Saturday, May 18, 2024

মহাকবির প্রহসন-প্রয়াস

 


অবাঙালি পাঠকের কাছে আবহমান বাংলা কবিতার পাঁচজন প্রধান কবির কথা বলতে গেলে তাঁর নাম আসে। এমনকি তিনজনের কথা বলতে গেলেও তাঁকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। তিনি চিরকালের চির-আধুনিক কবি মধুসূদন দত্ত। সমসময়ে অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েই বন্ধু রাজনারায়ণ বসু তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলেন “মহাকবি” হিসেবে। আর একটি ইংরেজি রচনায় একালের প্রাবন্ধিক শিবনারায়ণ রায় স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তায় ঘোষণা করলেন যে মধুসূদনই ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক কবি।

তিনি আজন্ম বিপ্লবী; সারাজীবন, বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে গিয়ে বাজী রেখেছেন নিজের জীবন সংসার পরিবার। উনিশ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, অধিকার হারিয়েছেন বিপুল পৈত্রিক সম্পত্তির, শ্বেতাঙ্গিনি বিবাহ করেছেন, পরবর্তী কালে বিবাহ-বিচ্ছিন্ন না হয়েই অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেছেন অন্য এক শ্বেতাঙ্গিনি নারীর সাহচর্যে, বিদেশযাত্রা করেছেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে, আবার বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকা হাতে পেয়ে তা তৎক্ষণাৎ খরচ করে ফেলেছেন বালকের মতো, সুযোগ পেলেই সাধ্যাতীত বিলাসিতা করেছেন, বন্ধু গৌরদাসকে চিঠিতে লিখেছেন—আমার জীবনযাত্রা বর্ধমান রাজার চেয়েও আড়ম্বরপূর্ণ, বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরেছেন একেবারে নিঃস্ব হয়ে, দেশে ফিরে আইনি পেশায় পসার জমাতে পারেননি, জীবনকে চূড়ান্তভাবে তুচ্ছ্যতাচ্ছিল্য করে দেহত্যাগ করেছেন প্রায় মাঝবয়সেই। আমাদের সাধারণ ছাপোষা বুদ্ধিতে যেমন তাঁর অনেক কার্যকলাপেরই ব্যাখ্যা মেলে না, তেমনই ধারণা করা যায় না তাঁর অতুলনীয় প্রতিভা সম্পর্কে। তিনি যতখানি র‍্যাডিক্যাল ততখানি আর কে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে? পূর্বজ কবির রচনাবলীতে অর্বাচীনের মতো লাথির ঘা না দিয়েও তিনি অসম্ভব রকমের মৌলবাদী শিল্পী। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে সেই মধুসূদন দত্তকে আজ আমরা ঠাঁই করে দিয়েছি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের সুলভ অপরিসর আবাস-যোজনায়। সিলেবাসের বাইরে তাঁর জন্য আর কোনও আশ্রয় রাখিনি আমরা। দুহাজার চব্বিশ সালে তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ, ফলে এবার তাঁর রচনাবলির ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে দুএক পৃষ্ঠা রচনা আমাদের না লিখলেই নয়। কেননা তা না করতে পারলে যে নিজেদের কাছেই নিজেদের মান থাকে না।

          জীবনের প্রথম চৌত্রিশ বছর তিনি বাংলাভাষায় কিছুই লেখেননি, কেননা সেই সময়কালে মাতৃভাষার প্রতি তাঁর কিছুমাত্র অনুরাগ বা আগ্রহ ছিল না। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২—এই চার-পাঁচ বছর সময়ে তিনি রচনা করেন পাঁচটি বাংলা নাটক (শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, একেই কি বলে সভ্যতা?, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং কৃষ্ণকুমারী) আর চারটি কাব্য (তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য এবং বীরাঙ্গনা কাব্য)। এই ক্ষীণ কালখণ্ডটিকে বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে উর্বর তথা ফলপ্রসূ সময় হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। কারণ কালের প্রেক্ষিতে এই এক-পলক সময়ের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে একের পর এক সাহিত্য-বিপ্লব। পরবর্তী জীবনে (১৯৬২ থেকে ১৯৭৩) তাঁর বাংলা লেখালেখি সংখ্যায় একেবারে নগণ্য। উনিশশ’ বাষট্টিতে ইউরোপ-যাত্রা করেন কবি। সেখানে থাকাকালীন অনিবার্য আর্থিক সঙ্কট ও নানা পারিবারিক টানাপোড়েন স্বত্তেও পরীক্ষানিরীক্ষা করেন বাংলা সনেট নিয়ে, রচিত হয় একশটি চতুর্দশপদী কবিতা। মৃত্যুর ঠিক আগে লেখেন “মায়াকানন” নাটক এবং হোমারের ইলিয়াড-আশ্রিত অসমাপ্ত গদ্য-আখ্যান “হেক্‌টর-বধ”। এবং অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে মাদ্রাজ পর্বে তিনি ইংরেজিতে কিছু কিছু গদ্য-পদ্য রচনা করেছেন। কিন্তু মধুসূদনের সাহিত্যকর্ম বলতে মানুষ প্রধানত ওই চার-পাঁচ বছরের লেখালেখির কথাই বোঝেন।

          কী কী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ওই বিশেষ কালপর্বে তা মোটামুটি ভাবে বর্ণনা করতে গেলেও অন্তত চারটি বিষয়ের কথা বলতে হয়। প্রথমত, বাংলা কাব্যে মিলটন প্রবর্তিত আমিত্রাক্ষর ছন্দের (blank verse) প্রথম প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, পয়ারের অভ্যস্ত কাঠামো অতিক্রম করে পদ্যের শরীরে গদ্যের মুক্তি এনে দেওয়া। তৃতীয়ত, পুরাণের চিরাচরিত আখ্যান অংশকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া (বিনির্মাণের এমন চূড়ান্ত উদাহরণ আর কী হতে পারে?)। এবং চতুর্থত, প্রথম রুচিশীল ও শিল্পসম্মত বাংলা নাটক রচনার সূত্রপাত। এসব ছাড়াও বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও মধুসূদনের। অবশ্য বাংলা সনেট তাঁর ইউরোপ-পর্বের কীর্তি। কবির বিদ্রোহী মেজাজের কিছুটা আভাস মেলে বন্ধু গৌরদাস বসাককে ১৮৫৯ সালের ১৯ মার্চ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে। “যা কিছু সংস্কৃত ভাষায় লেখা, তারই প্রশস্তি গাওয়ার অভ্যাস আমাদের পায়ে বেড়ির মতো এঁটে বসেছে। সেই বেড়ি ভেঙ্গে ফেলাই আমার উদ্দেশ্য।” এই চিঠি থেকে মেঘনাদবধ কাব্য সহ অন্যান্য আরও কয়েকটি পুরাণ-আশ্রিত রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

          বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট নাটকের যে নিতান্ত অভাব—সেকথা মধুসূদনের গোচরে আসে যখন তিনি রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত “রত্নাবলী” অনুবাদের কাজ করছিলেন। একপ্রকার জেদের বসেই ১৮৫৯ সালে রচিত হল তাঁর প্রথম নাটক “শর্মিষ্ঠা”। শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রথম সংস্করণের প্রারম্ভে মুদ্রিত হয়েছিল কবির সেই বিখ্যাত কবিতা, যা নানা প্রসঙ্গে নানা উপলক্ষ্যে আজও অকাতরে উদ্ধৃত করে থাকি আমরা। তৎকালীন নাটক নিয়ে কবির মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে এই প্রবেশক রচনাটিতে।

“...

কোথায় বাল্মীকি ব্যাস         কোথা তব কালিদাস,

কোথা ভবভূতি মহোদয়।

অলীক কুনাট্য রঙ্গে            মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে,

নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।

সুধারস অনাদরে              বিষ বারি পান করে,

তাহে হয় তনুমনঃক্ষয়।

...”

         

সঠিক ভাবে দিনক্ষণের হদিশ না মিললেও, বিশেষজ্ঞ তথা ঐতিহাসিকদের ধারণা মধুসূদনের প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল শর্মিষ্ঠার পরে, এবং পদ্মাবতীর আগে। এক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ, কেননা তার আগে প্রহসনের নামে বঙ্গদেশে ছোটখাটো সামন্ত-রাজার রাজসভায় বা জমিদারের অঙ্গনে যে টুকরো নাটক অভিনিত হত সেসব ছিল নিতান্তই চটুল আদিরসাত্মক খেঁউড়ে পরিপূর্ণ একপ্রকার কদর্য পরিবেশনা। “একেই কি বলে সভ্যতা?” এবং “বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” (ড়-এ ও-কার নেই) সেসময় কলকাতার নাট্য-পরিমণ্ডলে উপস্থিত হয়েছিল মূর্তিমান বিপ্লবের মতোই। গ্রীক, লাতিন, সংস্কৃত প্রভৃতি ধ্রুপদী ভাষা চর্চার ফলেই হয়তো মধুসূদন এমন রচনার অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকবেন। এবং আরও স্পষ্ট করে বললে ইউরোপীয় নাটকের প্রভাবই হয়তো ছিল অধিকতর। প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল পাইকপাড়ার জমিদারের প্রতিষ্ঠিত বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে অভিনয়ের জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত নানা কারণে সেগুলি অভিনীত হয়নি, কিছুকাল পরে প্রকাশিত হয় পুস্তকাকারে। দুটি প্রহসনের বিষয়বস্তু একেবারেই ভিন্ন মেরুর। একটিতে দেখানো হয়েছে সে-সময়ের তথাকথিত শিক্ষিত আধুনিক যুবসমাজের মধ্যে পুঞ্জীভূত অন্ধকার। আর অন্যটিতে রয়েছে এক ভণ্ড হিন্দু জমিদারের অনিঃশেষ কাম-লালসা চরিতার্থ করার নানা ছল-কৌশল এবং তার কৃতকর্মের উপযুক্ত ফল প্রাপ্তির বিবরণ। এই দুটি রচনাও মধুসুদনের নিজের তাগিদে লেখা নয়, লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের তাগাদায়। ঈশ্বরচন্দ্র চাইছিলেন মূল নাটকের শেষে অভিনয় করা যায় এমন ‘ফার্স’, যাতে দর্শক অভিনয় দেখে হালকা মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। সেই ফরমায়েসের লেখাই এমন ভাবে লিখলেন যে তা হয়ে দাঁড়াল আইকনিক এবং কালজয়ী। সুকুমার সেন লিখেছেন, “এই দুইখানি গ্রন্থ বাঙ্গালা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনার অন্যতম”। পরে দীনবন্ধু মিত্র যখন “সধবার একাদশী” লিখলেন তিনি মধুসূদনকে অনুসরণ করলেন গুরুর মতো।

বৃন্দাবন-ফেরত ধর্মপ্রাণ কর্তা মশাই, তাঁর কলেজে পড়া পুত্র নব, নব-র বন্ধু কালী প্রমুখকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে “একেই কি বলে সভ্যতা?”। কাহিনির প্রয়োজনে এসেছে অন্তঃপুরবাসিনী কিছু স্ত্রীলোক, কজন বারবিলাসিনী, এবং আরও কিছু অকিঞ্চিৎকর চরিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রহসনের আখ্যান অংশ বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে কমবেশি পরিচিত। কয়েকজন ধনির দুলাল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত তথাকথিত আধুনিক এবং সংস্কারপন্থী যুবকের বিপথগামিতাই এই ব্যাঙ্গ-নাটিকার উপজীব্য। মধুসূদনের আক্রমণের লক্ষ্য এক্ষেত্রে সেই যুবককুল যাদের কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন বঙ্গীয় তথা ভারতীয় সমাজের সংস্কারসাধন আসলে প্যাসন নয়, ফ্যাসন। সমাজ সংস্কারের চেয়ে নিজেদের ইউরোপীয় কালচারের সঙ্গে মানানসই করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। ভোগ-বিলাস ছাড়া তাদের কোনও মহত্তর লক্ষ্য নেই। ফলত শেষপর্যন্ত তাদের সংস্কারকর্মের গতি যথেচ্ছ সুরাপান আর গণিকাগমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। নাটকে এক জায়গায় উল্লিখিত হয়েছেন স্বয়ং রামমোহন। অনেকে বলেন নব বাবুর জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা আসলে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানোপার্জিকা সভারই প্রতিরূপ। মধুসূদন সমাজ সংস্কারক নন, তিনি শিল্পী। শিল্পীর দৃষ্টি মোটাদাগের লাভ-লোকসানের হিসেব অতিক্রম করে সুক্ষ্মতার দিকেই। এই নাটকের ক্ষেত্রে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য আংশিক ভাবে তিনি নিজেও। কেননা একসময় তিনিও তো ইয়ং বেঙ্গলের অনুসারীই ছিলেন। বিষয়বস্তুর কথা ছেড়ে দিলেও লিখনশৈলী ও ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মধুসূদন অকল্পনীয় দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। বিশেষত নাটকের শেষের দিকে বাড়ির মেয়েদের তাসখেলা ও গল্পগাছার যে দৃশ্যের অবতারণা তিনি করেছেন তা যে প্রায় দুশ বছর আগে রচিত বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় আমাদের। বাড়ির মেয়েদের মুখে এমন সাহসী সংলাপ বসাতে আজকের নাট্যকারও দুবার ভাববেন।

“বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” নাটিকার নাম মধুসূদন প্রথমে দিয়েছিলেন “ভগ্নশিব মন্দির”। পরে পাইকপাড়ার ছোট রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ নাম বদলের প্রস্তাব করেন। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় নাট্যকার প্রদত্ত নামটিই ছিল অধিকতর ব্যাঞ্জনাময়। সেসময়ের গোঁড়ামি ভণ্ডামিতে পরিপূর্ণ আচার-সর্বস্ব কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুধর্মের জন্য ভগ্ন-শিবমন্দিরের চেয়ে উপযুক্ত উপমা আর কী হতে পারে? নাটকটি শুরুই হয়েছে দুই গরিব খেটে খাওয়া মানুষের হতাশাপূর্ণ আলাপের মাধ্যমে, যা সেকালের পক্ষে একেবারেই বিজাতীয়। মূল গল্পের দিক থেকে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’-র চেয়ে ‘বুড় সালিক...’ অনেক আঁটসাঁট। আগেরটিতে চরিত্রের সংখ্যা প্রায় চব্বিশ আর দ্বিতীয়টিতে মাত্র নয়। ভক্তপ্রসাদ একজন বুড়ো বৈষ্ণব জমিদার, তার কাম-লালসার কোনও শেষ নেই। পুঁটি নাম্নি এক বিধবা রমণী জমিদারের চোখে পড়ে যাওয়া গ্রামের মেয়ে-বউদের ফুসলিয়ে নিয়ে এসে যোগান দেয় তার ভোগের জন্য। এই কাজ সে করে চলেছে ত্রিশ বছর যাবত, এবং এভাবে যে সে কত মেয়েমানুষের ‘পরকাল’ খেয়েছে তার ঠিকানা নেই। এবার তার লক্ষ্য হানিফ গাজির বউ ফতেমা। কথামতো সে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় (ভগ্নশিবমন্দির প্রাঙ্গণ) ফতেমাকে নিয়েও আসে কিন্তু ভক্তপ্রসাদ শেষ পর্যন্ত সফলকাম হতে পারে না, কেননা সেখানে আগে থেকেই ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল হানিফ। বেশ কৌতুকময় একটি দৃশ্যের মাধ্যমে নাটিকাটি শেষ হয়। বিস্তর অর্থদণ্ড দিয়ে এবং ‘জবন’-এর কাছে বারংবার ক্ষমাপ্রার্থনা করে কোনওমতে নিস্তার পায় লম্পট জমিদার। এই নাটিকার বেলাতেও ভাষা ব্যবহারে আশ্চর্য কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন মধুসূদন। তিনি নিজে সারাজীবন কাটিয়েছেন কলাকাতার শিক্ষিত অভিজাত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাহচর্যে। সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন, অনেকগুলি ধ্রুপদী ভাষার চর্চা করেছেন। সেই তিনিই যখন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য, লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়া বাড়ির মেয়েদের জন্য অথবা অন্ত্যজ মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য সংলাপ রচনা করেন তখন তা অবিশ্বাস্য ভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—এই সব মানুষদের সঙ্গে তিনি মিশলেন কবে, কীভাবে জানলেন এদের ব্যবহৃত ভাষা? কয়েকটি মাত্র সংলাপ, তাতেই চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম নাটিকার সারজন চৌকিদার মুটিয়া কিংবা দ্বিতীয় নাটিকার ভগী পঞ্চি আনন্দবাবু সবাই যেন পাঠকের প্রত্যক্ষভাবে চেনা।

স্বাভাবিক কারণেই নাটিকাদুটি সমসময়ে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চের জন্য রচিত হলেও শেষপর্যন্ত নাটিকাদুটি সে-মঞ্চে অভিনীত হতে পারেনি। দুটি প্রহসনের জন্য রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন দুটি ভিন্ন দলের মানুষ। এমন একশ্রেণির মানুষও তৎকালীন কলকাতা শহরে ছিল দুটি নাটিকাই যাদের কাছে অসহ্য মনে হয়েছিল। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে দুটি প্রহসনের সংযোজক হিসেবে ক্ষীণ একটি সূত্র রেখে দিয়েছেন নাট্যকার। গ্রামীণ জমিদার ভক্তপ্রসাদের ছেলে অম্বিকাও কলকাতা প্রবাসী এবং হিন্দু কলেজের ছাত্র, যে হিন্দু কলেজ তখন ইয়ং-বেঙ্গলিদের আখড়া। নববাবুদের মতো কোনও একটি সংস্কারপন্থীদের দলে ভিড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। ফলে দুটি নাটিকার একটি সাধারণ চরিত্র হিসেবে নিজেকে বা নিজের কোনও পরিচিত জনকে যদি কেউ কল্পনা করে নেন তবে তাকে দোষ দেওয়া চলে না, বরং তার কল্পনাশক্তির প্রশংসাই করতে হয়। ১৮৭৩ সালে পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর “বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাব”-এ ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’-র উচ্ছসিত প্রশংসা করলেও সমালোচনা করেছিলেন ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটিকার। একজন পরম বৈষ্ণবের পক্ষে এতখানি অধঃপতিত হওয়া অথবা যবনী-সংসর্গ করা সম্ভব বলে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে মধুসূদনের প্রহসনটি ছিল ভ্রান্তিমূলক এবং সমাজের পক্ষে হানিকর। কার পক্ষে কী সম্ভব আর কী অসম্ভব আজ অবশ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে পাঠকের কাছে।

          শিরোনামে জুড়ে দেওয়া ‘প্রয়াস’ শব্দটি নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে মধুসূদনের অধিকাংশ রচনাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে পড়ে। কিছু না কিছু তাৎক্ষণিক আবেগ, তাগিদ, উৎসাহ বা প্ররোচনা থেকেই তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টি। তাঁর নাটক, কাব্য বা অন্যান্য রচনা ফাইনাল প্রোডাক্ট বলতে যেমন বোঝায় ঠিক তেমন নয়। নিজের জীবনের মতোই তাঁর সবকিছুই যেন স্বতঃস্ফুর্ত, অসম্পূর্ণ এবং অসম্পাদিত। তিনি যদি আরও পাঁচ-সাতটি নাটক, আরও কয়েকটি প্রহসন, আরও কিছু মহাকাব্য ও সনেট রচনা করতেন তবে হয়তো আমরা তাঁর পূর্ণরূপে বিকশিত প্রতিভার প্রকাশ দেখতে পেতাম। তিনি যদি রবীন্দ্রনাথের মতো সুদীর্ঘ সৃষ্টিশীল আয়ু এবং একটা সুসংগঠিত জীবন পেতেন তবে হয়তো তাঁর তেজে ও দীপ্তিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ মনে হত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। কিন্তু নানা কারণে সেই মহাজাগতিক স্ফুরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তাই তাঁর প্রায় সমস্ত রচনাতেই একধরণের অধীরতা ও অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করি আমরা। তাই তাঁর সমস্ত রচনাই আজও জায়মান উত্তপ্ত এবং স্পন্দনশীল।    

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১) বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খণ্ড/ সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৪।

২) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, ৭ম খণ্ড/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ন বুক এজেন্সি, ১৯৯২।

৩) মধুসূদন/ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩।

৪) মধুসূদন: ব্যক্তি ও সৃষ্টি/ সম্পাদনা সুকুমার রায়, ঘোষ দস্তিদার পাবলিশিং কনসার্ন, ১৯৯৫।

৫) মধুসূদন রচনাবলী/ সম্পাদনা সব্যসাচী রায়, সাহিত্যম, ২০১৫।


No comments: