Showing posts with label Ishwar Chandra Vidyasagar. Show all posts
Showing posts with label Ishwar Chandra Vidyasagar. Show all posts

Wednesday, September 18, 2019

বিদ্যাসাগরের ধর্ম ও আমরা


শ্রীনিরদচন্দ্র চৌধুরীর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় (রবিবাসরীয় নিবন্ধ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ জুলাই ১৯৮৮) ঠাঁই জোটে নি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। এই নির্বাচন যে বাঙালি মননে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল এবং ফলস্বরুপ শ্রী চৌধুরীকে যে কত ক্রোধমিশ্রিত সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল তা আমরা সবাই জানি। এই নির্বাচনের ছ’বছর পর একই পত্রিকায় প্রকাশিত (১ ও ৮ মে ১৯৯৪) অন্য দুটি নিবন্ধে শ্রী চৌধুরী কিছুটা যেন কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়াস করেন। তবে নির্বাচনের যথার্থতার প্রমাণ স্বরূপ তিনি যে কারণ গুলি উপস্থিত করলেন তার মধ্যে কয়েকটি অতি মামুলি, হাস্যকরও বটে। যেমন বঙ্গীয় ভট্‌চাজ পণ্ডিতদের মত বিদ্যাসাগরের ভুঁড়ি ছিল না; তিনি বঙ্গসমাজে তখনও অপ্রচলিত একটি কাজ-- নিজস্ব একটি লাইব্রেরী বানিয়েছিলেন; তাঁর চরিত্রে ‘আদর্শপরায়ণতা’, ‘কর্তব্যপরায়ণতা’, ‘নীতিপরায়ণতা’-র মত গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল, যে ধারণাগুলি নাকি (নিরদ সি-র মতে) ইংরেজি শিক্ষার ফলে এদেশে আমদানি হয়েছিল, এবং শব্দগুলি ছিল বাংলায় অপ্রচলিত, ইংরেজির অনুবাদ। যাই হোক, এই কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ে বিদ্যাসাগরের মহত্ব তথা শ্রেষ্ঠত্ব তিনি মেনে নিতে বাধ্যই হয়েছিলেন। বাঙালিদের সঙ্গে আরও যে ব্যাপারটিতে মৌলিক মতভেব ছিল বিদ্যাসাগরের, অথবা অন্যভাবে বললে যা ছিল প্রধান প্রভেদ, তা হল তাঁর ধর্মমত ও ঈশ্বরভাবনা। নিরদ সি এই বিষয়ে বিশেষ বাক্যব্যায় করেন নি (নাকি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন?), অন্য প্রসঙ্গে লিখিত একটি বাক্যে উল্লেখ টুকু আছে মাত্র। কিন্তু এই বিশেষ গুণটিই হতে পারত তাঁকে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার এক মস্ত অজুহাত।  
আজও সাধারণের মধ্যে বিদ্যাসাগরের অলৌকিক দয়া অথবা অবিশ্বাস্য সংবেদনশীলতা নিয়ে আলোচনা কিছুতেই শেষ হয় না। বিধবা বিবাহের প্রচলন, বহু বিবাহ রদ, নারী শিক্ষার প্রসার, কিংবা আদি বাংলা গদ্যের পরিকাঠামো রচনার মত বহু-চর্চিত বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা করতে আমরা অক্লান্ত। তাঁর ধর্মমত অথবা ঈশ্বরবিশ্বাস বিষয়ক প্রশ্নগুলিই বরাবর থেকে গিয়েছে আমাদের অভ্যস্ত মনোযোগের বাইরে। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের চিন্তাভাবনাকে এড়িয়ে চারিত্রিক দৃঢ়তা, অনমনীয় জেদ, অক্লান্ত কর্মতৎপরতা, সর্বোপরি মানুষের প্রতি তাঁর অপার করুণার মূলে নিহিত শক্তির সন্ধান সম্ভবপর নয়। সমসাময়িক মুষ্টিমেয় উদারপন্থী হিন্দু তাঁকে হিন্দু ভেবে আহ্লাদিত হয়েছেন, সংখ্যাগুরু গোঁড়ারা কেউ বলেছেন খ্রিষ্টান কেউ দেগে দিয়েছেন ব্রাহ্ম বলে, ওদিকে আবার ব্রাহ্মরা তাঁকে সতীর্থ বলে মেনে নেন নি। আর ঈশ্বরচন্দ্র একটি প্রায় নির্জন ধর্মমতের উপাসক হয়ে ক্রমাগত একা হয়ে পড়েছেন।
          ঈশ্বর ও ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের রচনা বা বক্তব্য খুবই বিরল, অথবা বলা চলে তিনি এই প্রসঙ্গে বরাবর নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। এবং সেকারণে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীকার বিহারিলাল সরকার প্রশ্ন তুলেছেন-- “অধ্যাপকের বংশে জন্ম লইয়া, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান হইয়া, হৃদয়ে অসাধারণ দয়া, পরদুঃখকাতরতা প্রবৃত্তি পোষণ করিয়া হিন্দু শাস্ত্রের প্রতি, হিন্দু ধর্মের প্রতি তিনি আন্তরিক দৃষ্টি রাখিলেন না কেন?” নানা সময়ে নানা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতামত বিচার করলে তাঁকে ঈশ্বর অবিশ্বাসী বলে মনে হয় না। কিন্তু জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে নিয়ে মাতামাতি যে তিনি পছন্দ করতেন না তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘বোধোদয়’-এর প্রথম সংস্করণে নানা পার্থিব বিষয় নিয়ে শিশুপাঠ্য রচনা থাকলেও ঈশ্বর সংক্রান্ত কোনও কথাই ছিল না। ছিল না প্রত্যাশিত ভাবেই, কেননা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক যেখানে আলোচনার বিষয়, ঈশ্বর প্রসঙ্গ তো সেখানে অপ্রাসঙ্গিক হবেই। প্রথম সংস্করণ দেখে বিদ্যাসাগরের অনুরাগী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এই বলে মৃদু সমালোচনা করেন যে, “মহাশয়, ছেলেদের জন্য এমন সুন্দর একখানি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিলেন, বালকদের জানবার সকল কথাই তাতে আছে, কেবল ঈশ্বর বিষয়ে কোন কথা নাই কেন?” এই মতামতের প্রেক্ষিতে পরের সংস্করণে ঈশ্বর বিষয়ক একটি ক্ষুদ্র অংশ সংযোজন করে দেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত একটি ব্যতিক্রম মাত্র, সারাজীবন তিনি ঈশ্বর প্রসঙ্গ বা ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্ন এড়িয়েই থেকেছেন বলা চলে। রামকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান সহকারেই আপ্যায়ন করেছেন, ব্রহ্ম বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা শুনে নিজের মুগ্ধতাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রামকৃষ্ণকে কথা দিয়েও তিনি দক্ষিণেশ্বরে যান নি, পরে তাই নিয়ে রামকৃষ্ণ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাছাড়া, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করতে গিয়ে আরও দুয়েকবার রুঢ় ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন রামকৃষ্ণ, যা স্মরণ করলে আজ তাঁর ভক্তরাও অস্বস্তিতে পড়বেন (দ্রষ্টব্য শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত)। যাক, সেবিষয়ে আলোচনা করা এই নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। আসলে দুস্থ অসহায় মানুষের কল্যাণ সাধনের যে ব্রত পালনে ব্রতী হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, ঈশ্বর চিন্তায় মেতে উঠলে তাঁর সেই সাধনা ব্যহত হতে পারত। তাঁর কাছে দুস্থ অসহায় হতদরিদ্র মানুষ গুলিই ছিল ঈশ্বর। সম্মুখে উপস্থিত সেই শতশত ঈশ্বরকে উপেক্ষা করে পরম ব্রহ্মের উপাসনায় নিয়জিত হতে তাঁর মন সায় দেয় নি। বিদ্যাসাগরের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায় তিনি প্রায়ই কেঁদে উঠছেন, অসহায় দীনদরিদ্র দুস্থ সংস্কারের শৃঙ্খলে বন্দী মানুষের কষ্টে সেই আপাত কঠোর দৃঢ়চেতা মানুষটি কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছেন না। যিনি দুঃখীর দুঃখে এমন ভাবে অস্থির কাতর, সহায়হীনের জন্য যার হৃদয়ে এতখানি করুণা, তিনি আর কী ঐশ্বর্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে নতজানু হবেন? আসলে মানুষই ছিল তাঁর কাছে সাক্ষাৎ ঈশ্বর, আর মানুষের কল্যাণের জন্য করা কর্মই ছিল তাঁর ধর্ম।
          ঈশ্বর বিষয়ে একান্ত নিজস্ব নিভৃত একটি মতামত থাকলেও ধর্ম বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন প্রচ্ছন্ন বিপ্লবী।  তাঁর অনুরাগী কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁকে বর্ণনা করেছেন একজন নাস্তিক রূপে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বলেছেন ‘অজ্ঞেয়বাদী’। তিনি একবার এক কাশীবাসি ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন যে তিনি কাশী মানেন না, বিশ্বেশ্বরও মানেন না। বেদ-বেদান্তে তাঁর তেমন আস্থা ছিল না, তিনি এগুলিকে বলেছেন “ভ্রান্ত দর্শন”, (“That the Vedanta and Sankhya are false system of philosophy is no more a matter of dispute”)। সংস্কৃত কলেজের পুনর্গঠন সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠাতে গিয়ে তিনি লেখেন, “True is that the most parts of the Hindu system in philosophy do not tally with the advanced idea of modern times.” এবং তাই তিনি সুপারিশ করেন এই কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য দর্শন পঠনপাঠনেরও সুযোগ ছাত্রদের দেওয়া উচিৎ। যাতে ছাত্ররা হিন্দু ধর্মের দোষত্রুটি গুলিও চিহ্নিত করতে পারে। তৎকালীন সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত হতাশ। তিনি তাঁদের তুলনা করেছেন সেই খালিফার সঙ্গে যার নির্দেশে একদা আলেকজান্দ্রিয়ার মহামূল্যবান লাইব্রেরিটি ধ্বংস করা হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের কথায়—“I regret to say that I cannot persuade myself to believe that there is any hope of reconciling the learned of India to the reception of new scientific truths”। এক্ষেত্রে learned বলতে সনাতন পণ্ডিত সামজের কথাই বলা হয়েছে।
সেই যুগে বিদ্যাসাগর ছিলেন নির্মোহ যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একজন বিরল প্রজাতির মানুষ। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সেকুলার। এ প্রসঙ্গে গোপাল হালদার লিখেছেন, “এ দেশে ধর্ম বলতে যা বোঝায়, এবং ধার্মিক লোকেরা ঈশ্বর বলতে যা বঝেন—বিদ্যাসাগর তাতে আস্থা রাখতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল মানবিক ধর্মে। … বিদ্যাসাগরের সমস্ত জীবনের মধ্য দিয়ে আমরা এই মানবধর্মেরই স্বীকৃতি দেখতে পাই—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ আর এ ‘মানুষ’ চণ্ডীদাসের আধ্যাত্মিক মানুষ নন, আধুনিক সভ্যতার সামাজিক মানুষ।” মাইকেল মধুসূদন বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর হলেন “প্রথম মানুষ”। নবজাগরণের কালে বাংলায় যে যুক্তিবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্যাসাগর ছিলেন তার অন্যতম প্রধান পুরোহিত। তাঁর কঠোর যুক্তিবাদ ও তীক্ষ্ণ মেধা তাঁকে সমাজ সংস্কারের বৈপ্লবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রাণিত করেছিল। সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের মত সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা যদি তাঁর থাকত তবে তিনি প্রবল তেজস্বী সংস্কারক হয়ে উঠতে পারতেন না। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম যুগের একজন মানবতাবাদী। বলা চলে, ঈশ্বর ও প্রথাগত ধর্ম বিষয়ে নীরব ও উদাসীন ছিলেন বলেই তিনি তাঁর অভীষ্টে পৌঁছতে পেরেছেন। তাঁর আগে ভারতবর্ষে সনাতন হিন্দু ধর্ম ছিল, বেদ-বেদান্ত ছিল, সেসব দর্শনের সটীক ব্যাখ্যা প্রদানকারী মেধাবী হিন্দু পণ্ডিতও ছিলেন অগণন। কিন্তু কেউ অনুভব করেন নি অকাল-বিধবা একটি রমণীর দুঃখ যন্ত্রণা অসহায়তার কথা, কেউ মাথা ঘামান নি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বা তা প্রচলনের উপায় নিয়ে, কারও মনে হয়নি বহুবিবাহ আসলে কোনও মহৎ কর্ম নয় একটি মূর্তিমান অভিশাপ যার হাত থেকে সমাজকে আশু মুক্ত করা প্রয়োজন। তথাকথিত এক নাস্তিক পণ্ডিতের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল এইসব যুগান্তকারী বিপ্লবের সম্ভাবনা। অতএব একথা কি বলা যায় না যে, ভারতবর্ষের মত একটি অশিক্ষা কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা ভূখণ্ডের পক্ষে নাস্তিকতাই অধিক প্রয়োজনীয়? নবজাগরণের প্রথম বিপ্লবী রাজা রামমোহন রায়ের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র এবং অক্ষয় দত্ত। আর বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি কে ছিলেন ? এ বিষয়ে প্রত্যয় নিয়ে কিছু বলবার আগে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াতে হয় পরবর্তী ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি।
আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে বিদ্যাসাগরের সেই বিপ্লবী চিন্তাধারার কিছুমাত্র মুল্য কি আমরা দিয়েছি? হাজার প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নির্ভর মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে, তার লালন পালন করা দূরে থাক আমরা তার প্রাপ্য মর্যাদা টুকুও দিইনি। বিদ্যাসাগর ছিলেন ভুল দেশে ধূমকেতুর মত দৈবাৎ আবির্ভূত হওয়া এক বৈপ্লবিক জ্যোতি। তাঁর উদ্দিষ্ট পথের কোনও অগ্রপথিক ছিল না, তাঁর অনুসারীও কেউ নয়। আমরা বিদ্যাসাগরের ধর্মে দীক্ষিত হতে পারি নি, তাঁর ধর্মের উত্তরাধিকারী আমরা নই। আজ আমাদের যা ধর্ম সেই ধর্মকে তিনি আজীবন ঘৃণা করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পর থেকেই তাঁর প্রবর্তিত ও অনুসৃত নির্জন ধর্মমতটিকে যত্ন করার পরিবর্তে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়াতেই আমাদের উৎসাহ ছিল বেশি। কঠোর ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের বলে তিনি বিজ্ঞান নির্ভর নির্মোহ যুক্তিবাদের, স্বার্থহীন মানবসেবার, আপসহীন সংস্কার কর্মের যে উজ্জ্বল ধারার প্রবর্তন করে গেলেন আমরা তা আন্তরিক ভাবে আগলে রাখতে পারিনি। নির্বোধের মত সেই অমূল্য সম্পদ অবহেলায় হারিয়ে যেতে দিয়েছি। যে সামগ্রিক জাগরণের আকুলতায় নবজাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার, আশ্চর্যজনক ভাবে ঠিক তার বিপরীত দিকে যাত্রা করেছে বাঙালি সমাজ। নানা মাপের ছোট বড় মাঝারি অবতারদের সামনে রেখে দেশব্যাপী ভক্তিবাদের লহর বইয়ে দিয়েছি আমরা। বঙ্গীয় রেনেসাঁ শেষপর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মের নবজাগরণে। ফিরে এসেছে, বেদ-বেদান্ত, মনুসংহিতা, আর সংগঠিত ধর্মীয় আন্দোলনের যুগ। নিজের শেষ বয়সেই বাঙালির এই অধোগামিতা প্রত্যক্ষ করে গিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র।
সেই ট্র্যাডিশন সোৎসাহে বহন করে চলেছি আমরা। আজ একবিংশ শতকে পা রেখেও অশিক্ষা কুশিক্ষা সংস্কারাচ্ছন্নতায় আবিল আমাদের সমাজ। চারপাশে গোঁড়ামি আর ভণ্ডামির বেসাতি, অসংখ্য সম্প্রদায়, শত শত ছোটবড় অবতার, হাজার হাজার ধর্মীয় আশ্রম। সংবাদপত্রের পাতায়, দূরদর্শনের চ্যানেল চ্যানেলে দিনরাত প্রচারিত হতে থাকে জ্যোতিষ আর গ্রহরত্নের বিজ্ঞাপন, অব্যর্থ বশীকরণের হাতছানি। কিছু কিছু চ্যানেল তো ধর্মের বানী প্রচারের জন্যই নির্দিষ্ট। সমাজে স্বমহিমায় বিরাজ করে জাতপাত আর অস্পৃশ্যতার মত মধ্যযুগীয় অন্ধকার। জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়েছে তাঁকে স্মরণ করবার নৈতিক অধিকার আমাদের আছে কি না। রামেন্দ্রসুন্দর যথার্থ লিখেছেন, “... ঐ নাম গ্রহণ করিতে আমাদের কোনরূপ অধিকার আছে কি না, এ বিষয়ে ঘোর সংশয় আরম্ভেই উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। বস্তুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এত বড় ও আমরা এত ছোট, তিনি এত সোজা ও আমরা এত বাঁকা, যে তাঁহার নাম গ্রহণ আমাদের পক্ষে বিষম আস্পর্ধার কথা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।”
বিদ্যাসাগর কোনও কালেই বাঙালির খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন না। জীবদ্দশায় বঙ্গসমাজকে তাঁর জাগরিত করবার প্রয়াস যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছিল তা ঐতিহাসিক সত্য। বঙ্গভাষীদের জনজীবনে তাঁর প্রভাব ক্ষয়ে যেতে যেতে মৃত্যুর মাত্র একশ আটাশ বছরের মধ্যে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। কাব্য বা সঙ্গীতের জন্য রবীন্দ্রনাথ নজরুল, ধর্মভাবনার কারণে চৈতন্য বিবেকানন্দ, গল্পকার শরৎ বিভূতি আমাদের নিত্যদিনের অনুশীলন, আহ্লাদ। এঁরা আমাদের প্রাণের কাছাকাছি থাকা মানুষ, এমনকি প্রিয় গায়ক নায়ক অথবা ক্রিকেটারের তুলনাতেও এঁরা বোধকরি খুব দূরের নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের মনের মানুষ নন, আমরা তাঁকে ঠাই দিয়েছি মাথার ওপরে, সহজ নাগালের বাইরে। ভালবাসা বা আত্মীয়তার বদলে আমরা তাঁর জন্য বরাদ্দ রেখেছি বাৎসরিক পূজার্চনার ফুল আর অসার ভক্তিময় গোলাকার স্তুতি। কেননা ভালবাসা বা আত্মীয়তার অনেক দায়, পূজা বা ভক্তির কোনও দায় নেই। তাঁর জন্মের এই দুশ’ বৎসর উপলক্ষ্যে রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষটিকে কল্পনা করতেও আমাদের ভয় করে, যেন সরাসরি মধ্যাহ্নের রোদ্রের দিকে তাকানো। তাঁকে তো ভুলে থাকবার বা অস্বীকার করার যো নেই আমাদের, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তাঁর উপস্থিতি সহ্য করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তাঁর মর্মর মূর্তি বানিয়ে মালা পরিয়ে দেওয়া বরং অনেক সহজ সমাধান। একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে ওঠে--আজ দুশ’ বছরের ব্যবধানে ঈশ্বরচন্দ্র যদি পুনরায় এই দেশে আবির্ভূত হয়ে নিজের মুদ্রাদোষে ‘সৃষ্টিছাড়া’ সব সংস্কার কর্মে মেতে ওঠেন তাহলে আমাদের সমাজে মহামান্য রাধাকান্ত দেবের খুব অভাব পড়বে কি?


সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

  1. বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। দে'জ পাবলিশিং 
  2. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ/ বদরুদ্দিন উমর। চিরায়ত প্রকাশন
  3. বিদ্যাসাগর/ চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আনন্দধারা
  4. বিদ্যাসাগর/ বিহারিলাল সরকার। ওরিয়েন্ট বুক
  5. বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ/ বিনয় ঘোষ। বেঙ্গল পাবলিশার্স
  6. করুণাসাগর বিদ্যাসাগর/ ইন্দ্রমিত্র। আনন্দ পাবলিশার্স
  7. কবিতীর্থ পত্রিকার ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ সংখ্যা (জুন ২০১৮)/ উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত
  8. জিজ্ঞাসা পত্রিকার ‘বিদ্যাসাগর বিশেষ সংখ্যা’ (একত্রিংশ বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা, ২০১৩ - ২০১৪)/ স্বরাজ সেনগুপ্ত সম্পাদিত