বে কি?


সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

  1. বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। দে'জ পাবলিশিং 
  2. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ/ বদরুদ্দিন উমর। চিরায়ত প্রকাশন
  3. বিদ্যাসাগর/ চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আনন্দধারা
  4. বিদ্যাসাগর/ বিহারিলাল সরকার। ওরিয়েন্ট বুক
  5. বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ/ বিনয় ঘোষ। বেঙ্গল পাবলিশার্স
  6. করুণাসাগর বিদ্যাসাগর/ ইন্দ্রমিত্র। আনন্দ পাবলিশার্স
  7. কবিতীর্থ পত্রিকার ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ সংখ্যা (জুন ২০১৮)/ উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত
  8. জিজ্ঞাসা পত্রিকার ‘বিদ্যাসাগর বিশেষ সংখ্যা’ (একত্রিংশ বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা, ২০১৩ - ২০১৪)/ স্বরাজ সেনগুপ্ত সম্পাদিত