Saturday, October 19, 2019

দুটি কবিতা








কবিতার কাগজের জন্য

কবিতার কাগজের জন্য মৃত নীল ধোঁয়া
পোড়া সলতে, তেল-শূন্য মাটির প্রদীপ
অর্থাৎ আলো নয়, আলোর স্মারক।

আমার বুকের সূর্য, আলোকিত ক্ষণটুকু,
কাল মুছে দেয়া নেশা, মুহূর্তের ব্রহ্ম ছুঁয়ে আসা—

এইসব কীকরে পাঠাই!












খামারবাড়িতে


আঙিনায় হেলাফেলা শব্দ পড়ে থাকে।

নক্ষত্রকুচির মত সেই সব, খুঁটে আনতে গিয়ে
শব্দরত্ন-উদাসীন গৃহস্বামীর সঙ্গে দেখা।

তাঁকে দেখে দ্বিধাগ্রস্ত, কী প্রার্থনা করি—
শব্দভিক্ষা না কি তাঁর সিংহাসনখানি!

Tuesday, October 15, 2019

বিকেলের শিলাবতী



দুদিকের জনপদ থেকে কত যে কলস
বেড়াতে বেরোল আজ বিকেলবেলায়

ঘাটালের মফস্‌সল সম্পূর্ণ আড়াল হয়ে
কলসিতে জলের শব্দ শোনা যায় ছলক ছলক

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাবতী পিত্তল আধারে বন্দি হয়ে
নিরন্তর ঢেউ তোলে, উছলে পড়তে চায়

বন্যার উল্লাসে নদী ঢুকল প্লাবনভূমিতে
বিকেলে শ্রাবণ নামল এ নদীর বুকের ওপর


গ্রীষ্ম, ২০০১
প্রথম প্রকাশ – “মাটির থিওরি”, ২০০৯

Monday, October 14, 2019

ওহ্ ইসমাইল, তুমি তাকে বোঝাও



মির জালাল (Mir Cəlal Paşayev, 1908-78)


শোনা যায়, উৎকোচ আদানপ্রদান রোধে নানা ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। সেটা কিছুটা সত্যিও বটে। এখন সমস্যা হল—উৎকোচের সংজ্ঞা ও সীমা নির্ধারণ করা। উৎকোচ হল কোনও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর দাবি যা নীতিসংগত নয়। আমি চাহিদামত কিছু অর্থ দিলাম আর তিনি আমার কোনও একটা কাজ করে দিলেন (আইনের বাধা এড়িয়ে), উৎকোচ বলতে কি কেবল এই?
          অন্য একধরণের উদাহরণও আছে, আমার হয়তো কোনও মন্ত্রী বা আমলার সঙ্গে বিশেষ জানাচেনা, বাড়িতে কোনও বিশেষ ভোজ হলে আমি তাঁকে ডিনারে নেমন্তন্ন করলাম। এক শ্রেণির পণ্ডিত বলেন, এ এক ভিন্ন প্রকারের হারামি। অর্থের বদলে এখানে বস্তু বা সেবার বিনিময় ঘটছে।

[দুদিকে দুই অন্ধ, গোঁড়া ইসলামি রাষ্ট্র ইরান আর কমিউনিস্ট শাসন-ধন্য সোভিয়েত; দুদিকে দুই উদ্দত থাবা, সংক্রামক ধর্মীয় গোঁড়ামি আর দীর্ঘ-দীর্ঘকাল সম্পাদনাহীন স্থবির একটি বিশালবপু রাজনৈতিক মতবাদ। মাঝখানে তৈলভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এবং সামরিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রায় নির্বল একটি ভূখণ্ড। যেন প্রাণভয়ে প্রহর গুণতে থাকা একটি খরগোশ। সহজ কথায় এই হল আজারবাইজানের ইতিহাস। দেশটির ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু গভীরে শেকড় চারিয়ে দিয়েছে রুশ ও ইরানি প্রভাব। অথচ কী আশ্চর্য, কামারশালায় অত্যন্ত অসহায় ভাবে হাতুড়ির ঘায়ে নতুন আকার পেতে থাকা লৌহপিণ্ড থেকে ছিটকে ওঠা এক একটি লৌহকণিকার মত প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে রয়েছে আজেরি সাহিত্যে ও শিল্পে।
          মির জালাল পাসাইয়েভ (Mir Cəlal Paşayev)-এর জন্ম ২৬ এপ্রিল ১৯০৮ ইরানে এবং মৃত্যু বাকু শহরে ১৯৭৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। তাঁর লেখালেখির নাম ‘মির জালাল’ সাহিত্যে জগতে অধিক পরিচিত। ছাত্রজীবনেই মির জালালের লেখালেখির হাতেখড়ি, সংবাদপত্রের ফিচার লিখে তাঁর সাহিত্য রচনার শুরুয়াত।
মূল আজেরি থেকে ইংরেজি অনুবাদ – বেটি ব্লেয়ার]


Thursday, October 3, 2019

আষাঢ় ও মা-মুদ্রা




















আষাঢ়

বিপুল শ্যামল বক্ষ
স্নেহভার নত হয়ে আসে,
নিষেক-উত্তর ছায়া।

ব্যথায় অধীর বৃন্ত
গর্ভে নবীন ওষ্ঠ
খুব ধীরে বিকশিত হয়।

পৃথিবী প্রমাণ ভাণ্ড,
চরাচর মুছে দিয়ে
স্বচ্ছ অমৃত ঝরে পড়ে।

শিশুর অমূল্য পুষ্টি,
ঈষৎ ঘর্ষণে বজ্র
রমণের তন্দ্রা ছিঁড়ে যায়।




















মা-মুদ্রা

বসে আছ,
অগ্নিময় বক্ষ পার হয়ে
অলীক শীতল ছায়া—
এত স্নেহ ঊরুতে উদরে
দুচোখ আচ্ছন্ন হল
রচিত হয়েছে স্নিগ্ধ কোল।
অভ্যস্ত প্লাবন মুছে, আজ দেখি
শান্ত পলি-চর,
ওই তৃণে একদিন আমার সন্তান
নতুন আকাশ পাবে
হাওয়া জল মাটি,
স্বপ্নে ভাবি।


(মাটির থিওরি, ২০০৯)

Wednesday, October 2, 2019

তিনটি কবিতা
















উদারীকরণ

নতুন রং করা সাদা, কলেজ অফিস হাসপাতালে
সিঁড়ির দেয়ালগুলি দেখে সেই কিশোরীদের মুখ
মনে পড়ে যেতে পারে যারা অচিরেই
নির্মম হুড়কোয় বিদীর্ণ হবে।
এখন মুক্ত বিশ্ব, বুলাদি বোঝেন
পানের দোকানগুলি নিষিদ্ধ করা হাস্যকর এবং কঠিন।
তার চেয়ে সহজ—
বরাত দিয়ে সোনাগাছি থেকে
প্রচুর পিক্‌-দান আনা হোক
রাখা হোক গোলাপ-টবের পাশে পাশে।

ভাড়া করা পালা

কম বয়সে আমরা একটি যাত্রাদল করেছিলাম
পার্টিতে ঢুকবার পর সে-দল ভেঙে গেল,
তারাপদ বিবেকের গান গাইত
পার্টির লোকজন হাটের মাঝখানে তার ছেলের
মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে
বাধা দিতে পারিনি,
পূর্ণেন্দুবাবুকে ঘায়ের মত ঘৃণা করি
তবু ঠিক পালে মিশে গিয়ে
তার সঙ্গে মিছিলেও কদম মেলাই।

এখন বছরে একবার বাইরে থেকে যাত্রাদল আসে গ্রামে
ভাড়া করা পালা শুনি,
কথায় বলে—
কেনা চালের ভাতে চাষিদের পেট ভরে না।


















১৭ অঘ্রাণ ১৪০৮

সাতদিন পদার্থ বিজ্ঞান।

ঘেউ ঘেউ করতে করতে বনবাদাড়ে এক চক্কর ঘুরে আসবার পর
মাল-বাহক গাড়ির জোয়ালে কাঁধ দিতে হল। ফিরবার পথে
ঝামেলা। অন্য একটা পাঁঠার সঙ্গে হয়ে গেল এক হাত। তারপর
ঘাস চিবোতে চিবোতে পুকুরের দিকে গেলাম। জল খেয়ে ফিরছি,
সামনেই—উহ্‌, কী ভয়ংকর! আলের পাশে মুখ লুকিয়েছি।
ভয় সরে যাবার পর গুচ্ছ গুচ্ছ ধান বইছিলাম লম্বা সুড়ঙ্গ বেয়ে
ভাঁড়ারের দিকে।

অর্ণবদা’ কবিতা চাইলেন। আমি হাতের ধান ফেলে, ঠোঁটের
মাছ ফেলে, ঝগড়া ফেলে, ঘেউ ঘেউ ফেলে, হারিয়ে যাওয়া ডানা
দুটি খুঁজে বার করে ঊর্দ্ধশ্বাসে উড়তে উড়তে ইউক্যালিপটাসের
মগডালে উঠে এলাম। এখন মুদ্রাদোষে ডানা দুটি আবার হারিয়ে
ফেলার আগে অবধি নিজের সাধ্যমত এই নিচুর নীলে খানিকক্ষণ
উড়ান দিতে পারব।

(কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছিল "মাটির থিওরি" কাব্যগ্রন্থে, ২০০৯ সালে। তারও আগে প্রথম কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল "কবিতা সীমান্ত" পত্রিকায় আর তৃতীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল অর্ণব পণ্ডা সম্পাদিত "রৌদ্র-ছায়া"তে। দ্বিতীয়টির কথা মনে নেই।)

Tuesday, October 1, 2019

উনি বলছেন


চুপ করুন, উনি কথা বলছেন। আসুন আমরা বাধ্য ছাত্রের মত ওঁর সম্মুখে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ি। এমনটা সচরাচর ঘটে না। এখন ঘটছে, আমাদের এই জীবদ্দশায়। আসুন আমরা গর্ব অনুভব করি। যেমন গর্ব অনুভব করা যায় বাংলা তথা ভারতবর্ষের খাঁটি বামপন্থী কয়েকজন মানুষকে জীবিত দেখেছি বলে। যেমন গর্বিত হওয়া যায় আমরা আমাদের জীবদ্দশায় জয় গোস্বামীর জায়মান কাব্য-কর্মের আস্বাদ নিতে পারছি বলে। অন্তত শেষ বয়সের ভীমসেন যোসীর ভীমপলশ্রী বা মালকোষ শুনেছি বলে। ঠিক তেমনই নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করব আমরা ওঁকে আমাদের সমসময়ে কথা বলতে শুনছি বলে, লিখতে দেখছি বলে। আমাদের সামান্য জীবনে বিরল ও অসামান্য এই প্রাপ্তি। উনি অবিরাম লিখছেন কথা বলছেন বাংলা আধুনিক গান নিয়ে বাংলা সঙ্গীত নিয়ে। এমন সহজ করে এত এত গভীর সব কথা কে বলেছেন আগে? ক্ষমাহীন মূর্খতায় আজকাল বড্ড বেশি কথা বলি আমরা, সীমাহীন অজ্ঞানতায় হয়ে পড়ি পণ্ডিতন্মন্য। এবার আমাদের নিশ্চুপ হয়ে বসতেই হবে।
          হ্যাঁ, কবীর সুমন। ঐতিহ্যের প্রতি এতখানি শ্রদ্ধাশীল গতানুগতিকতার এমন তীব্র বিরোধী অনুজদের প্রতি এত স্নেহার্দ্র অগ্রজদের প্রতি এত নির্মম এত গভীর ভাবে রাজনৈতিক, এত বড় প্রতিভাবান, এত খামখেয়ালী, এমন নিবিড় সুরেলা, এমন কঠোর প্রতিবাদী শিল্পী বাংলা সঙ্গীত জগত আগে কোনোদিন দেখেছে কি? কত অনায়াসে তিনি ধর্মান্তরিত হতে পারেন অথচ প্রথাগত ঈশ্বরের প্রতি তাঁর তেমন শ্রদ্ধাই নেই। তিনি বড়ে গুলাম আলি, আমির খান, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ কিংবা সচিন দেব বর্মণকে মনে করেন ঈশ্বরের চেয়ে বড়। তিনি পলিটিক্সের তর্জমা করেন লোকনীতি (রাজনীতি নয়)। আশিরপদনখ বামপন্থী হয়েও যোগদান করেন একটি চূড়ান্ত ঊশৃঙ্খল ডানপন্থী দলে। উদাসীন ভাবে প্রবেশ করেন ক্ষমতার অলিন্দে আবার অনায়াসে ফিরে আসেন নিজস্ব শিল্পিত অনুশীলনে। তাঁকে সমালোচনায় জর্জরিত করা যায়, নির্দয় ভাবে তাঁর দিকে এগিয়ে দেওয়া যায় বিদ্বেষের বিষ, তাঁকে ঘৃণা করা যায়, তাঁর বিনাসের চক্রান্ত করা যায়। কিন্তু এত সত্ত্বেও তাঁকে উপেক্ষা করা যায় না। অনিবার্য ভাবে প্রতিটি শিল্পরসিক মানুষকে তাঁর প্রতি মনোযোগী হতেই হয়। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর মত প্রতিভাবান সঙ্গীতকারের আবির্ভাব বা উপস্থিতি হয়ত বিরল নয় কিন্তু তাঁর মত এমন সুগভীর তাত্ত্বিক ও অনুপুঙ্খ ভাষ্যকার সত্যিই দুর্লভ।
          কয়েক দশকের খরাপীড়িত বাংলা আধুনিক গানে তিনিই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রাণ, আর গান ফিরে পেয়েছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনে তার হারিয়ে ফেলা প্রাসঙ্গিকতা। বেঁচে থাকার জন্য বাংলা গানের দিকবদল যে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তা অনুভূত হচ্ছিল বেশ কয়েক দশক ধরে। অনাগত কোনও একটা ফর্ম বা আঙ্গিকের জন্য অসহায় ভাবে অপেক্ষমাণ ছিল নবীন গায়কের কণ্ঠ শ্রোতার কান। কিন্তু সেই বহুপ্রতীক্ষিত নতুনের দেখা মিলছিল না কিছুতেই। চেষ্টা যে একেবারে হচ্ছিল না এমনটা নয়। বরাবরের মত তখনও গণসংগীতে চেনা গণ্ডি ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসার প্রবণতা। চিরাচরিত ভাবে লোকসঙ্গীতও নিজস্ব ধারায় প্রবহমান। কিন্তু আধুনিক বাংলা গান হয়ে পড়েছিল স্রোতহীন বদ্ধ জলাশয়ের মত। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মত শক্তিমান কেউ কেউ একক ভাবেই নতুনের সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন। অভিনব বহুমাত্রিকতা নিয়ে উল্কার মত আবির্ভূত হয়েছিল মহিনের ঘোড়াগুলি। কিন্তু তবু কিছুতেই বাংলা মেনস্ট্রিম আধুনিক গানের অচলায়তন ভেঙ্গে পড়ছিল না। একদা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী সুমন সেই কর্তব্যে প্রথম মনোযোগী হলেন, এবং আমরা পেলাম একটি ঐতিহাসিক মাইলস্টোন “তোমাকে চাই”। তারপরের ইতিহাস আজ সর্বজনবিদিত, বাংলা মূল ধারার আধুনিক গানের আদলটাই আমূল বদলে গেল। এই নতুন শতাব্দীর সমস্ত প্রতিভাবান শিল্পীর কাছে তিনি অবশ্যই আধুনিকতার ভগীরথ। কিন্তু কবীর সুমনের সাংগীতিক প্রতিভাবা অবদান নিয়ে আলোচনা এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আমরা পরিচিত হতে চাইব তাত্ত্বিক ও ভাষ্যকার সুমনের সঙ্গে।
          এখন প্রশ্ন উঠবে— যিনি একদা ছয় সাত বা আটের দশকের বাংলা গান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের নির্মম ভাবে আক্রমণ করেছেন, সমালোচনায় জর্জরিত করেছেন তিনি কীভাবে নিরপেক্ষ হতে পারেন তাঁর লেখায় কথায় বা সাক্ষাৎকারে? আমরা কী করে ভুলে যাই সেই নয়ের দশকের শুরুর দিনগুলির কথা, যখন নতুন ও পুরনোপন্থীদের মধ্যে তিক্ত বাদানুবাদে ভরে উঠছিল সংবাদপত্রের সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রগুলি। এমনকি সুমনের গান গাওয়ার অপরাধে স্নেহধন্যা হৈমন্তী শুক্লার সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেন নি মান্না দে-র মত উদার মানুষ। তখন কেউ কেউ বলছেন, ‘ওগুলো গান নয়, আবৃত্তি’। মান্না দে বলছেন—‘... অবশ্য, “পেটকাটি চাঁদিয়াল” শুনতে মন্দ লাগছে না’। যার মানে দাঁড়ায় অন্য গানগুলি তেমন পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়। আর এইসব বিরূপ সমালোচনায় রাগী সুমন আরও রেগে উঠছেন। সাবেকী বাংলা গানের প্রতি তাঁর আক্রমণ হয়ে উঠছে আরও বিদ্বেষপূর্ণ একরোখা।
সেই বিদ্বেষ একদিন বদলে গেল শ্রদ্ধায়, চরমপন্থি সুমন হয়ে উঠলেন দায়িত্ববান আলোচক। অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন শিল্প সংস্কৃতির জগতে অবশ্য খুব বে-নজির নয়। কল্লোলের লেখকেরা একসময় রবীন্দ্রনাথকে কম আক্রমণ করেননি। তরুণ বয়েসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও লিখেছিলেন, ‘তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্র রচনাবলী লুটোয় পাপোষে’। পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসু (একজন অন্যতম কল্লোল-কর্মী) লেখেন রবিন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন নিয়ে এক আশ্চর্য সুন্দর বই “সব পেয়েছির দেশে”। আর সুনীল লেখেন “প্রথম আলো”, যেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনীর থেকেও অধিক উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। আসলে দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন সম্ভব হয়ে ওঠে শিল্পী বা সাহিত্যিক জীবনের একটি বিশেষ বৃত্ত সম্পূর্ণ হলে। প্রথমে পুরনো যা কিছু তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া, তারপর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মান করা আর্ট-ফর্মের আধুনিক ইমারৎ। প্রথম দিকের এই কালাপাহাড়ি উগ্রপন্থাটি অনিবার্য কেননা তা নাহলে নিজস্ব নতুন পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, থেকে যায় পুনরাবৃত্তির ভয়, পূর্বজদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা। একজন প্রকৃত শিল্পীই পারেন এই বৃত্ত সম্পূর্ণ করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় উন্নীত করতে। এই পথেই কবীর সুমন আজ আধুনিক বাংলা গানের একজন অদ্বিতীয় ‘কাল্ট ফিগার’। বাংলা গান নিয়ে কিছু বলবার বা লিখবার জন্য তিনি অবশ্যই একজন অথরিটি।
সুমন যখন বাংলা গান নিয়ে কথা বলতে বা লিখতে শুরু করলেন আমরা পেলাম শান্ত স্তিতধি নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত জ্ঞানী একজন সঙ্গীত ব্যাক্তিত্বকে। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় অনর্গল কথা বলে যাওয়া তাঁর বরাবরের অভ্যেস। তবে আগে তিনি বলতেন মুলত রাজনৈতিক কথাবার্তা, যা হয়ে উঠত তাঁর বিস্ফোরক গানগুলির জন্য প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত প্রিলিউড বা ইন্টারলিউড। আর ইদানিং তিনি প্রধানত কথা বলেন বাংলা আধুনিক গান নিয়ে, গানের রক্তমাংস ও নির্মাণশৈলী নিয়ে। এমনিতে সুমন সুলেখক, সুবক্তাও। শুধু সঙ্গীত তো নয় সাহিত্যসংস্কৃতির অন্যান্য শাখাতেও তাঁর অশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ। এই মুহূর্তে তাঁর মত আর কে আছেন যিনি সমসময়ের চিত্রকলা, নাটক, কবিতা, কথাসাহিত্য বা সিনেমার খুঁটিনাটি বিষয়ে সচেতন ও চিন্তাশীল। সংস্কৃতিচেতনার এই ব্যাপ্তি তাঁর লেখালেখি বা কথাবার্তায় যোগ করেছে এক ভিন্নমাত্রা। মঞ্চে কখনও তিনি দুটি গানের মধ্যবর্তী বিরতিতে হঠাৎ আবৃত্তি করে ওঠেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতা। আবার কখনও হয়ত সলিল চৌধুরীর একটি বিখ্যাত গান নিপুণ ভাবে ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়ে দেন সে-গানের গহনে লুকিয়ে থাকা বাংলা পদাবলী কীর্তনের ছায়াটিকে। আর শুধু মঞ্চ-অনুষ্ঠানের ফাঁকফোকর ভরানো কথা তো নয়, সাক্ষাৎকার টক-শো এমনকি ফোনালাপেও তিনি অক্লান্ত। কেবল কথা নয় তিনি লিখেও চলেছেন অবিরাম। সংবাদপত্রের জন্য সাপ্তাহিক কলাম, স্বয়ংসম্পূর্ণ বই, এবং নিজস্ব ব্লগে, এমনকি নিজের ফেসবুক পেজেও তিনি গানবাজনা সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি অথবা সমসাময়িক সমাজ নিয়ে মুখর।
অব্যর্থ শব্দ প্রয়োগ, অনবদ্য সেন্স অফ হিউমার, ভাবনার স্বচ্ছতা এবং তা প্রকাশের অনন্য কৃতকৌশল তাঁকে করে তুলেছে একজন অসামান্য লেখক বা কথক। তিনি বলেন, কণ্ঠের আগে প্রস্তুত করে তুলেছেন নিজের কান। তিনি বলেন, দুহাত পেতে কাঙালের মত তিনি আহরণ করেছেন বাংলা গানের চিরকালীন মণিমাণিক্য, কীর্তন থেকে টপ্পা, পুরাতনী থেকে রবীন্দ্র-অতুলপ্রসাদ-নজরুল। তিনি আরও বলেন, ‘কোনও নারীর প্রতি কখনও বিশ্বস্ত থাকি নি, বিশ্বস্ত থেকেছি সঙ্গীতের প্রতি’। এককালে অব্যবহিত আগেকার বাংলা সঙ্গীত ও সঙ্গীতকারদের প্রতি নিক্ষিপ্ত তাঁর বিষোদ্‌গার দেখেছি আমরা। আজ দেখি সেইসব অগ্রজদের প্রতি নিবেদিত তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তাঁর লেখা খবরকাগজের সাপ্তাহিক কলমগুলি বরাবরই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে এসেছে, সে আনন্দবাজার হোক বা আজকাল। এই সেদিন অবধি তিনি আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় পাতায় “সুমনামি” নামে একটি অনুপম ধারাবাহিক লেখা লিখছিলেন। সে-লেখার প্রায় প্রতিটি কিস্তিই হয়ে উঠত বারংবার পাঠযোগ্য এক একটি মাস্টারপিস, পরে তা গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়েছে।
রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী সময়ের গীতিকারেরা স্বকীয় দোষেই তাঁদের প্রাপ্য কবিখ্যাতি খুইয়ে বসেছিলেন, দিনের পর দিন তাঁদের রচনাগুলি হয়ে উঠছিল তরল থেকে তরলতর। অনেক অনেক কাল পর, সুমন একক প্রতিভা ও উদ্যমে পুনরুদ্ধার করেছেন গীত-রচয়িতাদের সেই হৃতগৌরব। এই সময়ের একটি অগ্রণী প্রকাশক অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কাব্যগ্রন্থের সমান মর্যাদায় কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেছে তাঁর গানের সঙ্কলন। সমসময়ের অন্যতম প্রধান কবি জয় গোস্বামীর একাধিক কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে সুমনের নাম। এও এক অমূল্য স্বীকৃতি।ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ (যেহেতু তিনি একজন দক্ষ খেয়ালিয়া হিসেবেই নিজের শিল্পীজীবনের সূচনা করে ছিলেন) রেখেও তিনি রচনা করেছেন সুরের এক অভিনব বিনির্মাণ। আর এইসব অনন্য সাধারণ কীর্তিই তাঁকে দিয়েছে বাংলা আধুনিক গান নিয়ে কিছু লিখবার বা বলবার সুদৃঢ় ভিত্তি ও অটুট আত্মবিশ্বাস।
সুমন যখন একটি স্বল্পপরিচিত গানের আপাদমস্তক ব্যবচ্ছেদ করেন প্রায় শল্য-চিকিৎসকের নিপুণতায় তখন তুলনা হিসেবে একমাত্র মনে আসতে পারে “গোঁসাইবাগানে”-র জয় গোস্বামীকে। একজন অদীক্ষিত শ্রোতাও সে-লেখা পড়ে একটি গানের গভীর অন্তস্থলে বিরাজমান অপার রহস্যের খোঁজ পান এবং অভিভূত হন। স্বভাবতই, শ্রোতাকে শিক্ষিত করার বা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর গদ্য-রচনাগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। গান নিয়ে তাঁর কথা বা লেখার সিংহভাগ জুড়ে থাকে বাংলা আধুনিক গানের বিবর্তন ও ইতিহাস। এবং সেই বিবর্তনের পথে তিনি যেসব প্রধান কারিগরদের নাম প্রায়ই সম্ভ্রমের সঙ্গে উল্লেখ করেন সেই নামগুলি মোটামুটি এইরকম— স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্র-নজরুল, হিমাংশু দত্ত, পঙ্কজ মল্লিক, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, সচিনদেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী... । রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই, তাছাড়া হিমাংশু দত্ত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ অথবা সলিল চৌধুরীকে নিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে তাঁর কোনও ক্লান্তি নেই। চার পাঁচ বা ছয়ের দশকের কয়েকজন সুরকারের ব্যাপারে তাঁর অশেষ মুগ্ধতা। সেজ্ঞানপ্রকাশ,পঙ্কজ মল্লিক হোক কিংবা সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ। পূর্বজ কণ্ঠশিল্পীদের নিয়েও তাঁর গর্বের শেষ নেই, দিলিপ রায় উমা বসু থেকে পরবর্তীকালের হেমন্ত সতিনাথ উৎপলা মান্না সন্ধ্যা কিংবা অনতি-অতীতের জটীলেস্বর প্রতুল। আকাশবাণী কলকাতার “অনুরোধের আসর” কিংবা “রম্যগীতি”-র মত অবিস্মরণীয় অনুষ্ঠানগুলি নিয়েও কত মনোজ্ঞ আলোচনা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। প্রায় বিস্মৃত একেকটি মহামূল্যবান গান চিনিয়ে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘বন্ধু হে পরবাসী’ গানটির কথা। “জাতিস্মর” ছবির সঙ্গীত পরিচালনার সময় তিনি বারবার বলেছেন “অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী”-র মান্না দের কথা। এই ছবিতেই শ্রীকান্ত রূপঙ্কর প্রমুখ অনুজ শিল্পীদের কতটা সস্নেহ তত্ত্বাবধানে তিনি অসাধারণ সব কম্পোজিশন গাইয়ে নিয়েছেন তা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
এখন ওঁর ঊনসত্তর বছর বয়স। এবং উনি অবিরাম লিখছেন, কথা বলছেন। বাংলা গান নিয়ে তাঁর অন্তত পাঁচটি বই আমাদের হাতের কাছে— আজকাল প্রকাশনা থেকে “কোন পথে গেল গান” (২০০৬), দে’জ থেকে “মনমেজাজ” (২০১৩) এবং সপ্তর্ষি থেকে “আলখাল্লা” (২০০১), “দূরের জানালা” (২০১৫) আর “হয়ে ওঠা গান” (২০১৫) । তাছাড়া, সংবাদপত্রের পাতায় ছড়িয়ে থাকা অজস্র অসংকলিত রচনা, মাইল মাইল ব্লগ, ফেসবুকের নিয়মিত কথকতা তো আছেই। এবং ইউটিউবে প্রবহমান অসংখ্য সাক্ষাৎকার, কথাবার্তা বা ডেমনস্ট্রেশন-এর ভিডিও। বাংলা আধুনিক গান বা কবীর সুমনকে নিয়ে জ্ঞানগর্ভ গবেষণার প্রয়াস এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। শুধুমাত্র হাতের কাছে ছড়িয়ে থাকা কবীর সুমনের এইসব বইপত্র অডিওভিসুয়াল-এর খবর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই এই অকিঞ্চিৎকর গদ্যটির অবতারণা। যেভাবে একটা ভালো বই বা ভালো মুভি দেখার পর তার অভিজ্ঞতা সুহৃদদের সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়ার জন্য ছটফট করে একজন এই লেখাটিও তেমনই এক তাড়না থেকে।