Showing posts with label লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের কবিকৃতি. Show all posts
Showing posts with label লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের কবিকৃতি. Show all posts

Tuesday, October 1, 2019

লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের কবিকৃতি, এক নির্মোহ চর্চার ইতিবৃত্ত

Siddhesh Rane

মেদিনীপুরের কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ বাংলা কবিতার একজন সর্বক্ষণের কর্মী। এমন নয় যে তাঁর আর কোন কাজ নেই, কিন্তু অন্য সমস্ত কর্তব্য তিনি সম্পন্ন করেন চাঁদবেনের বামহস্তে। তিনি অন্যতম প্রাচীন একটি বামপন্থী দলের সদস্য, বেশ কয়েক বিঘা জমিজিরেত নিয়ে ব্যস্ত একজন কৃষক, ভাই ভাগ্নে ছেলেপুলে সহ একান্নবর্তী একটি সংসারের কর্তাব্যক্তি। এতসত্বেও তাঁর প্রথম এবং প্রধান পরিচয় তিনি একজন কবি। কবির মত দেখতে এমন কবি তিনি নন, বাংলা কবিতার পাঠক একডাকে তাঁকে চেনেও না। কিন্তু তিনি এবং তাঁর মত আরও কয়েকজন কবি পশ্চিমবাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থেকে নিঃশব্দে নিষ্ঠার সঙ্গে একটি অত্যন্ত জরুরী কাজ করে চলেছেন। কবিতাসীমান্ত পত্রিকার সম্পাদক শ্রীদীপেন রায় বরাবর এই কবিদের কবিতা ও গদ্যরচনা বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ ও প্রচার করে এসেছেন। নানা সময়ে এই কবিদের বিষয়ে কিছু লিখতে ও লিখিয়ে নেওয়াতেও তাঁর সবিশেষ উতসাহ লক্ষ্য করা গিয়েছে। একাধিক বার এই পত্রিকার সম্পাদকীয় কলমে উল্লিখিত হয়েছে মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, বেনু দত্তরায় অথবা লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের মত কবিদের নাম। বর্তমান রচনাটিও সম্ভবত সেই পরম্পরা রক্ষার্থেই সম্পাদকীয় ফরমায়েশ।
          বাংলা কবিতায় লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ বা তাঁর সতীর্থ অন্যান্য কবিদের ভূমিকা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে সহকারী সারেঙ্গী নয়, বরং অনেকটা তানপুরা বা স্বরমণ্ডলের মত।যা  প্রায় অশ্রুত থেকেও নিরন্তর রচনা করে চলে সাত স্বরের একটি নিশ্ছিদ্র পট। যে পটের ওপর অনায়াস ও সুগম হয়ে উঠবে সুরের গমনাগমন, আরোহণ অবরোহণ। যার উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতিই অনুভবে এসে ধাক্কা দেয় অধিকতর তীব্রতায়। যেন নামাজের জন্য জায়নামাজ, অথবা গাছেগাছে ফুল ফুটে উঠবার জন্য অনুকূল আলো-হাওয়া। এই শ্রেণির কবিদের জীবন কেবল নিরন্তর শ্রম ও সাধনার, পরিশেষে সিদ্ধি হয়তো মেলে কিন্তু স্বীকৃতি মেলেনা। অবিরাম অভিযাত্রার কোন ফিনিসিং লাইন নেই, কেবল এক অন্তহীন পথে বারবার ব্যাটন হাতবদল করে যাওয়া। নির্মোহ সাধনার পরম্পরা সযত্নে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া। এই অভিযাত্রায় ব্যক্তিগত সাফল্যের কোন প্রত্যাশা থাকে না, যা কিছু অর্জন সবই সর্বজনীন। সাহিত্যচর্চার এই ব্যতিক্রমী ধারা জীবনের বৃহত্তর পরিসরেও স্থাপন করে এক উন্নত আদর্শের দৃষ্টান্ত। এই বিজ্ঞাপন সর্বস্ব সময়ে যখন প্রকৃত শিল্প-সাহিত্য রচনার চেয়ে রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার উদ্দেশ্যই প্রধান হয়ে উঠছে তখন লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের মত কবিদের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেশি করে অনুভূত হয়।
          লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ প্রতিভাবান কবি নন, স্বভাবকবিও নন। স্কুল-পাঠ্য বইয়ের কবিতা পড়তে পড়তে কবিতা রচনায় উৎসাহী হয়েছেন, আবার লিখতে এসে কবিতাপাঠের আগ্রহ তাঁর আরও বেড়ে গিয়েছে। তিনি নিরন্তর লিখে লিখে পড়ে পড়ে কবি হয়ে উঠতে চেয়েছেন। এই অনুশীলনের মধ্যে কোথাও কোন ফাঁক রাখেননি। তরুণ বয়সে সামনে অনুপ্রেরণা হিসেবে পেয়েছেন অজয়কুমার নাগ সহ মেদিনীপুরের আরও দুয়েকজন অগ্রজ কবিকে। কবি ও কবিতার সান্নিধ্য ছাড়া আরও যে বিষয়টি তাঁকে প্রাণিত করেছিল তা হল সেই সময়কার বামপন্থী রাজনীতির উত্তাপ। কলেজ জীবন থেকেই তিনি বামপন্থী রাজনীতির একজন একনিষ্ঠ কর্মী। একটা সময় তো তিনি কার্যত ছিলেন কিংবদন্তী কমিউনিস্ট নেতা দেবেন দাশের চেলা। পরবর্তীকালে, সিপিআই সাংসদ নারায়ণ চৌবেরও ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসেন তিনি। বলা চলে তাঁর কবিমানস বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে বাম রাজনীতির এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। এবং প্রথম থেকেই তিনি নিজেকে প্রস্তুত করে তুলতে চেয়েছেন একজন সমাজমনস্ক কবি হিসেবে।
প্রায় ১৯৭০ থেকে লেখালেখি শুরু করলেও তাঁর প্রথম কবিতার বই “কবির মুখ” প্রকাশিত হয়েছে তেইশ বছর পর, ১৯৯৩ সালে। তারপর থেকে এপর্যন্ত মুদ্রিত হয়েছে আরও তিনটি কবিতার বই এবং একটি গদ্যগ্রন্থ। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত মোট কবিতার সংখ্যা সাকুল্যে দুশ, এই সংখ্যা তাঁর মোট রচিত কবিতার বোধকরি দশ শতাংশও নয়। ফলে যা বোঝা যাচ্ছে লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ খুব বিজ্ঞাপিত বাজার-সফল কবি নন। বৎসরান্তে বইমেলার মোচ্ছব উপলক্ষ্যে এক বা একাধিক গ্রন্থ প্রকাশ করবার সুযোগ সাধ্য বা ইচ্ছে কোনওটাই তাঁর নেই। সারাবছর ধরে অবশ্য নগর মফস্বলের নানা পত্রিকায় নিয়মিত তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। দুএকটি ব্যতিক্রম ছেড়ে দিলে প্রায় সমস্ত স্বীকৃত ছোট কাগজে এবং কিছু বড় বানিজ্যিক কাগজেও তিনি লিখেছেন। তবে দূর গ্রামের কবি হওয়ায় কিছু কিছু উপেক্ষা অবহেলার মুখোমুখিও হতে হয়েছে তাঁকে। নিয়মিত কলকাতা যাতায়াতের অভ্যেস নেই, কেবল গ্রামের দীর্ঘসূত্র ডাকঘরটিই তাঁর সাহিত্যরচনা পত্রপত্রিকায় পাঠানো বা প্রকাশিত কাগজপত্র পাওয়ার একমাত্র সহায়ক মাধ্যম।
          স্বভাবতই, তাঁর মত কবিদের আবির্ভাব বা উপস্থিতি সাহিত্য জগতের ক্ষেত্রে বিশেষকোন ঘটনা নয়। তাঁদের কর্মসূচি সাধারণের ভিড়ে মিশে থেকে সহজ ও স্বাভাবিক। লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ প্রণীত চারটি বইয়ের কোথাও কোন অভিনব বিষয় বা আঙ্গিকের প্রকাশ বা প্রয়াস চোখে পড়ে না। আদিকবির সময় থেকে আজ অবধি কবিতার যেসব চিরকালীন ভাব সেইসব সুলভ উপকরণেই নির্মিত তাঁর রচনার অস্থিমজ্জা। আর ভাষাটি তিনি অর্জন করেছেন সমসাময়িক কাব্য চর্চার চলতি ধারা থেকে। ফলে তাঁর রচনা পাঠ করে নিত্যদিনেরশিল্প অনুশীলন সম্ভব তবে অভিনবত্বের বিস্ময়ে হতচকিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ তেমন নেই। “কবির মুখ” গ্রন্থের প্রথম তথা নামকবিতাটিতেই তাঁর কাব্য চর্চার স্টাইল ও অভিমুখ স্পষ্টভাবে মুদ্রিত। ‘কবি’-র এক ধ্রুপদী রূপ যত্ন সহকারেনির্মাণ করা হয়েছে এখানে। “সে কেবলই বকুলের অমল গন্ধ দেয়, ... / ... সে আশ্চর্য ফেরিঅলা,/দাম নেয় না। সেই-ই সব মানুষের কাছে, হৃদয়ে-হৃদয়ে/ ফেরি করে তার একান্ত নিজস্ব রক্ত কিছু,/ কিছু রক্তের ভালবাসা, ভালবাসার রক্ত। ...” এই প্রারম্ভিক কবিতা থেকেই কবি হিসেবে তাঁর স্বপ্নকে আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি। চারটি বইয়ের পাতায় পাতায় এমন উদাহরণ বিস্তর।
          তাঁর চারটি বইয়েরই মূল সুর রাজনৈতিক। সাতের দশকের অধিকাংশ কবিদের মত প্রখর সমাজ সচেতনতা ও অনাগত বিপ্লবের জন্য আকুলতা তাঁরও কবিসত্ত্বার মূল পরিচয়। “কবির মুখ”-এ গ্রন্থিত কবিতাগুলির রচনাকাল ১৯৭০-৭৮, এবং প্রত্যাশিত ভাবেই এই বইয়ের প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় গত শতকে দেশ তথা প্রদেশের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। পরের তিনটি বই—“আমিসেপুতুলনই” (১৯৯৪), “অনন্তময়ূর” (১৯৯৯) এবং“প্রান-পুরাণ”-এও (২০০৩) যথেষ্ট সংখ্যায় রাজনৈতিক কবিতার সমাহার লক্ষ্য করা যায়। অবশ্য শেষের দুটি কাব্যগ্রন্থে রাজনীতি ছাড়াও বৃহত্তর জীবনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে কবিতার ছত্রে ছত্রে। রাজনীতির উপস্থিতি থাকলেও তা সেখানে প্রচ্ছন্ন। তাঁর কবিকৃতির আলোচনা করতে গিয়ে এই কথাগুলি প্রথমেই বলে নেওয়ার উদ্দেশ্য এটাই যে তিনি কবিতা লিখতে এসে নিজেকে সমসময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে অ-সাধারন বা বিশিষ্ট রূপে চিহ্নিত করেন নি বা করতে চাননি। অব্যবহিত আগের দশকগুলির ‘বিশুদ্ধ কবিতা’, ‘রাগী কবিতা’ বা ‘ক্ষুধার্ত কবিতা’-র আন্দোলনে নিজেকে ভেসে যেতে দেননি। আবার আট-নয়ের দশকের ব্যক্তিগত, অতিব্যক্তিগত কবিতা রচনার প্রবণতা থেকেও নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখেছেন। অবশ্য এইভাবে এলোমেলো নানা স্রোতের মুখে নিজেকে স্থির ও অনুত্তেজিত রাখা হয়তো সম্ভব হয়েছিল মহানগর থেকে অনেক দূরে বসে সাহিত্যচর্চা করার কারণে। এবং হয়তো এই দুরত্বের কারণেই তাঁর কবিতায় থেকে গিয়েছে একধরণের মারপ্যাঁচহীন গ্রাম্য সরলতা। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, তাঁর কবিতায় আধুনিকতা (কবিতার সমকালীনতা বোঝাতে এই শব্দটিই কি যথেষ্ট নয়?) পুরোমাত্রায় থাকলেও, উত্তর-আধুনিক চরিত্র-চিহ্ন প্রায় অনুপস্থিত বললেই চলে। সমাজ সভ্যতার তথাকথিত চিরকালীন এবং ‘বিগ ইস্যু’ গুলিই তাঁর রচনার প্রাণ। একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলা চলে— মূল পাঠক্রমের সযত্ন পঠনপাঠনে তাঁর যতখানি নিষ্ঠা বা আগ্রহ নিত্য নতুন গবেষণায় উৎসাহ হয়ত ততখানি নয়।
          তিনি প্রায়ই তাঁর গদ্যরচনায় বা বক্তৃতায় যে কথাটি উচ্চারণ করতে বেশ পছন্দ করেন তা হল ‘প্রতিবাদই কবিতা’, এবং তর্কোপলক্ষে আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেন যে সুন্দরের কবিতাগুলি আসলে অসুন্দরের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। এওতো এক অকৃত্রিম ধ্রুপদী অবস্থান। “কবিরমুখ” বইয়ের একটি কবিতার নাম “কবিতা তো হাতিয়ার”, যেখানে তিনি লিখছেন— “... তাই কবিতাকে এখন/ হাতিয়ার করে গড়ে তুলেছি—/ বল্লমের মতো তীক্ষ্ণ,/ খড়্গের মতো শানিত,/ বুলেটের মতো শক্তিশালী! ...” লক্ষ্য করার বিষয় এখানে কাব্যভাষাটি একেবারেই সহজ আটপৌরে, সাধারণ শিক্ষিত মানুষ উনিশবিশ এইভাবেই বলবেন বা লিখবেন। আসলে কবিতাটি ভাবপ্রধান, শুধু এটিই নয় লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের চারটি বইয়ের অধিকাংশ কবিতাই এরকম। প্রত্যাশিত ভাবেই সত্তরের দশকের নানা রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের সুস্পষ্ট প্রতিবিম্ব ধরা পড়েছে লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের এই প্রথম বইটিতে। কংগ্রেস ‘শাসন’, জরুরী অবস্থা, বাম রাজনীতি, নকশাল আন্দোলন সমস্তই বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। বিষয় ভাবনায় কোন চমক নেই (আগেই লেখা হয়েছে) ঠিকই তবে কবি সময়ের কাছে বিশ্বস্ত থাকতে চেয়েছেন এবং পেরেছেনও। তাঁর ওপর নির্দিষ্ট ভাবে পূর্বসূরি কোন কবির প্রভাব রয়েছে এমনটা বলা যায় না, বরং যা স্পষ্ট তা হল সত্তর দশকের মেনস্ট্রিম কাব্যভাষার ছাপ।
          এই বইয়ের একটি সহজ সুন্দর উদ্ধৃতিযোগ্য কবিতা “পাখি আসেনা”—
পাখিরা এখন আর কেউ আসে না,
ডানায় রোদ্দুর মেখে কারও বাগানে।

এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে যাওয়ার
সব সেতু ভেঙ্গে গেছে।
তাই পাখিরা আসতে পারে না,
হৃদয়ের কাছাকাছি
কোনো মুক্ত জানালার কাছে।
তারা সূর্যাস্তের আগেই দূর থেকে ঘুরে যায়।
...
           
            চারফর্মার “কবির মুখ”-এর পর নরম মলাটে প্রকাশ পেল মাত্র চব্বিশ পৃষ্ঠার একটি বই—“আমি সে পুতুল নই” মাত্র আঠারোটি কবিতা নিয়ে। এখানেও রাজনীতি কবিতাগুলির প্রধান উপজীব্য। পাশাপাশি, মৃত্যুবোধ, এমনকি বামপন্থী কবির কলমে ঈশ্বরচেতনার লেখার দেখাও মেলে। সবচেয়ে উল্লেখ্য বিষয়—এই কাব্য পুস্তিকাটিতে লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের ভাষা অনেকখানি পরিণত। এবং অনেকেই বলেন, সঙ্কলন ও সম্পাদনার দিক থেকে এটিই কবির শ্রেষ্ঠ বই। মলাট ও টাইটেল পেজ অতিক্রম করে উৎসর্গ পত্রে এলেই পাঠকের জন্য অপেক্ষমাণ এক মহৎ বিস্ময়। কবি লিখেছেন “মহারাষ্ট্রের বিধ্বংসী ভূমিকম্পে/ নিহত মানুষদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে”। গ্রন্থ উৎসর্গের এই রীতি একেবারে অভিনব না হলেও বিরল তো বটেই, এবং তা নিখুঁত সংবেদনশীল কবিমানসের এক স্পষ্ট পরিচয়বাহী। প্রথম কবিতাটিই নামকবিতা এবং কিঞ্চিৎ দীর্ঘায়ীত কবিতাটির শেষে এসে একজন সাহসী কবির সেই সদম্ভ ঘোষণা—“… কিনে নিতে চাও নাকি/ আমারও এমাথা?/ দশ আঙুলের সুতোয় তুমি নাচাতে চাও পুতুল?/ আমি সে পুতুল নই।/ হাতে হাতে ফিরি হবো?/ নেচে যাবো প্রভুদের খেয়াল-খুশিতে?/ … রক্তে যার দিনরাত সূর্যোদয়ের গান,/ … সে কখনও স্বেচ্ছাচারী দু’হাতের ক্রীড়নক হয়?” এই উচ্চারণেও কিছু নতুনত্ব নেই তবে এই বাক্য প্রতিদিন প্রতিটি কবির বারংবার আবৃত্তি করাও জীবনে অভ্যেস করা অত্যন্ত জরুরী একটি কর্তব্য। কবিতাটি যখন রচিত হয় (১৯৮৬) তখন দোর্দণ্ডপ্রতাপ বামফ্রন্টের শাসন জারি রয়েছে রাজ্যে, মুখ্যমন্ত্রীর আসনে স্বয়ং জ্যোতি বসু। কবিতাটি যে সরকারের উদ্দেশে রচিত তা অনুমান করতে গবেষক হওয়ার প্রয়োজন নেই। এবং এখানেই কবি তাঁর রাজনৈতিক সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আমাদের সম্মুখে। যে সময়ে অধিকাংশ কবির কাছে সরকারের গুণগান করাই এক নিরাপদ ফ্যাসান হয়ে দাঁড়িয়েছিল (এখনও তেমনটাই নয় কি?) তখন একজন আদ্যন্ত বামপন্থী মানুষ হয়েও তিনি সরকারের বিরুদ্ধে মুখর হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। শুধু একবার বা দুবার নয় বারংবার তিনি সরব হয়েছেন শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। এরপর যখন জমি অধিগ্রহণ এবং শিল্পায়ন ইস্যুতে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজ্য রাজনীতি তখনও তিনি কলম উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাধারণ কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের পক্ষে। এমনকি তখনও সরকারের পক্ষ নেওয়া এক কবি এবং এক নট পরবর্তী কালে সরকার পরিবর্তিত হলে নির্লজ্জ ভাবে লেজ নাড়তে নাড়তে যখন দলবদল করলেন এই কবিতাটির গুরুত্ব আরও তিব্র ভাবে অনুভূত হল পাঠক-হৃদয়ে।
          নয়ের দশক বা এই শতকের শূন্যদশকের অধিকাংশ নবীন লেখকদের রচনায় দেখা যাচ্ছে একরকমের মেদুর স্মৃতিকাতরতা, পেলব প্রেম ও প্রকৃতির নম্র উচ্চারণ। কবিতার ছত্রেছত্রে বড্ড বেশি আমি আমি আমি, ব্যবহৃত শব্দগুলি অতীব নরম মসৃণ আর ঠুনকো। এই প্রজন্মের কবিরা রাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখেন নিজেদের কবিতাকে। বহুল প্রচারিত বাণিজ্যিক কাগজগুলি তেমন প্ররোচনাই দিয়ে চলে নিরন্তর। নবীন কবিদের প্রলুব্ধ করে জনপ্রিয় হবার সহজ সস্তা বিষয় ও প্রকরণকে আপন করে নিতে। এই সময়ে লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের মত কবিরা ক্রমশ লুপ্তপ্রায় প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন। কবিরা আজকাল বড্ড ভিতু, অন্তরালবিলাসী, পলায়নপর। কবিরা আজকাল কাগজেকলমে কম, সোশাল-মিডিয়ায় অধিক সক্রিয়। কবিদের অবসর সময় আজকাল ব্যায়িত হয় অ্যামাজনে, ফ্লিপকার্টে, মিন্ত্রায়। কবিরা এখন খোলাবাজারের খোলা অর্থনীতির অনুগত জীব। এইরকম একটা সংকটের কালে রাজনৈতিক তথা সমাজ চেতনার কবিতা চর্চা করা সত্যিই বড় কঠিন কাজ। রাজনৈতিক কবিতারও তো রকমফের থাকে। বিদ্রোহ বা বিরোধাভাসের রচনার পাশাপাশি থেকে যায় আদিকাল থেকে চলে আসা কর্তাভজা সভাসাহিত্যের ধারাটিও। শ্রীসুবোধ সরকার এখনও কবিতা লেখেন, সুমন-নচিকেতাও গানবাজনা ছেড়ে দেননি। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে তাঁদের গান বা কবিতায় সেই গনগনে আঁচের মত উত্তাপ কোথায়, কোথায় সেই তীক্ষ্ণ বল্লমের একাগ্রতা? আর মেকি নাগরিক স্পটলাইটের বাইরে লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের মত একঝাঁক সীমিত ক্ষমতার সৎ কবি দিনের পর দিন সজাগ থাকেন নিজেদের স্পষ্টভাষী ক্ষুদ্র কলমটিকে সম্বল করে। সেটাই আমাদের কাছে বড় ভরসার কথা।
“আমি সে…” বইয়ের “চিনে নে”, “প্রাণের প্রহরী”, “পঞ্চতন্ত্রের কাক ও শৃগাল” অথবা “আসামী ঈশ্বর” কবিতায় তাঁর নির্মম শ্লেষ নিক্ষিপ্ত হয়েছে শাসকের প্রতি। আবার “তিমির বিষয়ক” বা “ক্ষমতা অক্ষমতা” কবিতায় কবির রাগী কলম ফুঁসে উঠেছে শিল্পের সমস্ত বেড়াজাল ভেঙ্গে। এবং তারই পাশাপাশি, কী আশ্চর্য দক্ষতায় তিনি রচনা করেন প্রেম প্রকৃতি বা মৃত্যুবোধের মায়াবী সব কবিতা। আমাদের সন্দেহ থাকে না কেন পাঠক কুল এই ক্ষীণতনু বইটিকে কবির সেরা সংকলন আখ্যা দিয়ে থাকেন।

ট্রেন চলে যায়……
দুধের বোতল, অ্যালবাম, মানিব্যাগ, সিঁদুর কৌটো,
বিছানাপত্র পড়ে থাকে আত্মজীবনী, চরিতামৃত
ফিরে তাকাবার সময় থাকে না
একা প্ল্যাটফর্ম
……
ট্রেন চলে যায়……
প্ল্যাটফর্ম জেগে থাকে, নীল দীর্ঘশ্বাস।
(ট্রেন চলে যায়)

অথবা

খুব ভোরে প্রথম কদম ফুটেছে শাখে
পরাগে-পরাগে শিশিরের ভেজা ঘ্রাণ
ঈষৎ সাদা, হলুদ
                    কিছু কি নীলের আভা?
……
বর্ষার বাউল কবি ভোরের সূর্যগন্ধ মেখে
কদমের দিকে
……
প্রথম পুরুষ
                    কবির অনিন্দিত মুখ।
(প্রথম কদম)

তৃতীয় বইয়ের নাম “অনন্ত ময়ূর”, প্রকাশ মে ১৯৯৯, রচনাকাল ১৯৮৭-১৯৯৮। এই বইয়ে কবি মানুষের চরিত্রের মধ্যে মনুষ্যেতর নানা জীবের প্রচ্ছন্ন গুণাবলী আবিষ্কার করেছেন, অথবা নামানুষদের মধ্যে নির্ণয় করেছেন মানুষী প্রতিচ্ছবি। যেমনটা এককালে শ্রীসন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর এক বিখ্যাত উপন্যাসে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে দেখিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এখানে কবিতার নামগুলি নানা পশুপাখিকীটপতঙ্গের নামে। কবিতাগুলি তিনটি গুচ্ছে বিন্যস্ত— পশুপক্ষীগুছ, কীটপতঙ্গগুচ্ছ এবং জলজগুচ্ছ। এই সময় থেকে বিভিন্ন বিষয়ে সিরিজ লেখার প্রবণতায় পেয়ে বসে কবিকে।যেমন এর পরের বইতেও তিনি সঙ্কলন করেন ‘প্রাণ’ বিষয়ক একটি সিরিজ। ১৯৭৮ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে রচিত কবিতা (অন্তত পাঁচ শতাধিক) গ্রন্থাকারে প্রকাশের ক্ষেত্রে কবি কালানুক্রমকে একেবারেই পাত্তা দেন নি। অনেক মহৎ ও স্বাধীন রচনাকে উপেক্ষা করে তিনি এই সিরিজ চর্চার মোহে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। এবং এই করতে গিয়ে দুভাবে পাঠককে বঞ্চিত করেছেন কবি। প্রথমত, সিরিজের নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ফলে সংশ্লিষ্ট বেশ কিছু রচনার মধ্যে এসে গেছে তারল্য, পুনরাবৃত্তি, এবং একঘেয়েমির দোষ যা পাঠকের কাছে ক্লান্তিকর। এবং, বহু উল্লেখযোগ্য কবিতা যেগুলো পত্রিকায় প্রকাশিত হতেই পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল সেসব অনাদরে পড়ে থেকে গেছে জীর্ণ খাতায় মলিন হয়ে যাওয়া হস্তাক্ষরে, বৃহত্তর পাঠক সমাজের অগোচরে।
          “অনন্ত ময়ূর” নামটি শুনে বেশ একটু আশান্বিত হতে হয় বইকি, এবং বইয়ের রচনাগুলিও আমাদের হতাশ করে না। বেশ কিছু সার্থক কবিতা নাম না জানা ফুলের মত ফুটে রয়েছে বইটির আনাচেকানাচে। আর একটা বিষয়ও আমরা বুঝতে পারি, ছোট কবিতার ক্ষেত্রে কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের তুলনামূলক ভাবে অধিকতর সিদ্ধি।


উট

কোথায় মরুভূমি? এসো, স্নায়ুর দহন
কোথায় নির্জল স্মৃতি? এসো, অন্তহীন খরা।

কোন্‌ পরীক্ষা? আগুনেও শ্যামল তৃষ্ণায়ও সজল
কোন্‌ চিহ্ন? সেতু ও পারাপারের স্বয়ং এক প্রতীক।

গহ্বরযাত্রা? না, সূর্যে দীর্ঘগ্রীব অনন্ত রৌদ্রাভিসার।
মৃত্যুভয়? অধিক সবুজ জ্বলে ওঠে, ঐ উট।


ঘুঘু

বন্ধুদের শুভেচ্ছা বার্তা, এ কোন্‌ প্রদীপ তুলে ধরে?
চমকে উঠি, কোথাও কি ঘুঘু ডাকছে?
সোনার আলোয় যখন সন্তানের মুখে চুমু খাই
দশদিক দেখে নিই, কোথাও কি ঘুঘু কান পেতে আছে?
কে গো আমার জন্যে দুধের বাটি নিয়ে?
দেখে নাও কোথাও ঘুঘু লুকিয়ে আছে কিনা!
খ্যাতি, এতো ছড়িয়ে পড়ছো কেন সুগন্ধের মতো?
দেখো, কোথাও ঘুঘু ডাকছে কি না!


চতুর্থ কবিতার বই “প্রাণ-পুরাণ”-এর জন্য কলেজ স্ট্রীটের এক প্রকাশকের তরফ থেকে পুরস্কৃত করা হয় কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষকে। তা সত্ত্বেও বলা চলে ছাপা বাঁধাই প্রচ্ছদ বা কন্টেন্ট কোন দিক থেকেই এই বইটি তাঁর অন্য বইগুলির চেয়ে এগিয়ে নেই বরং কিছুটা যেন পিছিয়ে। ‘প্রাণ পুরাণ’ শিরোনামের অধীনে কুড়ি পৃষ্ঠা ব্যাপি প্রায় একশ’ চল্লিশটি চার লাইনের অনুকবিতা, ‘প্রাণ যেন অনন্তের শ্রেষ্ঠ শিল্প’ এই শিরোনামে প্রায় দশ পৃষ্ঠা জুড়ে ক্রমাঙ্ক চিহ্নিত একগুচ্ছ কবিতা এবং শেষে আরও ছ’টি অপেক্ষাকৃত বড় আকারের কবিতা নিয়ে এই বইয়ের বিন্যাস। আগের বইটি আংশিক সফল হলেও এই বইতে সিরিজটি ঠিকঠাক জমে ওঠেনি। বইটির দিকে একঝলক তাকালে মনে হবে ডাঁই হয়ে পড়ে থাকা গুচ্ছের অভিমুখহীন অনুকবিতা। ভারতীয় তথা বিশ্বসাহিত্যে সার্থক ছোট কবিতার উদাহরণ কম নয়। কিছু কিছু কবি তো চারলাইন বা আটলাইনের কাব্য রচনা করেই ভুবন বিখ্যাত হয়েছেন। ছোট কবিতা রচনায় কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষও রীতিমত দক্ষ, সমস্যা হয়েছে একটি নির্ধারিত বিষয় নিয়ে পাতার পর পাতা লিখতে গিয়ে। স্বভাবতই বইটির বহু কবিতা হয়ে পড়েছে অকিঞ্চিৎকর তরল, কোনও কোনটি নিছক চারলাইনের ধাঁধায় পর্যবসিত। তারই মধ্যে কিছু চমৎকার কবিতা মণিমাণিক্যের ছড়িয়ে রয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ—

ধুলো
অক্লেশে সহজ উড়িয়ে দিই সমস্ত কার্পাস, সাবান
অন্তিম কি বিরল উদাসীনতায় নির্মোহের মধুর সুরভি!
বিলাস ঘৃণা মদ সব ছেড়ে ছুটে যাই আজ তোমার কাছে
কতদিন পর দেখা হবে তোমার সঙ্গে, ধুলো।

মাংস
মাংসের জন্যে এতো সাবান মাংসের জন্যে এতো কান্না
মাংসের জন্যে এতো হরলিক্‌স মাংসের জন্যে দাঁতের ঝকঝকে স্বাস্থ্য
মাংসের জন্যে কাঙাল পুরুষের কিউ নারীও গরবিনী দামী
মাংসের জন্যে এতো হরিধ্বনি মাংসের জন্যেই মাটি আগুন।

কানামাছি
খোঁজো, গরম দুধ ফলের রস ঔষধ শুশ্রূষা; কোথায় অনশ্বর দেহ?
খোঁজো, মসনদ রতিক্রীড়া বাড়ি ও গাড়ি; কোথায় অনন্ত সুখ?
খোঁজো, নিশ্ছিদ্র প্রতিরক্ষা সৈন্যব্যুহ বুলেট প্রুফ; কোথায় চির অমরতা?
খোঁজো, যোগ ভোগ প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নুন ও নাইট শো; কোথায় অমল শান্তি?

তাঁর শেষ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৩ সালে, আর আজ ২০১৮। এই সুদীর্ঘ সময়কাল কবি কবিতা রচনা স্থগিত রেখেছেন এমন নয়। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়ে চলেছে, কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় সেই প্রকাশিত কবিতা গুলি আর গ্রন্থবদ্ধ হয়ে উঠতে পারে নি বা পারছে না। কিন্তু যাদের সঙ্গে কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের ঘনিষ্ঠতা তারা জানেন অসংখ্য মূল্যবান রসোত্তীর্ণ রচনা নিতান্ত অবহেলায় তাঁর পাণ্ডুলিপির খাতার অন্তরালে পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে। এমনকি, একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনাবলী এখনও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত এবং তাই বৃহত্তর পাঠক সমাজের গোচরের বাইরে। আধুনিক মান্য কাব্যভাষা, বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ দৃষ্টি, সংস্কারহীন সংবেদনশীল কবিমন সমকালীন কবিযশোলোভীদের অসহ্য ভিড়ের মধ্যেও তাঁকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। তিনি বামপন্থী তবে দলদাসের মত জড়বুদ্ধি নন। কমিউনিস্ট সুলভ গোঁড়ামি তাঁর নেই, তিনি একজন প্রকৃত কবির ধর্মেই মুক্তমনা ও মানবিক। এবং এ কারণেই তাঁর কাব্যকর্ম জুড়ে অসাধারণ বিষয় বৈচিত্র। কাব্যনাটক রচনাতেও তিনি যথেষ্ট কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন পাঠকের সম্মুখে। সার্থক রাজনৈতিক তথা সমাজ সচেতন কবিতা যেমন তিনি লিখেছেন তেমনি লিখেছেন উৎকৃষ্ট সব প্রেমের কবিতা। এমনকি কাব্যের প্রয়োজনে যৌনতার রঙে কখনও সখনও নিজের কলমটিকে ডুবিয়ে নিতেও তাঁর কোনও রকম ছুতমার্গ নেই।
প্রেম ও যৌনতা তাঁর কবিতায় সজীব ও স্বতঃস্ফূর্ত। তাঁর আগ্রন্থিত রচনার মধ্যে দুটি অনবদ্য প্রেমের কবিতার উদাহরণ— “আমার যাওয়া” এবং “দেবী”। আমার যাওয়া কবিতায় তিনি পুরুষের কথনে শরীরী প্রেমের বর্ণনা দেন “আমার যাওয়া বটের ঝুরির মত” বলে। তারপর— “তুমিও নারী মাটির মতো ঠিক/ উত্তান, বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে কোমল,/ রসার্দ্র, বিদ্ধ প্রেমে আত্মহারা/ কখন সেই গোপনচারী মূল/ ত্বকমাংস ভেদ করে গুঢ়/ অভ্যন্তরে রক্তিম মর্মমূলে/ ফোটাবে রসঘন সুখের কদম/ সেই স্বপ্নে বিভোর মগ্ন, জেনে—/ নিম্নমুখ নেমে যাই কোমল গভীরে/ যেমন ঝুরি নামে বৃক্ষ হবে বলে।...”
অথবা দেবী কবিতায় প্রেয়সীকে তিনি বর্ণনা করেন দেবী রূপে। “কোথাও কি চুম্বন বাকি রয়ে গেল?/ স্তনের তীর্থ, যেন রজনীগন্ধার মাংস/ মাংসের জ্যোৎস্না/ নীরব গোপন পদ্ম, যেন পূর্ণ কুসুমকানন/ ভ্রমর ওড়ো! ভ্রমর ওড়ো!/ ওষ্ঠাধর যেন শিশিরের স্নিগ্ধ পদাবলী/ রক্তকরবীর টেরাকোটায়/ বিভাব কবিতার প্রদীপ শিখায়/ অলৌকিক শরীর/ দেবী—/ সারা অঙ্গই তীর্থভূমি ... / .../ ভিক্ষাপাত্র হাতে নিয়ে নবীন তীর্থঙ্কর/ ভিক্ষা, শুধু স্নানের ভিক্ষায়।” আরও মনে পড়ে তাঁর ‘হাত’ নামের অসাধারণ কবিতাটির কথা। যেখানে প্রেমিকের হাতকে তিনি চিত্রকরের ব্রাস অথবা ভাস্করের ছেনির মত শিল্প রচনার সাধনীর মর্যাদা দান করেছেন। কবিতায় প্রেমিকের হাত রচনা করছে প্রেমিকার দেহলী।
তাছাড়া যে ধরনের কবিতা রচনায় কবির সিদ্ধি সেই মানুষের জন্য প্রতিবাদী রচনাই সিংহভাগ জুড়ে আছে তাঁর অগ্রন্থিত রচনাসম্ভারের। তেমনি একটি তিব্র শ্লেষের কবিতা “জাহান্নামে যা”—

ডাঙ্গায় মাছের খাবি যেমন,
তেমনি খাবি?
                                খা,
মুখের খাবার কেড়ে নিলেও
কাড়বি না কো
                                রা?
ভাত কষ্ট শ্বাস কষ্টেও
বইবি বুকে
                                ঘা?
তবুও হাতে তুলবি না কো
একটা ছোট
                                দা?
এত মারেও করবি না ফোঁস?
ছুঁড়বি না হাত
                                পা?
তবে ঠুঁটো হাত-পা বিহীন
রামগরুড়ের
                                ছা,
তোর রাস্তা জাহান্নামেই,
সেইখানে তুই
                                যা।

কবি হিসেব লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের স্থান নির্ণয়ের উদ্দেশ্য বা যোগ্যতা কোনটাই এই রচনার নেই। কেবল তাঁর কবিকৃতির একটি আলগা স্কেচ প্রস্তুত করার চেষ্টাই করা হয়েছে এখানে। প্রায় স্বাধীনতার সমসাময়িক কবি তাঁর পরিণত বয়েসে উপনীত হয়েছেন। এখনও তিনি কোনও স্বীকৃত পুরস্কারে ভূষিত হননি, অদূর ভবিষ্যতে তেমন সম্ভাবনা আছে বলেও মনে হয় না। কোনও বাণিজ্যিক প্রকাশক অদ্যাবধি তাঁর বই প্রকাশের আগ্রহ দেখায় নি, দেখাবেও না, আমরা জানি। এতকাল রাশিরাশি কবিতা লিখেও তিনি খুব পরিচিত নাম হয়ে উঠতে পারেন নি। আজ যদি তিনি হঠাৎ কলম নামিয়ে রাখেন, বন্ধ করে দেন লেখালেখি, বাংলা সাহিত্যের আহ্লাদী পাঠকের কিছুই যাবে আসবে না। সাহিত্যের ইতিহাস নিজের খেয়ালে নিজের গতিপথেই ভ্রূক্ষেপহীন এগিয়ে চলবে। ঠিক যেমন একটি ইমারৎ সম্পূর্ণ হয়ে যাবার পর ভুলে যায় চারপাশে এতকাল সাজিয়ে রাখা বাঁশের কাঠামো আর সেই কাঠামোর আরোহী শ্রমজীবী মানুষগুলিকে।
লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ এবং তাঁর সধর্মী অন্য কবিরা আসলে অটুট নিষ্ঠায় করে চলেছেন বাংলা কবিতার অবকাঠামো তৈরির কাজ। নিজেরা প্রায় অদৃশ্য অশ্রুত থেকে গাঁ-গঞ্জে নগরে মফস্বলে তাঁরাই বজায় রেখেছেন কবিতা-কালচারের বুনিয়াদী ধারাটিকে। প্রস্তুত করে রাখছেন নবীন প্রতিভা আবির্ভাবের উর্বর ক্ষেত্র। এক অর্থে তাঁরাই নবীন লেখকদের জন্য কবিতার শিক্ষক। প্রসঙ্গত মনে পড়ে, অবিসংবাদী শিল্পী ও সঙ্গীতশিক্ষক বিমান মুখোপাধ্যায়ের কথা। বাংলাগানের শ্রোতা তাঁর বহু ছাত্রছাত্রীর গানবাজনায় মুগ্ধ হয়ে থেকেছেন দশকের পর দশক, কিন্তু তিনি নিঃশব্দে আমাদের ছেড়ে সরে গিয়েছেন। তবু তো বিমানবাবু আলোকবলয়ের অনতিদূরেই কাটিয়ে গেছেন সারাজীবন। আরও কত কত যে অখ্যাত শিল্পী প্রায় সন্ন্যাসীর ধর্মে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গীতের নির্ভুল পাঠ দিয়ে চলেছেন, ধরে রাখছেন আদি স্বর ও সুরের পরম্পরাকে সে খবর কজন রাখে? কেউ রাখেনা, বাজারচালিত সভ্যতার তা নিয়ে মাথাব্যথাই নেই। কোনও একদিন হয়ত একজন বীতশোক ভট্টাচার্য বা একজন শম্ভু রক্ষিতকে দৈবাৎ আবিষ্কার করে ফেলেন পাঠক। কিন্তু জীবনভর প্রচারের আলোর বাইরে স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকারেই থেকে যান প্রফুল্ল পাল, নিতাই জানা, অশোক মহান্তি, সূর্য নন্দী আর লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের মত কবিরা। বড় লিটল ম্যাগাজিনগুলিও (কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকবে) বাণিজ্যিক লেখকদের উচ্ছিষ্ট নিয়েই মেতে থাকে চিরকাল, দূর গ্রাম মফস্বলের অখ্যাত কবিলেখকদের প্রতি তাদের কিছুমাত্র আগ্রহ থাকেনা।
আমরা চাই, প্রকৃত বড় কোনও প্রকাশক কোনও দক্ষ পরিবেশক কবি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের রচনা প্রকাশ ও প্রচারের দায়িত্ব নিক। অন্তত ক্ষীণতনু একটি নির্বাচিত কবিতার সংগ্রহ প্রকাশিত হোক। তাতে বাংলা কবিতার পাঠকের লাভ বই ক্ষতি নেই। এবং এই কাজ কোনও এক প্রান্তিক কবির প্রতি সহানুভূতি বা অনুগ্রহ নয়, তা আসলে এই সময়ের একটি জরুরী সাংস্কৃতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।