Saturday, May 18, 2024

মহাকবির প্রহসন-প্রয়াস

 


অবাঙালি পাঠকের কাছে আবহমান বাংলা কবিতার পাঁচজন প্রধান কবির কথা বলতে গেলে তাঁর নাম আসে। এমনকি তিনজনের কথা বলতে গেলেও তাঁকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। তিনি চিরকালের চির-আধুনিক কবি মধুসূদন দত্ত। সমসময়ে অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েই বন্ধু রাজনারায়ণ বসু তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলেন “মহাকবি” হিসেবে। আর একটি ইংরেজি রচনায় একালের প্রাবন্ধিক শিবনারায়ণ রায় স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তায় ঘোষণা করলেন যে মধুসূদনই ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক কবি।

তিনি আজন্ম বিপ্লবী; সারাজীবন, বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে গিয়ে বাজী রেখেছেন নিজের জীবন সংসার পরিবার। উনিশ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, অধিকার হারিয়েছেন বিপুল পৈত্রিক সম্পত্তির, শ্বেতাঙ্গিনি বিবাহ করেছেন, পরবর্তী কালে বিবাহ-বিচ্ছিন্ন না হয়েই অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেছেন অন্য এক শ্বেতাঙ্গিনি নারীর সাহচর্যে, বিদেশযাত্রা করেছেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে, আবার বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকা হাতে পেয়ে তা তৎক্ষণাৎ খরচ করে ফেলেছেন বালকের মতো, সুযোগ পেলেই সাধ্যাতীত বিলাসিতা করেছেন, বন্ধু গৌরদাসকে চিঠিতে লিখেছেন—আমার জীবনযাত্রা বর্ধমান রাজার চেয়েও আড়ম্বরপূর্ণ, বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরেছেন একেবারে নিঃস্ব হয়ে, দেশে ফিরে আইনি পেশায় পসার জমাতে পারেননি, জীবনকে চূড়ান্তভাবে তুচ্ছ্যতাচ্ছিল্য করে দেহত্যাগ করেছেন প্রায় মাঝবয়সেই। আমাদের সাধারণ ছাপোষা বুদ্ধিতে যেমন তাঁর অনেক কার্যকলাপেরই ব্যাখ্যা মেলে না, তেমনই ধারণা করা যায় না তাঁর অতুলনীয় প্রতিভা সম্পর্কে। তিনি যতখানি র‍্যাডিক্যাল ততখানি আর কে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে? পূর্বজ কবির রচনাবলীতে অর্বাচীনের মতো লাথির ঘা না দিয়েও তিনি অসম্ভব রকমের মৌলবাদী শিল্পী। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে সেই মধুসূদন দত্তকে আজ আমরা ঠাঁই করে দিয়েছি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের সুলভ অপরিসর আবাস-যোজনায়। সিলেবাসের বাইরে তাঁর জন্য আর কোনও আশ্রয় রাখিনি আমরা। দুহাজার চব্বিশ সালে তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ, ফলে এবার তাঁর রচনাবলির ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে দুএক পৃষ্ঠা রচনা আমাদের না লিখলেই নয়। কেননা তা না করতে পারলে যে নিজেদের কাছেই নিজেদের মান থাকে না।

          জীবনের প্রথম চৌত্রিশ বছর তিনি বাংলাভাষায় কিছুই লেখেননি, কেননা সেই সময়কালে মাতৃভাষার প্রতি তাঁর কিছুমাত্র অনুরাগ বা আগ্রহ ছিল না। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২—এই চার-পাঁচ বছর সময়ে তিনি রচনা করেন পাঁচটি বাংলা নাটক (শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, একেই কি বলে সভ্যতা?, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং কৃষ্ণকুমারী) আর চারটি কাব্য (তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য এবং বীরাঙ্গনা কাব্য)। এই ক্ষীণ কালখণ্ডটিকে বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে উর্বর তথা ফলপ্রসূ সময় হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। কারণ কালের প্রেক্ষিতে এই এক-পলক সময়ের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে একের পর এক সাহিত্য-বিপ্লব। পরবর্তী জীবনে (১৯৬২ থেকে ১৯৭৩) তাঁর বাংলা লেখালেখি সংখ্যায় একেবারে নগণ্য। উনিশশ’ বাষট্টিতে ইউরোপ-যাত্রা করেন কবি। সেখানে থাকাকালীন অনিবার্য আর্থিক সঙ্কট ও নানা পারিবারিক টানাপোড়েন স্বত্তেও পরীক্ষানিরীক্ষা করেন বাংলা সনেট নিয়ে, রচিত হয় একশটি চতুর্দশপদী কবিতা। মৃত্যুর ঠিক আগে লেখেন “মায়াকানন” নাটক এবং হোমারের ইলিয়াড-আশ্রিত অসমাপ্ত গদ্য-আখ্যান “হেক্‌টর-বধ”। এবং অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে মাদ্রাজ পর্বে তিনি ইংরেজিতে কিছু কিছু গদ্য-পদ্য রচনা করেছেন। কিন্তু মধুসূদনের সাহিত্যকর্ম বলতে মানুষ প্রধানত ওই চার-পাঁচ বছরের লেখালেখির কথাই বোঝেন।

          কী কী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ওই বিশেষ কালপর্বে তা মোটামুটি ভাবে বর্ণনা করতে গেলেও অন্তত চারটি বিষয়ের কথা বলতে হয়। প্রথমত, বাংলা কাব্যে মিলটন প্রবর্তিত আমিত্রাক্ষর ছন্দের (blank verse) প্রথম প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, পয়ারের অভ্যস্ত কাঠামো অতিক্রম করে পদ্যের শরীরে গদ্যের মুক্তি এনে দেওয়া। তৃতীয়ত, পুরাণের চিরাচরিত আখ্যান অংশকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া (বিনির্মাণের এমন চূড়ান্ত উদাহরণ আর কী হতে পারে?)। এবং চতুর্থত, প্রথম রুচিশীল ও শিল্পসম্মত বাংলা নাটক রচনার সূত্রপাত। এসব ছাড়াও বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও মধুসূদনের। অবশ্য বাংলা সনেট তাঁর ইউরোপ-পর্বের কীর্তি। কবির বিদ্রোহী মেজাজের কিছুটা আভাস মেলে বন্ধু গৌরদাস বসাককে ১৮৫৯ সালের ১৯ মার্চ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে। “যা কিছু সংস্কৃত ভাষায় লেখা, তারই প্রশস্তি গাওয়ার অভ্যাস আমাদের পায়ে বেড়ির মতো এঁটে বসেছে। সেই বেড়ি ভেঙ্গে ফেলাই আমার উদ্দেশ্য।” এই চিঠি থেকে মেঘনাদবধ কাব্য সহ অন্যান্য আরও কয়েকটি পুরাণ-আশ্রিত রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

          বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট নাটকের যে নিতান্ত অভাব—সেকথা মধুসূদনের গোচরে আসে যখন তিনি রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত “রত্নাবলী” অনুবাদের কাজ করছিলেন। একপ্রকার জেদের বসেই ১৮৫৯ সালে রচিত হল তাঁর প্রথম নাটক “শর্মিষ্ঠা”। শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রথম সংস্করণের প্রারম্ভে মুদ্রিত হয়েছিল কবির সেই বিখ্যাত কবিতা, যা নানা প্রসঙ্গে নানা উপলক্ষ্যে আজও অকাতরে উদ্ধৃত করে থাকি আমরা। তৎকালীন নাটক নিয়ে কবির মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে এই প্রবেশক রচনাটিতে।

“...

কোথায় বাল্মীকি ব্যাস         কোথা তব কালিদাস,

কোথা ভবভূতি মহোদয়।

অলীক কুনাট্য রঙ্গে            মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে,

নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।

সুধারস অনাদরে              বিষ বারি পান করে,

তাহে হয় তনুমনঃক্ষয়।

...”

         

সঠিক ভাবে দিনক্ষণের হদিশ না মিললেও, বিশেষজ্ঞ তথা ঐতিহাসিকদের ধারণা মধুসূদনের প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল শর্মিষ্ঠার পরে, এবং পদ্মাবতীর আগে। এক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ, কেননা তার আগে প্রহসনের নামে বঙ্গদেশে ছোটখাটো সামন্ত-রাজার রাজসভায় বা জমিদারের অঙ্গনে যে টুকরো নাটক অভিনিত হত সেসব ছিল নিতান্তই চটুল আদিরসাত্মক খেঁউড়ে পরিপূর্ণ একপ্রকার কদর্য পরিবেশনা। “একেই কি বলে সভ্যতা?” এবং “বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” (ড়-এ ও-কার নেই) সেসময় কলকাতার নাট্য-পরিমণ্ডলে উপস্থিত হয়েছিল মূর্তিমান বিপ্লবের মতোই। গ্রীক, লাতিন, সংস্কৃত প্রভৃতি ধ্রুপদী ভাষা চর্চার ফলেই হয়তো মধুসূদন এমন রচনার অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকবেন। এবং আরও স্পষ্ট করে বললে ইউরোপীয় নাটকের প্রভাবই হয়তো ছিল অধিকতর। প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল পাইকপাড়ার জমিদারের প্রতিষ্ঠিত বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে অভিনয়ের জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত নানা কারণে সেগুলি অভিনীত হয়নি, কিছুকাল পরে প্রকাশিত হয় পুস্তকাকারে। দুটি প্রহসনের বিষয়বস্তু একেবারেই ভিন্ন মেরুর। একটিতে দেখানো হয়েছে সে-সময়ের তথাকথিত শিক্ষিত আধুনিক যুবসমাজের মধ্যে পুঞ্জীভূত অন্ধকার। আর অন্যটিতে রয়েছে এক ভণ্ড হিন্দু জমিদারের অনিঃশেষ কাম-লালসা চরিতার্থ করার নানা ছল-কৌশল এবং তার কৃতকর্মের উপযুক্ত ফল প্রাপ্তির বিবরণ। এই দুটি রচনাও মধুসুদনের নিজের তাগিদে লেখা নয়, লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের তাগাদায়। ঈশ্বরচন্দ্র চাইছিলেন মূল নাটকের শেষে অভিনয় করা যায় এমন ‘ফার্স’, যাতে দর্শক অভিনয় দেখে হালকা মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। সেই ফরমায়েসের লেখাই এমন ভাবে লিখলেন যে তা হয়ে দাঁড়াল আইকনিক এবং কালজয়ী। সুকুমার সেন লিখেছেন, “এই দুইখানি গ্রন্থ বাঙ্গালা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনার অন্যতম”। পরে দীনবন্ধু মিত্র যখন “সধবার একাদশী” লিখলেন তিনি মধুসূদনকে অনুসরণ করলেন গুরুর মতো।

বৃন্দাবন-ফেরত ধর্মপ্রাণ কর্তা মশাই, তাঁর কলেজে পড়া পুত্র নব, নব-র বন্ধু কালী প্রমুখকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে “একেই কি বলে সভ্যতা?”। কাহিনির প্রয়োজনে এসেছে অন্তঃপুরবাসিনী কিছু স্ত্রীলোক, কজন বারবিলাসিনী, এবং আরও কিছু অকিঞ্চিৎকর চরিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রহসনের আখ্যান অংশ বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে কমবেশি পরিচিত। কয়েকজন ধনির দুলাল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত তথাকথিত আধুনিক এবং সংস্কারপন্থী যুবকের বিপথগামিতাই এই ব্যাঙ্গ-নাটিকার উপজীব্য। মধুসূদনের আক্রমণের লক্ষ্য এক্ষেত্রে সেই যুবককুল যাদের কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন বঙ্গীয় তথা ভারতীয় সমাজের সংস্কারসাধন আসলে প্যাসন নয়, ফ্যাসন। সমাজ সংস্কারের চেয়ে নিজেদের ইউরোপীয় কালচারের সঙ্গে মানানসই করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। ভোগ-বিলাস ছাড়া তাদের কোনও মহত্তর লক্ষ্য নেই। ফলত শেষপর্যন্ত তাদের সংস্কারকর্মের গতি যথেচ্ছ সুরাপান আর গণিকাগমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। নাটকে এক জায়গায় উল্লিখিত হয়েছেন স্বয়ং রামমোহন। অনেকে বলেন নব বাবুর জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা আসলে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানোপার্জিকা সভারই প্রতিরূপ। মধুসূদন সমাজ সংস্কারক নন, তিনি শিল্পী। শিল্পীর দৃষ্টি মোটাদাগের লাভ-লোকসানের হিসেব অতিক্রম করে সুক্ষ্মতার দিকেই। এই নাটকের ক্ষেত্রে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য আংশিক ভাবে তিনি নিজেও। কেননা একসময় তিনিও তো ইয়ং বেঙ্গলের অনুসারীই ছিলেন। বিষয়বস্তুর কথা ছেড়ে দিলেও লিখনশৈলী ও ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মধুসূদন অকল্পনীয় দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। বিশেষত নাটকের শেষের দিকে বাড়ির মেয়েদের তাসখেলা ও গল্পগাছার যে দৃশ্যের অবতারণা তিনি করেছেন তা যে প্রায় দুশ বছর আগে রচিত বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় আমাদের। বাড়ির মেয়েদের মুখে এমন সাহসী সংলাপ বসাতে আজকের নাট্যকারও দুবার ভাববেন।

“বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” নাটিকার নাম মধুসূদন প্রথমে দিয়েছিলেন “ভগ্নশিব মন্দির”। পরে পাইকপাড়ার ছোট রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ নাম বদলের প্রস্তাব করেন। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় নাট্যকার প্রদত্ত নামটিই ছিল অধিকতর ব্যাঞ্জনাময়। সেসময়ের গোঁড়ামি ভণ্ডামিতে পরিপূর্ণ আচার-সর্বস্ব কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুধর্মের জন্য ভগ্ন-শিবমন্দিরের চেয়ে উপযুক্ত উপমা আর কী হতে পারে? নাটকটি শুরুই হয়েছে দুই গরিব খেটে খাওয়া মানুষের হতাশাপূর্ণ আলাপের মাধ্যমে, যা সেকালের পক্ষে একেবারেই বিজাতীয়। মূল গল্পের দিক থেকে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’-র চেয়ে ‘বুড় সালিক...’ অনেক আঁটসাঁট। আগেরটিতে চরিত্রের সংখ্যা প্রায় চব্বিশ আর দ্বিতীয়টিতে মাত্র নয়। ভক্তপ্রসাদ একজন বুড়ো বৈষ্ণব জমিদার, তার কাম-লালসার কোনও শেষ নেই। পুঁটি নাম্নি এক বিধবা রমণী জমিদারের চোখে পড়ে যাওয়া গ্রামের মেয়ে-বউদের ফুসলিয়ে নিয়ে এসে যোগান দেয় তার ভোগের জন্য। এই কাজ সে করে চলেছে ত্রিশ বছর যাবত, এবং এভাবে যে সে কত মেয়েমানুষের ‘পরকাল’ খেয়েছে তার ঠিকানা নেই। এবার তার লক্ষ্য হানিফ গাজির বউ ফতেমা। কথামতো সে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় (ভগ্নশিবমন্দির প্রাঙ্গণ) ফতেমাকে নিয়েও আসে কিন্তু ভক্তপ্রসাদ শেষ পর্যন্ত সফলকাম হতে পারে না, কেননা সেখানে আগে থেকেই ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল হানিফ। বেশ কৌতুকময় একটি দৃশ্যের মাধ্যমে নাটিকাটি শেষ হয়। বিস্তর অর্থদণ্ড দিয়ে এবং ‘জবন’-এর কাছে বারংবার ক্ষমাপ্রার্থনা করে কোনওমতে নিস্তার পায় লম্পট জমিদার। এই নাটিকার বেলাতেও ভাষা ব্যবহারে আশ্চর্য কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন মধুসূদন। তিনি নিজে সারাজীবন কাটিয়েছেন কলাকাতার শিক্ষিত অভিজাত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাহচর্যে। সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন, অনেকগুলি ধ্রুপদী ভাষার চর্চা করেছেন। সেই তিনিই যখন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য, লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়া বাড়ির মেয়েদের জন্য অথবা অন্ত্যজ মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য সংলাপ রচনা করেন তখন তা অবিশ্বাস্য ভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—এই সব মানুষদের সঙ্গে তিনি মিশলেন কবে, কীভাবে জানলেন এদের ব্যবহৃত ভাষা? কয়েকটি মাত্র সংলাপ, তাতেই চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম নাটিকার সারজন চৌকিদার মুটিয়া কিংবা দ্বিতীয় নাটিকার ভগী পঞ্চি আনন্দবাবু সবাই যেন পাঠকের প্রত্যক্ষভাবে চেনা।

স্বাভাবিক কারণেই নাটিকাদুটি সমসময়ে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চের জন্য রচিত হলেও শেষপর্যন্ত নাটিকাদুটি সে-মঞ্চে অভিনীত হতে পারেনি। দুটি প্রহসনের জন্য রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন দুটি ভিন্ন দলের মানুষ। এমন একশ্রেণির মানুষও তৎকালীন কলকাতা শহরে ছিল দুটি নাটিকাই যাদের কাছে অসহ্য মনে হয়েছিল। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে দুটি প্রহসনের সংযোজক হিসেবে ক্ষীণ একটি সূত্র রেখে দিয়েছেন নাট্যকার। গ্রামীণ জমিদার ভক্তপ্রসাদের ছেলে অম্বিকাও কলকাতা প্রবাসী এবং হিন্দু কলেজের ছাত্র, যে হিন্দু কলেজ তখন ইয়ং-বেঙ্গলিদের আখড়া। নববাবুদের মতো কোনও একটি সংস্কারপন্থীদের দলে ভিড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। ফলে দুটি নাটিকার একটি সাধারণ চরিত্র হিসেবে নিজেকে বা নিজের কোনও পরিচিত জনকে যদি কেউ কল্পনা করে নেন তবে তাকে দোষ দেওয়া চলে না, বরং তার কল্পনাশক্তির প্রশংসাই করতে হয়। ১৮৭৩ সালে পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর “বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাব”-এ ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’-র উচ্ছসিত প্রশংসা করলেও সমালোচনা করেছিলেন ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটিকার। একজন পরম বৈষ্ণবের পক্ষে এতখানি অধঃপতিত হওয়া অথবা যবনী-সংসর্গ করা সম্ভব বলে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে মধুসূদনের প্রহসনটি ছিল ভ্রান্তিমূলক এবং সমাজের পক্ষে হানিকর। কার পক্ষে কী সম্ভব আর কী অসম্ভব আজ অবশ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে পাঠকের কাছে।

          শিরোনামে জুড়ে দেওয়া ‘প্রয়াস’ শব্দটি নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে মধুসূদনের অধিকাংশ রচনাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে পড়ে। কিছু না কিছু তাৎক্ষণিক আবেগ, তাগিদ, উৎসাহ বা প্ররোচনা থেকেই তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টি। তাঁর নাটক, কাব্য বা অন্যান্য রচনা ফাইনাল প্রোডাক্ট বলতে যেমন বোঝায় ঠিক তেমন নয়। নিজের জীবনের মতোই তাঁর সবকিছুই যেন স্বতঃস্ফুর্ত, অসম্পূর্ণ এবং অসম্পাদিত। তিনি যদি আরও পাঁচ-সাতটি নাটক, আরও কয়েকটি প্রহসন, আরও কিছু মহাকাব্য ও সনেট রচনা করতেন তবে হয়তো আমরা তাঁর পূর্ণরূপে বিকশিত প্রতিভার প্রকাশ দেখতে পেতাম। তিনি যদি রবীন্দ্রনাথের মতো সুদীর্ঘ সৃষ্টিশীল আয়ু এবং একটা সুসংগঠিত জীবন পেতেন তবে হয়তো তাঁর তেজে ও দীপ্তিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ মনে হত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। কিন্তু নানা কারণে সেই মহাজাগতিক স্ফুরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তাই তাঁর প্রায় সমস্ত রচনাতেই একধরণের অধীরতা ও অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করি আমরা। তাই তাঁর সমস্ত রচনাই আজও জায়মান উত্তপ্ত এবং স্পন্দনশীল।    

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১) বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খণ্ড/ সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৪।

২) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, ৭ম খণ্ড/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ন বুক এজেন্সি, ১৯৯২।

৩) মধুসূদন/ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩।

৪) মধুসূদন: ব্যক্তি ও সৃষ্টি/ সম্পাদনা সুকুমার রায়, ঘোষ দস্তিদার পাবলিশিং কনসার্ন, ১৯৯৫।

৫) মধুসূদন রচনাবলী/ সম্পাদনা সব্যসাচী রায়, সাহিত্যম, ২০১৫।


Friday, November 20, 2020

অশ্রুবর্ণের কবিতা

ব্রাজিলে যেমন ফুটবল-সংস্কৃতি বাংলায় তেমনই কবিতা-কালচার। শতশত কবি, লক্ষ লক্ষ কবিতা। ২০২০-র বইমেলাতেই সহস্রাধিক বাংলা কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এখন কথা হচ্ছে, এত এত রচনার মধ্যে মৌলিক-এর সন্ধান করতে গেলে সাধারণ পাঠকের সম্মুখে পেল্লাই খড়ের গাদা। পরিশ্রমী গবেষকদের কী দশা তা অবশ্য আমরা জানি না। শিয়ালদা মেইন-লাইনের ভিড়ের মত গায়ে গা সেঁটে থাকা বিষয়বস্তু, বাজার-চলতি ফ্যাশনের মত ছাঁচে ঢালা লিখনশৈলী। যেন বাঙালির চোখে চিনাম্যানদের মস্ত একটা মেলা। এরই মধ্যে দৈবাৎ এক-একটা অন্যরকম প্রয়াস, যা আনমনা পাঠককেও চমকিত করে দিতে পারে। হরপ্রসাদ সাহুর “আমার আমিকে বলি” তেমনই এক কাব্য-পুস্তিকা। 
            
            মাত্র দু-ফর্মার আয়তন, ক্রম-চিহ্নিত আটাশটি ছোটো-ছোটো লেখা। কবি হিসেবে হরপ্রসাদ সাহু প্রধানত রোম্যান্টিক, প্রেমই তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। কিন্তু এই বইতে তিনি একেবারে অচেনা অবতারে। এতদিনের লেখালেখির সূত্রে তাঁর কলমে জমে ওঠা সুন্দরের সমস্ত সংস্কার চৌচির হয়ে ভেঙ্গে পড়েছে। অবশ্য এই বইতে সৌন্দর্য নির্মাণের কোনও চেষ্টা করা হয়নি। নিজেকে আড়ালে রেখে হোমোজিনিয়াস ফ্ল্যাটবাড়ির মতো শব্দের কৃত্রিম ইমারৎ গড়ার বদলে এখানে হাজির করা হয়েছে নিজেরই ঘাম-রক্তমাখা হতশ্রী জীবন। কবিতা তো আসলে একটি বিশেষ ভাষা মাত্র। অধিকাংশ কবিতা-লেখক সারাজীবন ব্যাপী সেই ভাষার পরিচর্যা এবং অনুশীলনেই কাটিয়ে দেন, ভাষাটি ব্যবহার করে উঠতে পারেন না। হরপ্রসাদ পরিণত বয়সে এসে সেই ভাষাকে এবার কাজে লাগালেন। না, কোনও প্রতিবাদ বা পালটা মারের কথা নেই এখানে। অসহায় অপমানিত একজন মানুষ, যার চারপাশ থেকে আচমকাই সরে গিয়েছে সমস্ত বন্ধু ও নিকটজন, তিনি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছেন। নিজেকে নিজেই ধুলো ঝেড়ে টেনে তুলছেন, চেষ্টা করছেন আবার সোজা হয়ে দাঁড়াবার। প্রসিদ্ধ জনপ্রিয় কোনও রাগের আলাপ নয়, হঠাতই শিল্পী যেন শোনাতে শুরু করেছেন নিজের দুঃখের কথা হতাশার কথা। এই পথেই তো আর্টের অঙ্গনের মধ্যে জীবনের জরুরি অনুপ্রবেশ ঘটে থাকে। 
            
            অনুমান করা চলে, এই কবিতাগুলি রচনার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল অন্তত তিন বছর আগে, যখন প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর চারফর্মার কবিতাসংগ্রহ “এবং একটি গাধা” (২০১৭)। সে-বইয়ের পাতায় পাতায় ছিল নিজের প্রতি তীব্র শ্লেষ আর বর্তমান বইটিতে ছড়ানো রয়েছে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া নিজের জন্য সান্ত্বনা করুণা ভালোবাসা। পড়লে বোঝা যায়, কবিতাগুলি রচিত হয়েছে একটানা, হয়তো বা দুয়েক সপ্তাহ সময়সীমার মধ্যে, কোনও এক আবেগে আচ্ছন্ন অবস্থায়। কবি হিসেবে এ এক নতুন নিরীক্ষা হরপ্রসাদ সাহুর। এই বইয়ের ভাবগত একাগ্রতার উপমা খুঁজতে গেলে মনে পড়ে যায় সম্প্রতি প্রকাশিত জয় গোস্বামীর “মরীচিকা”-র কথা। আসুন পাঠক, আমরা একগুচ্ছ আনকোরা কবিতার উত্তাপ নিই। 

আমার আমিকে বলি/ হরপ্রসাদ সাহু, বাকপ্রতিমা, মহিষাদল, ২০২০, ৩২ পৃষ্ঠা, ৫০ টাকা।

Friday, November 13, 2020

একটি কিশোরী, তার হাঁস এবং অন্ধ চরাচর

দিনের আজ মাত্র দ্বিতীয় প্রহরেই, যেন অসময়ে জাগ্রত কামেচ্ছার মত, অন্ধ হয়ে এল চরাচর। আষাঢ় মাস। খালপাড়ে ঝুপসি হিজলগাছের তলায় অন্ধকার গভীরতর। দুপাশে কোমর সমান উঁচু ঘাস, মাঝখানে ঘোলা জলের উচ্ছল ধারা আর তার ওপর এসে নেমেছে হিজলগাছের আওতার পরত। দিগন্তের গ্রামগুলির সবুজ সীমারেখা ধোঁয়াটে আবছায়ার ভেতর ডুবে গেছে। জাম রঙের গুরুভার মেঘ ঝুলে নেমে এসেছে মাঠের ওপর। মাথার অতি নিকটেই যেন তার গুমোট শ্বাসবায়ু টের পাওয়া যায়। বিস্তৃত মাঠের অধিকাংশই জলমগ্ন, আউশধানের মাথা জেগে আছে কোনও কোনও জমিতে। আর চিহ্ন বলতে প্রায় নিমজ্জিত আলপথগুলির ওপর ভেসে থাকা গুচ্ছ নরম সবুজ কাঁটার মত ঘাসের ডগা। হঠাত চাপা গম্ভীর গুরুগুরু ধ্বনি বেজে উঠল দূর আকাশে। আর সেই ধ্বনির গা থেকে গড়ানো প্রতিধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে আরও ক্ষীণ হয়ে এল আলো। এমত সময়ে কাদের বাড়ির এতগুলি হাঁস হারিয়ে গেল? জলের ভেতর কোথাও কোনও বাঁধ নেই আজ। কত গৃহস্থের পুকুরডোবা ভেসে গেছে, ঘাটের জল মাঠের জল খালবিলের জল সব একাকার। ইতিউতি ঘাই দিচ্ছে পাড় ডিঙ্গিয়ে আসা রুইকাতলা। কই ল্যাটা সিঙ্গি মাগুর শোল এরা সব শ্রমজীবী অন্ত্যজ রমণীদের মত। খালে বিলে ধানক্ষেতে তাদের দর্শন পাওয়া কোনও বিশেষ ঘটনা নয়। কিন্তু রুই কাতলা মৃগেল যেন অভিজাত অন্তঃপুরচারিনী। তাদের দৈবাৎ চোখের নাগালে পেলে হাটুরে মানুষের দেহে মনেও রোমাঞ্চ লাগে। চার পাঁচ ছয় সাত, না আরও আরও, ঐ দূরে বুড়িডাঙ্গার দিকে আরও দুজন। গাঁয়ের তাক জানা লোকজন দুর্যোগের ভেতর মাছ শিকারে বেরিয়েছে আজ। তাদের হাতে হাতে চাবিজাল, কোমরে মাছ রাখার খালুই। হঠাত তাদের দেখলে একপায়ে দাঁড়ানো স্তিতধী বকের উপমা মনে আসে। চাবিজাল মানে আড়াই-তিন হাত ব্যাসের একটি বাঁশবাখারির বৃত্তের সঙ্গে আটকানো শঙ্কু আকৃতির জাল। আর ঠিক তাঁবুর মত করে বাঁশের তিনটি টুকরো ঐ বৃত্তের গায়ে সমদূরত্বে বাঁধা, এগুলি হাতল। দিগন্তবিস্তারী প্লাবিত প্রান্তরে ধ্যানমগ্ন নির্জনতা। এই কয়েকটি মানুষের উপস্থিতিতে তা বিঘ্নিত হয়নি, বরং আরও যেন স্থিতধর্ম। কারণ মানুষগুলি প্রকৃতির এই তমোরূপের সঙ্গে অব্যর্থভাবে লগ্ন হয়েছে। তাদের প্রত্যেকের চারপাশে পর্যাপ্ত পরিসর, এবং এই পর্যাপ্ততা কোনোরকম দ্বন্দ্ব বা প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। মাঠের সংলগ্ন তিন-চারটি গ্রাম থেকে মাত্র এই কজন এমন অসাধারণ দুর্যোগ মাথায় নিয়ে শিকারে বেরিয়ে আসতে পেরেছে আজ। তাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও প্রাণহীন নিশ্চল প্রস্তর মূর্তির মত মনে হয়। এমনিই নিষ্ঠা ও একাগ্রতা। এদিকে, এক, দুই, তিন, চারটি হাঁস ঘাসের জঙ্গল থেকে সার দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। অসম্ভব শুভ্র সুঠাম হাঁসগুলি, একে একে প্রকাশিত হতে যেন চারটি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল হিজলগাছের তলায়। কমলা রঙের সুচারু ঠোঁট ও পা-জোড়া। তাদের শরীরের সীমারেখায় আলোর চতুস্পার্শে বিচ্ছুরিত চোখধাঁধানো দ্যুতি। এমন অনুপম শ্রী বর্ণনায় ‘স্বর্গীয়’ শব্দটির ব্যবহার চিরকালের রীতি। হাঁসগুলি নিতান্তই নবীন এবং অবোধ, তাই এমন স্বচ্ছন্দ ও নির্ভয়। খালের স্রোতের বিপরীতে তারা সাঁতার দেয়, তাদের গতি আর জলের বেগ পরস্পর কাটাকুটি করে তাদেরকে মোটামুটি এক জায়গাতেই আটকে রাখে। ঘোলা জলের স্রোত বাড়ছে, আরও ঘন হয়ে আসছে আকাশের কালিমা। গুরুগুরু করে মেঘ ডেকে উঠল আবার, জোলো হাওয়া এক ধাক্কায় যেন দ্রুততর হয়ে উঠল। জীবনের এই প্রথম আষাঢ়, এই প্রথম প্লাবন, এই প্রথম সীমানা অতিক্রম করে আসা। জ্যোৎস্নার মত নরম নিষ্কলুষ এই আলো, উদার ভাবে জলকাদা অন্ধকার মাখা প্রান্তরে ফুটে উঠেছে। পালকগুলি অতিশয় তৈলাক্ত ও চিকন, তাই পিছলে যাচ্ছে প্লাবনের ক্লেদ। দূরবর্তী মানুষগুলি সম্পর্কে বিষদ বর্ণনা দিতে যাওয়া বৃথা, কেননা তাদের বিষয়ে আপনারা অর্থাৎ এই আখ্যানের পাঠকবর্গ যথেষ্টই জানেন। তারা মোটামুটি মধ্য বয়সী, তবে কুড়ি-বাইসের এদিক ওদিক দুএকটি তরুণ অথবা ষাটোর্ধ এক-আধজন প্রবীণের উপস্থিতিও অস্বাভাবিক নয়। সবাই দক্ষ শিকারি, শিকারের নেশা তাদের রক্তের মধ্যে ঢেউ তোলে। নিজস্ব পুকুর-ডোবাও আছে অনেকের। তবে এই কূলহারা দুর্যোগের দিনে, অপরের ঘরে পালিত পুষ্টিপ্রাপ্ত মাংসের স্বাদই আলাদা। এরা সবাই যে খুব মাছমাংস পছন্দ করে এমন নয়। যেমন ঐ গোবর্ধন দাসের জমির কোনায় যে মানুষটি জাল হাতে দাঁড়িয়ে, বলরাম মণ্ডল, তার বয়স পঞ্চাশের ওপাশে। বাম চোখের দৃষ্টি তার অস্বচ্ছ। দুবছর হল মাছ-পেঁয়াজ ত্যাগ করে গলায় তুলসীর মালা নিয়েছে। তাছাড়া শেষের দিকে নাছোড় অম্বলের জ্বালায় বড্ড কষ্ট পাচ্ছিল সে। আমিষ ত্যাগের ক্ষেত্রে সেটাও একটা প্ররোচনা হতে পারে। তবে তার মাছ ধরার নেশাটি এখনও অটুট। আগে তার কথাবার্তা ছিল ভারী অমার্জিত আর অশ্লীল, এখন তাতে যুক্ত হয়েছে খানিকটা আরোপিত বিনয়। সুদের কারবারি রাধেশ্যাম দের বয়স বোঝা দায়, কারণ মাথার কেশ থেকে শুরু করে সারা অঙ্গের রোম প্রথম যৌবনেই পাক ধরে সাদা হয়ে গেছে। আর মেদ-মাংসহীন সিড়িঙ্গে চেহারা তার। বড় ছোট মিলিয়ে নিজেরই চার-পাঁচটি পুকুর, দুবেলা ভাতের সঙ্গে আঁশগন্ধ না হলে তার চলে না। নিজের বাড়িতে মাছের অভাব নেই তবু যে কী তাড়নায় সে এই দুর্যোগ মাথায় করে বেরিয়েছে তা সেই বলতে পারে। নাকি সেও বলতে পারে না? তবে শুধু মাছ নয় যেকোনো ধরণের মাংসর প্রতিই তার তীব্র লোভ। সে পাখপাখালি হোক ছাগল-ভেড়া হোক কি কাছিম। বিমল হাইতের বয়স গেল কিন্তু বাসনা গেল না। তার বউ ভারী শীতল প্রকৃতির মেয়েমানুষ, আর সে ছোঁক-ছোঁক করে বেড়ায় এপাড়া ওপাড়া। সারাদিন হতাশায় হাহুতাশ করাটা তার অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। জগতের কিছুই যেন আজ আর তার রসনা তৃপ্ত করতে পারে না। নিন্দুকেরা বলে বিমলের সব চেয়ে বেশী অরুচি নাকি ফর্সা মেয়েমানুষে। একটি নারীঘটিত কারণে একবার তার বিঘে খানেক ধানি জমি জরিমানা হিসেবে লিখে দিতে হয়েছিল। যেখানে এই খাল গোটাকয়েক তাল-খেজুরকে পাশ কাটিয়ে পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে সেখানে ওঁত পেতে আছে মংলা মান্ডির ছোট ব্যাটা রিটু। রিটু একবার অভাবের তাড়নায় ব্রজ বেরার একটা ছাগলছানা চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে যায়। সে আজ বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা, রিটুর তখন পনেরো চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স। বেধড়ক মার খেয়েছিল সে সেদিন। লোকে বলাবলি করেছিল, সাঁওতালদের ছেলে বলে এ যাত্রা টিকে গেল। এমন মার কোনও মানুষের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। সেই রিটু আজ হাট্টাকাট্টা যোয়ান, সুঠাম তেল চোয়ানো শরীর। তাকে দেখলেই এখন গড়পড়তা দুচারজন জন যুবকের বুক কেঁপে যাবে। রেল শহরে ট্রাকের মাল বওয়ার কাজ করে রিটু। আজ সকালে কাজে বেরোতে পারেনি বলে এই মাঠে এসেছে মাছের খোঁজে। এমন আরও কয়েকজন। সবার পরিচয় দিতে গেলে আপনাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। তাছাড়া কিছুই তো আপনাদের অচেনা অজানা নয়। কারণ এই আষাঢ় এই চরাচর এই গাঁগেরস্থ সব সব আপনাদের সবার জীবনের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জীবন। ওদিকে, গ্রামের দিক থেকে জলে প্রায় তলিয়ে যাওয়া খালপাড় ধরে এগিয়ে আসছে, কাদের বাড়ির মেয়ে গো? সদ্য ফোটা পত্রমুকুলের মত একটি কিশোরী। তার হাঁসগুলি হারিয়ে গেছে এই অন্ধকার বাদল দিনে। প্রথমে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে নিজেদের ঘাট-ঘাটলা। তারপর পাড়াপড়শির পুকুরডোবা, গোয়াল, হাঁসমুরগির ঘর। কোথাও নেই, জীবনের চেয়ে অধিক প্রিয় হাঁসগুলি এমন নিঃসাড়ে গেল কোথায়। সকালে সূর্যোদয়ের ঠিক পরে পরেই ধূমল পর্দার মত বৃষ্টি নেমেছিল। একটানা প্রায় দেড়-দুই ঘণ্টা সময়। সেই সুযোগেই কি পালিয়েছে, নাকি চুরি হয়ে গেছে নিরীহ প্রানীগুলি। বাবা মা পই-পই করে নিষেধ করেছিল। ওসব জলের পাখি জলে জলেই আছে ঠিক কোথাও। তোকে এমন উতলা হতে হবে না। কোথায় খুঁজবি এই বানের দিনে। যদি কোথাও চলেই যায় তো যাক। আবার এনে দেব, এবার আর পাতিহাঁস নয়, রাজহাঁস। আরও সুন্দর আরও ফর্সা। এই দুর্যোগে তুই যাসনি মা, কথা শোন। তখনকার মত কথা শুনেছিল মেয়েটি। তারপর সুযোগ মত মা-বাবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে এসেছে মাঠের দিকে। কারণ তার মন বলছে হাঁসগুলি নির্ঘাত কুল হারা জলের লোভে এদিকেই চলে এসেছে। উঠোন পেরলেই আজ যেহেতু সবখানে জল, তাদের কি আর আনন্দের সীমা থাকার কথা। পুকুরপাড়ের বাঁশঝাড় পেরিয়ে এলেই মাঠ। গ্রামের পাশ দিয়ে একটি সঙ্কীর্ণ সেচখাল বয়ে গেছে। কৃষিকর্মের দিনগুলিতে এই খালপাড় পথের ভূমিকা পালন করে। সেই পথই নিয়েছে মেয়েটি। গ্রাম ছেড়ে মাঠের মধ্যে বেরিয়ে আসতেই নতুন জগত। প্রান্তরের রং নীল ও কালো মেশানো ঘন সবুজ, থৈ থৈ সাদা জলতল আর তার ওপর উপুড় হয়ে আছে একটি ঘুটঘুটে অন্ধকার আকাশ। মেঘের বুকে মেঘের পিঠে মেঘের গায়ে গায়ে মেঘের পরত। এমন পটভূমিতে মেয়েটির বাসন্তী ফ্রক উজ্জ্বল ভাবে আঁকা হয়েছে যেন। সে এখন অনেক দুরের অবস্থান থেকেও দৃশ্যমান। ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু হয়েছে। জলরঙের স্বচ্ছ পর্দার মত সিক্ত বাসন্তী বর্ণের আচ্ছাদন ভেদ করে ফুটে উঠেছে তার অর্ধস্ফুট স্তনবৃন্ত। শুভ্র পায়ের পাতা জল মাখা ঘাসের ওপর দিয়ে সঞ্চারমান। ঘাসের ধারালো আগার স্পর্শ পায়ের তলা থেকে স্নায়ুপথ ধরে ছড়িয়ে পড়ছে শরীরময়। মনের একচ্ছত্র দুশ্চিন্তাকে ঠেলে সরিয়ে যৎকিঞ্চিত স্থান করে নিয়েছে রোমাঞ্চ ও বিস্ময়। সদ্য ঋতুমতি কন্যা সে, চারপাশে তার অপার নবীনতা। যেন সকালবেলার প্রথম আলোয় প্রতীয়মান দৃশ্যাবলী। তার চক্ষুদুটি আয়ত ও স্বপ্নালু, দুটি রোগা লাউডগার মত সবুজ হাত হাওয়ায় উন্মুখ। ফেব্রুয়ারির স্কুলে স্কুলে যে দেবী সরস্বতীর আগমন ঘটে তাঁর নির্মাণ বোধকরি এই কিশোরীর রূপের অনুসরণেই। কেননা তাকে দেখলে বলতে ইচ্ছে করে, তোর বীণা কই গো মেয়ে? (প্রথমাংশ)

Thursday, September 3, 2020

ক্ষোভের বাগান

 

Painting by Harpreet Singh









যশস্বিনী শুভ্রবাস গম্ভীর বড়োদিদিমণি

নিবেদিতা গার্লস

বকুল-ছাতিমে ঢাকা নিবিড় ছায়ার তপোবন

শ্যাওলা-শীতল

সারাদিন পাঠদান, অনুশীলনের শৃঙ্খলা

সকালে রেওয়াজ

নিয়মের তীক্ষ্ণধার, মা-বাবার সুখতন্দ্রাবেশ

পাষাণী আগল

চারপাশে সুনামের সুউচ্চ প্রাকার, উড়ে আসে

সাইকেলের বেল

কখনো উচ্ছল হাসি, এ ওর শরীরে ভেঙ্গে পড়ে

ভীরু রোদ্দুর

অনাহত বক্ষগুলি প্রথম পাতার মতো উদ্ভিদের

অধীর সবুজ

সমস্ত বাগান জুড়ে বর্ণময় লতা-ঝোপঝাড়

পোকা প্রজাপতি

কেবল মালীটি অন্ধ, চোখে কালো চশমা তার

নিঃসাড় দেহ।

 

প্রতিটি যত্নের ফাঁকে, প্রতিটি বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে

হিম অভিমান

গরবিনি বিদ্যালয়, দিনে দিনে পূর্ণ হয়ে ওঠে

ক্ষোভের বাগান।


Saturday, March 21, 2020

প্রফুল্ল পাল: একজন পরিচিত অপরিচয়ের কবি


দশকওয়ারি শ্রেণিবিভাগে প্রফুল্ল পাল গত শতকের সাতের দশকের একজন কবি। তিনি স্বভাবকবি নন, বাঙালি হিসেবে তাঁর কাব্য রচনার সূচনা কিছুটা বিলম্বেই। প্রথাগত শিক্ষায় বেশ খানিক অগ্রসর হবার পরই তাঁর কবিতাচর্চার হাতেখড়ি। কিশোরবেলার কোনও অস্ফুট অপরিণত প্রেম ও তজ্জনিত হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস থেকে যে তিনি কবিতা রচনায় অনুপ্রাণিত হননি সেকথা প্রমাণ সহকারেই পেস করা যায়। কেননা কবিতা মুসাবিদা করার আগেই তিনি সাফল্যের সঙ্গে প্রেম প্রণয় এবং পরিণয়ের ব্যাপারটি সংঘটিত করে ফেলেন এবং তদুপরি তাঁর মাত্র এক থেকে দেড় শতাংশ কবিতাই কেবল প্রেমের। সত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামবাংলার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর কবিতা লিখতে আসা এবং লেখালেখির জগতে প্রবেসের পরই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি অনুরাগ ও পক্ষপাত। পরবর্তী কালে যে রাজনীতির অনপনেয় চিহ্ন মুদ্রিত হয়ে থাকবে তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে। স্বাভাবিক ভাবে, তাঁর ক্ষেত্রে স্বপ্নে পাওয়া বা ঘোরের মধ্যে কবিতা লিখে ফেলার কোনও গল্প থাকার কথা নয়। এবং নিজের প্রতিটি শব্দ বাক্য অনুচ্ছেদে তাঁর প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব।
          তিনি লোকপ্রিয় কবি নন। প্রথাগত ছন্দকে তিনি প্রায় পাকাপাকি ভাবেই নির্বাসন দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি এপিক লেখেননি, গীতিকবিতা লেখেননি, প্রথাগত প্রেমের কবিতাও লেখেননি। তাঁর কবিতাগুলি প্রধানত গদ্যময় ও পুরুষালি, সচেতন শব্দচয়নে তাঁর বাক্যগুলি উচ্চাবচ, আকৃতিগত দিক থেকে রচনাগুলি লাবন্যবর্জিত এবং মজবুত। অদ্যাবধি তাঁর প্রায় বারোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। অর্থাৎ কবি হিসেবে তিনি স্বল্পপ্রজ নন। প্রায় সমস্ত মান্য ছোটকাগজ ও কিছু বাণিজ্যিক কাগজেও তাঁর রচনা নিয়মিত দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং বলা চলে বাংলা কবিতার লেখক পাঠক অনুরাগী কারবারি কারুর কাছেই তাঁর নামটি হয়ত খুব অপিরিচিত নয়। তবে তাঁর রচনার সঙ্গে কতজনের অন্তত অল্পবিস্তর আলাপ পরিচয় সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ, তিনি একজন পরিচিত অপরিচয়ের কবি।
          কমপক্ষে বারোটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি গদ্যবই-এর লেখক তিনি। প্রথমজীবনে সম্পাদনা করেছেন “প্রতিবেশী” নামের একটি ছিমছাম ছোটকাগজ। তাঁর প্রথম দিককার একটি বই “যৌগিক পাতার রোদ”, মফস্বলের লেটার-প্রেসে ছাপা, কিন্তু প্রকাশনা পারিপাট্যের দিক থেকে সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম। সে-বইয়ের প্রথম কবিতার প্রথম দুলাইন— “রোদ পড়েছে যৌগিক পাতায়/ প্রজাপতি শুঁয়োপোকা হতে চায় এইসময়”। এই পর্যন্ত পাঠ করে পাঠক অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেই পারেন, কেননা গড়পড়তা একজন কবিতা লিখিয়ের কাছ থেকে এমন রচনাই প্রত্যাশিত। আর প্রত্যাশিত জিনিস অনেকটা সুষম ধাপওলা সিঁড়ির মত, যেখানে প্রথম দুএকটি ধাপের পর না তাকিয়েও তরতর করে উঠে যাওয়া যায়। দীর্ঘদিন আধুনিক (জীবনানন্দোত্তর) কবিতাচর্চার ধারা বয়ে আসার পর বর্ণনার কিছু কিছু স্টাইল উপমা ব্যবহারের কিছু কিছু ধরণ একজন সাধারণ কবির কাছে আহারনিদ্রামৈথুনের মত অভ্যাসে পরিণত হয়, একই ঘটনা ঘটে পাঠকের ক্ষেত্রেও। এই তন্দ্রা উদ্রেককারী শান্তিপূর্ণ অবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ে কিছু একটা বিজাতীয় ঘটনা যদি ঘটে যায় আচমকা। প্রফুল্ল পাল তেমনই এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন কবিতাটির তৃতীয় লাইনে— “ক্লোরোফিল থিকথিক করছে কফ ও থুতুতে”। পাঠকের প্রত্যাশিত মসৃণ যাত্রা এইখানে এসে ধাক্কা খেয়ে যায়। এবং তিনি বিরক্ত হয়ে অথবা খুশি হয়েই নড়েচড়ে বসেন। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এই কবি খুব মিষ্টি নম্র স্বরে পেলব মসৃণ মনভোলানো কথা শোনানোর জন্য কবিতা লিখতে আসেন নি। তিনি সেই বিশেষ (বক্স অফিসের বিচারে ফ্লপ) ধারাটির একজন কর্মী একসময় যার শিরোমণি ছিলেন “খোয়াবনামা”-র আখতারুজ্জামান। রচনার আনাচকানাচে অপ্রীতিকর, কর্কশ, নিষ্ঠুর এবং ভালগার বাক্য বা শব্দবন্ধ গুঁজে দেওয়ার প্রবণতা প্রফুল্ল পালের একটি অব্যর্থ পরিচয়।
তাঁর কবিতা উচ্ছাসহীন। এ তাঁর মুদ্রাদোষ নাকি সচেতন চেষ্টার ফল তা গবেষণা সাপেক্ষ, তবে গুনটি তাঁকে সমসময়ের অন্য কবিদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। সম্মুখে কাল্পনিক পাঠককে বসিয়ে রেখে সেই পাঠকের আহ্লাদী মন যুগিয়ে কবিতা রচনা যে তাঁর কম্ম নয় তা বোঝা যায় প্রকাশিত বইগুলি পাঠ করলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আবেগ তাঁর কোনও লেখাতেই নেই। যা বলার তা সরাসরি সপাট গদ্যের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। সাত বা আটের জনপ্রিয় কবিদের সফল ফর্মুলাগুলিকে সযত্নে এড়িয়ে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব লিখন ভঙ্গিমা। বিশিষ্ট গদ্যকার কিন্নর রায় একবার বলেছিলেন প্রফুল্ল পাল একজন আদ্যন্ত নাগরিক কবি। হ্যাঁ এটিও তাঁর এক বিশেষ পরিচয়। জন্ম ও কর্মসূত্রে এতগুলি বছর গ্রাম-মফস্বলে কাটিয়েও তাঁর কবিতা গ্রাম্যতা বর্জিত। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতায় ঝকঝকে স্মার্ট গদ্যের সমাহার। বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা জনপ্রিয় কাব্যধারাটির বাইরে বেশ কিছু ছোটকাগজ, এবং ছোটকাগজের বেশ কয়েকজন ডেডিকেটেড কবির একাগ্র পরিশ্রমে যে একটি (নাকি কয়েকটি?) প্যারালাল ‘কবিতাস্কুলে’-র সূচনা হয়েছে তিনি সেই ক্যাম্পাসেরই একজন। পাঠকপ্রিয় হওয়ার যে কবিজনোচিত স্বাভাবিক প্রবণতা- তার প্রতি একবগ্‌গা বিদ্বেষমূলক অবস্থানই প্রফুল্ল পাল ও তাঁর সহচর কবিদের শ্রেণিচরিত্র।
২০০০ সালে প্রকাশিত বই “সবুজ আলোর জল”, যার কবিতাগুলি রচিত হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ এর মধ্যে, সেখানে একটি নিরীহ কবিতায় একটি সাংঘাতিক লাইন দেখতে পাই আমরা— “.../বিশ্বস্ত কুমিরগুলির নিমিত্ত আজও খালকাটা হচ্ছে উদোম জ্যোৎস্নায়,/ প্রতি হাটবার তিন মাথার মোড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সমাজ বদলের মুখস্ত বক্তৃতা, ...” এখানে বিশেষ করে খেয়াল করতে হবে লেখাটির রচনাকাল ও প্রকাশকাল। কর্তা খেপানো এমন বেয়াড়া লাইন লিখতে শুধু যে বুকের পাটা লাগে তাই নয় প্রয়োজন হয় এক নির্মোহ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তথা দূরদর্শিতার। মনে রাখতে হবে কবি বামপন্থী এবং তাই বাজার অর্থনীতির একজন তীব্র সমালোচক। এবং সেকারণেই বামা ভাবাদর্শের শামিয়ানার ভেতর কুমিরদের আনাগোনা তাঁর নজর এড়িয়ে যায় নি। পরিতাপের বিষয়—শাসন ক্ষমতার হাতবদল হলেও জনজীবনে সেই কুমিরগুলি আজও বহাল-তবিয়ৎ। আরও লক্ষ্যনীয় ‘মুখস্ত’ শব্দটি। এই একটি মাত্র শব্দ তার গর্ভে তামাম পৃথিবীর বাম রজনীতির ব্যর্থতার ইতিহাস ও তার সম্ভাব্য কারণসমূহ ধারণ করে আছে। অসম্ভব শক্তিশালী এরকম অজস্র পঙক্তি ছড়িয়ে আছে প্রফুল্ল পালের কাব্য সংকলন গুলিতে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় তিনি সাধারণ পাঠাভ্যাসের খাসতালুক থেকে কিছুটা দূরে তাঁর কবিতার জগত নির্মাণ করেছেন বলে তা অবহেলিত ও নির্জন।
আরেকটি সুশ্রী বই “উৎসর্গপত্রের নীরবতা”-য় (২০০০) ‘শুকনোপাতা উড়ে যায়’, ‘মাটির কথা’, ‘আখমাড়াই মেসিন’, ‘বুথদখলের কোলাহল এড়িয়ে’, ‘নগরপত্তনের প্রশ্নমালা’-র মত অসাধারণ কিছু কবিতার দেখা মেলে। এই বইয়েরই একটি কবিতায় আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই যখন কবি লেখেন— “সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন শেষ হয়ে গেলে/ আরেক জীবনের জন্য আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যেতে থাকে,” তারপর, কয়েক লাইন পেরিয়ে- “ঝড় উঠলে ক্ষতিপূরণের কথা ভেবে ছুটে যাই,/ কমরেডরা প্রস্তুত থাকে লাল অভিনন্দনের জন্য”।
অতিসম্প্রতি প্রকাশিত (২০১৮) “গাধা” নাম্নী পুস্তিকাটির ৫ ক্রমাঙ্কের কবিতা যার নাম হতে পারত ‘মহাভারত’, পাঠ করে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত ‘মহাভারত’ কবিতাটির কথা মনে পড়বে। না, প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে না, দুটি কবিতাই মহান এপিকটিকে পশ্চাৎপটে রেখে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে ভারতবর্ষের সিল্যুয়েট, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানেও কয়েকটি চমকপ্রদ লাইন কিছুতেই ভোলা যায় না। “নিটোল কাহিনির কান্না মেশানো পরিণতি হোল রামায়ন/ .../ একটা লম্বা অন্ধদের মিছিল হোল মহাভারত।/ .../ ... হস্তিনাপুরসহ/ সমগ্র মহাভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক ছিল গাধা/ .../ পাণ্ডবের ছলচাতুরি আর কৌরবদের বোকা অহমিকায়/ এখনও কুরুক্ষেত্র অধ্যায় জুড়ে শোনা যায় গাধার অট্টহাসি/ ...।” সমগ্র কাবিতার ভরকেন্দ্র অবস্থান করে “পাণ্ডবের ছলচাতুরি আর কৌরবদের বোকা অহমিকা” এই বাক্যাংশটিতে, যা সেই মধ্যযুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালে ভারতবর্ষের পরিচয় প্রদানকারী অসামান্য ন্যারেটিভ।
          ২০১০ এ প্রকাশিত “এবং বিষাদ” বইয়ের একটি কবিতায় তিনি লিখলেন— “কী করে বোঝাই শুধু বক্তৃতার জোরে ফসল ফলবে না/ একটার পর একটা আলোচনা শেষেও কৌশল ঠিক হল না আজও/ অর্থাৎ কৌশল করে করে যতদিন বেঁচে আছি তারই নাম জীবন/ ...” রাজ্যের জেলায়-জেলায়, শহরে-শহরে সমস্ত ঐতিহাসিক সমাবেশের উন্নয়নী সুভাষিত অথবা রেডিও প্রচারিত সাপ্তাহিক ‘মনের কথা’ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হতোদ্যম হয়ে পড়া মানুষের কাছে খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কবিতাটি। এই বইয়েরই অন্য একটি কবিতায় হঠাৎই এক আশ্চর্য অনুভুতির মুখোমুখি হই আমরা। ঠিক যেন উৎসবের শেষে ম্যারাপ খুলে ফেলার পরবর্তী নীরবতা এসে গ্রাস করে আমাদের। সামান্য মনখারাপ কিছুটা প্রশান্তির ভাব অথবা একটু হয়ত বিরতির পরিসর। “লিখে এবং বলে আর পারছি না/ তাই তোমার উদ্দ্যেশে পাঠালাম নীরবতা”
          “পাঠক” প্রকাশিত “সকালবাড়ি ও গগন” বইতে তিনি লিখছেন— “লিখতে লিখতে ঘুম এসে যায়/ কখনও-বা ঘুমের পাশেই শুয়ে থাকি একা একা জেগে/ আমি যে ঘরটিতে থাকি, সংলগ্ন থাকে আরও একজন/ মিথ্যে নয় আজ এই সূর্যাস্তসময়ে আমাদের ফারাক যোজন যোজন” এ এক অকপট স্বীকারোক্তির কবিতা। আবার এই কবিতাটির পাশেই রাখতে ইচ্ছে করে কয়েকবছর আগে প্রকাশিত “উটের গ্রীবায় শীতের ছায়া” কবিতার এই লাইনটি— “বিশ্বাস করুন এতদুর আসাটা বোধ হয় ঠিক হয় নি”। আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত গাছপালা পরিবেশ ছেড়ে খনিক দূরে সরে গিয়ে কবির এই ফিরে আসার আকুলতা। কবিতা মানেই তো আসলে কনফেসন, পেঁয়াজের খোসার মত নিরন্তর নিজেকে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বল্কলমুক্ত করে যাওয়া, নিজেকেই আবিষ্কারের লক্ষ্যে। কবি প্রফুল্ল পাল নিজেকে আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু আমরা তাঁকে সময়মত খুঁজে নিতে পারিনি। প্রায় নীরবেই আজ তাঁর কবিতাচর্চার অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত।
লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েও আমরা অনেকেই অনেকের কাছে কেবল মুখচেনা হয়ে থেকে যাই। তাদের কথাই একটু বেশি জানি যাদের চোখে পড়বার মত চেহারা অথবা যাদের দরাজ গলায় সুর আছে অথবা যাদের কর্মজীবনের সাফল্য অসাধারণ। কবিদের বেলাতেও তাই। প্রফুল্ল পাল একজন সাধারণ চেহারার সাধারণ কবি, যিনি ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে এসেছেন জীবনভর। তাঁকে আমরা চিনি কিন্তু জানিনা। তাঁকে আমাদের এবার জানতেই হবে, নিরুপায় পাঠকের দায় নিয়েই তাঁর রচনার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। স্বল্পদৈর্ঘের এরকম একটি সামান্য রচনায় কোনও কবির পরিচয় দেওয়া প্রায় অসম্ভব। শুধুমাত্র তাঁর কবিসত্তার একটি ভাসাভাসা রেখাচিত্র আঁকবার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। আমাদের আশা- কোনও একদিন কবি প্রফুল্ল পালের রচনা নিশ্চয়ই সমর্থ হবে কোনও অগ্রণী পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিতে।