Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label প্রবন্ধ. Show all posts

Saturday, May 18, 2024

মহাকবির প্রহসন-প্রয়াস

 


অবাঙালি পাঠকের কাছে আবহমান বাংলা কবিতার পাঁচজন প্রধান কবির কথা বলতে গেলে তাঁর নাম আসে। এমনকি তিনজনের কথা বলতে গেলেও তাঁকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। তিনি চিরকালের চির-আধুনিক কবি মধুসূদন দত্ত। সমসময়ে অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েই বন্ধু রাজনারায়ণ বসু তাঁকে আখ্যায়িত করেছিলেন “মহাকবি” হিসেবে। আর একটি ইংরেজি রচনায় একালের প্রাবন্ধিক শিবনারায়ণ রায় স্বভাবসিদ্ধ দৃঢ়তায় ঘোষণা করলেন যে মধুসূদনই ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক কবি।

তিনি আজন্ম বিপ্লবী; সারাজীবন, বলতে গেলে জীবনের প্রতিটি ক্ষণ স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে গিয়ে বাজী রেখেছেন নিজের জীবন সংসার পরিবার। উনিশ বছর বয়সে ধর্মান্তরিত হয়েছেন, অধিকার হারিয়েছেন বিপুল পৈত্রিক সম্পত্তির, শ্বেতাঙ্গিনি বিবাহ করেছেন, পরবর্তী কালে বিবাহ-বিচ্ছিন্ন না হয়েই অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করেছেন অন্য এক শ্বেতাঙ্গিনি নারীর সাহচর্যে, বিদেশযাত্রা করেছেন, বিদেশ-বিভূঁইয়ে দিন কাটিয়েছেন অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের সঙ্গে, আবার বিদ্যাসাগরের পাঠানো টাকা হাতে পেয়ে তা তৎক্ষণাৎ খরচ করে ফেলেছেন বালকের মতো, সুযোগ পেলেই সাধ্যাতীত বিলাসিতা করেছেন, বন্ধু গৌরদাসকে চিঠিতে লিখেছেন—আমার জীবনযাত্রা বর্ধমান রাজার চেয়েও আড়ম্বরপূর্ণ, বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে দেশে ফিরেছেন একেবারে নিঃস্ব হয়ে, দেশে ফিরে আইনি পেশায় পসার জমাতে পারেননি, জীবনকে চূড়ান্তভাবে তুচ্ছ্যতাচ্ছিল্য করে দেহত্যাগ করেছেন প্রায় মাঝবয়সেই। আমাদের সাধারণ ছাপোষা বুদ্ধিতে যেমন তাঁর অনেক কার্যকলাপেরই ব্যাখ্যা মেলে না, তেমনই ধারণা করা যায় না তাঁর অতুলনীয় প্রতিভা সম্পর্কে। তিনি যতখানি র‍্যাডিক্যাল ততখানি আর কে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে? পূর্বজ কবির রচনাবলীতে অর্বাচীনের মতো লাথির ঘা না দিয়েও তিনি অসম্ভব রকমের মৌলবাদী শিল্পী। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে সেই মধুসূদন দত্তকে আজ আমরা ঠাঁই করে দিয়েছি স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের সুলভ অপরিসর আবাস-যোজনায়। সিলেবাসের বাইরে তাঁর জন্য আর কোনও আশ্রয় রাখিনি আমরা। দুহাজার চব্বিশ সালে তাঁর জন্মের দ্বিশতবর্ষ, ফলে এবার তাঁর রচনাবলির ধুলো ঝেড়ে নেড়েচেড়ে দুএক পৃষ্ঠা রচনা আমাদের না লিখলেই নয়। কেননা তা না করতে পারলে যে নিজেদের কাছেই নিজেদের মান থাকে না।

          জীবনের প্রথম চৌত্রিশ বছর তিনি বাংলাভাষায় কিছুই লেখেননি, কেননা সেই সময়কালে মাতৃভাষার প্রতি তাঁর কিছুমাত্র অনুরাগ বা আগ্রহ ছিল না। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২—এই চার-পাঁচ বছর সময়ে তিনি রচনা করেন পাঁচটি বাংলা নাটক (শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী, একেই কি বলে সভ্যতা?, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ এবং কৃষ্ণকুমারী) আর চারটি কাব্য (তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য, মেঘনাদবধ কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য এবং বীরাঙ্গনা কাব্য)। এই ক্ষীণ কালখণ্ডটিকে বাংলাভাষা এবং সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে উর্বর তথা ফলপ্রসূ সময় হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। কারণ কালের প্রেক্ষিতে এই এক-পলক সময়ের মধ্যেই ঘটে গিয়েছে একের পর এক সাহিত্য-বিপ্লব। পরবর্তী জীবনে (১৯৬২ থেকে ১৯৭৩) তাঁর বাংলা লেখালেখি সংখ্যায় একেবারে নগণ্য। উনিশশ’ বাষট্টিতে ইউরোপ-যাত্রা করেন কবি। সেখানে থাকাকালীন অনিবার্য আর্থিক সঙ্কট ও নানা পারিবারিক টানাপোড়েন স্বত্তেও পরীক্ষানিরীক্ষা করেন বাংলা সনেট নিয়ে, রচিত হয় একশটি চতুর্দশপদী কবিতা। মৃত্যুর ঠিক আগে লেখেন “মায়াকানন” নাটক এবং হোমারের ইলিয়াড-আশ্রিত অসমাপ্ত গদ্য-আখ্যান “হেক্‌টর-বধ”। এবং অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে মাদ্রাজ পর্বে তিনি ইংরেজিতে কিছু কিছু গদ্য-পদ্য রচনা করেছেন। কিন্তু মধুসূদনের সাহিত্যকর্ম বলতে মানুষ প্রধানত ওই চার-পাঁচ বছরের লেখালেখির কথাই বোঝেন।

          কী কী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল ওই বিশেষ কালপর্বে তা মোটামুটি ভাবে বর্ণনা করতে গেলেও অন্তত চারটি বিষয়ের কথা বলতে হয়। প্রথমত, বাংলা কাব্যে মিলটন প্রবর্তিত আমিত্রাক্ষর ছন্দের (blank verse) প্রথম প্রয়োগ। দ্বিতীয়ত, পয়ারের অভ্যস্ত কাঠামো অতিক্রম করে পদ্যের শরীরে গদ্যের মুক্তি এনে দেওয়া। তৃতীয়ত, পুরাণের চিরাচরিত আখ্যান অংশকে ভেঙে তছনছ করে দেওয়া (বিনির্মাণের এমন চূড়ান্ত উদাহরণ আর কী হতে পারে?)। এবং চতুর্থত, প্রথম রুচিশীল ও শিল্পসম্মত বাংলা নাটক রচনার সূত্রপাত। এসব ছাড়াও বাংলা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও মধুসূদনের। অবশ্য বাংলা সনেট তাঁর ইউরোপ-পর্বের কীর্তি। কবির বিদ্রোহী মেজাজের কিছুটা আভাস মেলে বন্ধু গৌরদাস বসাককে ১৮৫৯ সালের ১৯ মার্চ তারিখে লেখা একটি চিঠিতে। “যা কিছু সংস্কৃত ভাষায় লেখা, তারই প্রশস্তি গাওয়ার অভ্যাস আমাদের পায়ে বেড়ির মতো এঁটে বসেছে। সেই বেড়ি ভেঙ্গে ফেলাই আমার উদ্দেশ্য।” এই চিঠি থেকে মেঘনাদবধ কাব্য সহ অন্যান্য আরও কয়েকটি পুরাণ-আশ্রিত রচনার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

          বাংলা ভাষায় উৎকৃষ্ট নাটকের যে নিতান্ত অভাব—সেকথা মধুসূদনের গোচরে আসে যখন তিনি রামনারায়ণ তর্করত্ন বিরচিত “রত্নাবলী” অনুবাদের কাজ করছিলেন। একপ্রকার জেদের বসেই ১৮৫৯ সালে রচিত হল তাঁর প্রথম নাটক “শর্মিষ্ঠা”। শর্মিষ্ঠা নাটকের প্রথম সংস্করণের প্রারম্ভে মুদ্রিত হয়েছিল কবির সেই বিখ্যাত কবিতা, যা নানা প্রসঙ্গে নানা উপলক্ষ্যে আজও অকাতরে উদ্ধৃত করে থাকি আমরা। তৎকালীন নাটক নিয়ে কবির মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে এই প্রবেশক রচনাটিতে।

“...

কোথায় বাল্মীকি ব্যাস         কোথা তব কালিদাস,

কোথা ভবভূতি মহোদয়।

অলীক কুনাট্য রঙ্গে            মজে লোক রাঢ়ে বঙ্গে,

নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়।

সুধারস অনাদরে              বিষ বারি পান করে,

তাহে হয় তনুমনঃক্ষয়।

...”

         

সঠিক ভাবে দিনক্ষণের হদিশ না মিললেও, বিশেষজ্ঞ তথা ঐতিহাসিকদের ধারণা মধুসূদনের প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল শর্মিষ্ঠার পরে, এবং পদ্মাবতীর আগে। এক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ, কেননা তার আগে প্রহসনের নামে বঙ্গদেশে ছোটখাটো সামন্ত-রাজার রাজসভায় বা জমিদারের অঙ্গনে যে টুকরো নাটক অভিনিত হত সেসব ছিল নিতান্তই চটুল আদিরসাত্মক খেঁউড়ে পরিপূর্ণ একপ্রকার কদর্য পরিবেশনা। “একেই কি বলে সভ্যতা?” এবং “বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” (ড়-এ ও-কার নেই) সেসময় কলকাতার নাট্য-পরিমণ্ডলে উপস্থিত হয়েছিল মূর্তিমান বিপ্লবের মতোই। গ্রীক, লাতিন, সংস্কৃত প্রভৃতি ধ্রুপদী ভাষা চর্চার ফলেই হয়তো মধুসূদন এমন রচনার অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকবেন। এবং আরও স্পষ্ট করে বললে ইউরোপীয় নাটকের প্রভাবই হয়তো ছিল অধিকতর। প্রহসন দুটি রচিত হয়েছিল পাইকপাড়ার জমিদারের প্রতিষ্ঠিত বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে অভিনয়ের জন্য। কিন্তু শেষপর্যন্ত নানা কারণে সেগুলি অভিনীত হয়নি, কিছুকাল পরে প্রকাশিত হয় পুস্তকাকারে। দুটি প্রহসনের বিষয়বস্তু একেবারেই ভিন্ন মেরুর। একটিতে দেখানো হয়েছে সে-সময়ের তথাকথিত শিক্ষিত আধুনিক যুবসমাজের মধ্যে পুঞ্জীভূত অন্ধকার। আর অন্যটিতে রয়েছে এক ভণ্ড হিন্দু জমিদারের অনিঃশেষ কাম-লালসা চরিতার্থ করার নানা ছল-কৌশল এবং তার কৃতকর্মের উপযুক্ত ফল প্রাপ্তির বিবরণ। এই দুটি রচনাও মধুসুদনের নিজের তাগিদে লেখা নয়, লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র সিংহের তাগাদায়। ঈশ্বরচন্দ্র চাইছিলেন মূল নাটকের শেষে অভিনয় করা যায় এমন ‘ফার্স’, যাতে দর্শক অভিনয় দেখে হালকা মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারে। সেই ফরমায়েসের লেখাই এমন ভাবে লিখলেন যে তা হয়ে দাঁড়াল আইকনিক এবং কালজয়ী। সুকুমার সেন লিখেছেন, “এই দুইখানি গ্রন্থ বাঙ্গালা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনার অন্যতম”। পরে দীনবন্ধু মিত্র যখন “সধবার একাদশী” লিখলেন তিনি মধুসূদনকে অনুসরণ করলেন গুরুর মতো।

বৃন্দাবন-ফেরত ধর্মপ্রাণ কর্তা মশাই, তাঁর কলেজে পড়া পুত্র নব, নব-র বন্ধু কালী প্রমুখকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে “একেই কি বলে সভ্যতা?”। কাহিনির প্রয়োজনে এসেছে অন্তঃপুরবাসিনী কিছু স্ত্রীলোক, কজন বারবিলাসিনী, এবং আরও কিছু অকিঞ্চিৎকর চরিত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রহসনের আখ্যান অংশ বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে কমবেশি পরিচিত। কয়েকজন ধনির দুলাল ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত তথাকথিত আধুনিক এবং সংস্কারপন্থী যুবকের বিপথগামিতাই এই ব্যাঙ্গ-নাটিকার উপজীব্য। মধুসূদনের আক্রমণের লক্ষ্য এক্ষেত্রে সেই যুবককুল যাদের কাছে অন্ধকারাচ্ছন্ন বঙ্গীয় তথা ভারতীয় সমাজের সংস্কারসাধন আসলে প্যাসন নয়, ফ্যাসন। সমাজ সংস্কারের চেয়ে নিজেদের ইউরোপীয় কালচারের সঙ্গে মানানসই করে তোলাই তাদের উদ্দেশ্য। ভোগ-বিলাস ছাড়া তাদের কোনও মহত্তর লক্ষ্য নেই। ফলত শেষপর্যন্ত তাদের সংস্কারকর্মের গতি যথেচ্ছ সুরাপান আর গণিকাগমনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। নাটকে এক জায়গায় উল্লিখিত হয়েছেন স্বয়ং রামমোহন। অনেকে বলেন নব বাবুর জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা আসলে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানোপার্জিকা সভারই প্রতিরূপ। মধুসূদন সমাজ সংস্কারক নন, তিনি শিল্পী। শিল্পীর দৃষ্টি মোটাদাগের লাভ-লোকসানের হিসেব অতিক্রম করে সুক্ষ্মতার দিকেই। এই নাটকের ক্ষেত্রে তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য আংশিক ভাবে তিনি নিজেও। কেননা একসময় তিনিও তো ইয়ং বেঙ্গলের অনুসারীই ছিলেন। বিষয়বস্তুর কথা ছেড়ে দিলেও লিখনশৈলী ও ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মধুসূদন অকল্পনীয় দক্ষতার পরিচয় রেখেছেন। বিশেষত নাটকের শেষের দিকে বাড়ির মেয়েদের তাসখেলা ও গল্পগাছার যে দৃশ্যের অবতারণা তিনি করেছেন তা যে প্রায় দুশ বছর আগে রচিত বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় আমাদের। বাড়ির মেয়েদের মুখে এমন সাহসী সংলাপ বসাতে আজকের নাট্যকারও দুবার ভাববেন।

“বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ” নাটিকার নাম মধুসূদন প্রথমে দিয়েছিলেন “ভগ্নশিব মন্দির”। পরে পাইকপাড়ার ছোট রাজা ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ নাম বদলের প্রস্তাব করেন। কিন্তু আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মনে হয় নাট্যকার প্রদত্ত নামটিই ছিল অধিকতর ব্যাঞ্জনাময়। সেসময়ের গোঁড়ামি ভণ্ডামিতে পরিপূর্ণ আচার-সর্বস্ব কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুধর্মের জন্য ভগ্ন-শিবমন্দিরের চেয়ে উপযুক্ত উপমা আর কী হতে পারে? নাটকটি শুরুই হয়েছে দুই গরিব খেটে খাওয়া মানুষের হতাশাপূর্ণ আলাপের মাধ্যমে, যা সেকালের পক্ষে একেবারেই বিজাতীয়। মূল গল্পের দিক থেকে ‘একেই কি বলে সভ্যতা’-র চেয়ে ‘বুড় সালিক...’ অনেক আঁটসাঁট। আগেরটিতে চরিত্রের সংখ্যা প্রায় চব্বিশ আর দ্বিতীয়টিতে মাত্র নয়। ভক্তপ্রসাদ একজন বুড়ো বৈষ্ণব জমিদার, তার কাম-লালসার কোনও শেষ নেই। পুঁটি নাম্নি এক বিধবা রমণী জমিদারের চোখে পড়ে যাওয়া গ্রামের মেয়ে-বউদের ফুসলিয়ে নিয়ে এসে যোগান দেয় তার ভোগের জন্য। এই কাজ সে করে চলেছে ত্রিশ বছর যাবত, এবং এভাবে যে সে কত মেয়েমানুষের ‘পরকাল’ খেয়েছে তার ঠিকানা নেই। এবার তার লক্ষ্য হানিফ গাজির বউ ফতেমা। কথামতো সে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট জায়গায় (ভগ্নশিবমন্দির প্রাঙ্গণ) ফতেমাকে নিয়েও আসে কিন্তু ভক্তপ্রসাদ শেষ পর্যন্ত সফলকাম হতে পারে না, কেননা সেখানে আগে থেকেই ঘাপটি মেরে অপেক্ষা করছিল হানিফ। বেশ কৌতুকময় একটি দৃশ্যের মাধ্যমে নাটিকাটি শেষ হয়। বিস্তর অর্থদণ্ড দিয়ে এবং ‘জবন’-এর কাছে বারংবার ক্ষমাপ্রার্থনা করে কোনওমতে নিস্তার পায় লম্পট জমিদার। এই নাটিকার বেলাতেও ভাষা ব্যবহারে আশ্চর্য কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন মধুসূদন। তিনি নিজে সারাজীবন কাটিয়েছেন কলাকাতার শিক্ষিত অভিজাত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাহচর্যে। সাহেবদের সঙ্গে মেলামেশা করেছেন, অনেকগুলি ধ্রুপদী ভাষার চর্চা করেছেন। সেই তিনিই যখন খেটে খাওয়া মানুষের জন্য, লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়া বাড়ির মেয়েদের জন্য অথবা অন্ত্যজ মুসলিম নারী-পুরুষের জন্য সংলাপ রচনা করেন তখন তা অবিশ্বাস্য ভাবে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে—এই সব মানুষদের সঙ্গে তিনি মিশলেন কবে, কীভাবে জানলেন এদের ব্যবহৃত ভাষা? কয়েকটি মাত্র সংলাপ, তাতেই চরিত্রগুলি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। প্রথম নাটিকার সারজন চৌকিদার মুটিয়া কিংবা দ্বিতীয় নাটিকার ভগী পঞ্চি আনন্দবাবু সবাই যেন পাঠকের প্রত্যক্ষভাবে চেনা।

স্বাভাবিক কারণেই নাটিকাদুটি সমসময়ে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চের জন্য রচিত হলেও শেষপর্যন্ত নাটিকাদুটি সে-মঞ্চে অভিনীত হতে পারেনি। দুটি প্রহসনের জন্য রুষ্ট হয়ে উঠেছিলেন দুটি ভিন্ন দলের মানুষ। এমন একশ্রেণির মানুষও তৎকালীন কলকাতা শহরে ছিল দুটি নাটিকাই যাদের কাছে অসহ্য মনে হয়েছিল। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে দুটি প্রহসনের সংযোজক হিসেবে ক্ষীণ একটি সূত্র রেখে দিয়েছেন নাট্যকার। গ্রামীণ জমিদার ভক্তপ্রসাদের ছেলে অম্বিকাও কলকাতা প্রবাসী এবং হিন্দু কলেজের ছাত্র, যে হিন্দু কলেজ তখন ইয়ং-বেঙ্গলিদের আখড়া। নববাবুদের মতো কোনও একটি সংস্কারপন্থীদের দলে ভিড়ে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না। ফলে দুটি নাটিকার একটি সাধারণ চরিত্র হিসেবে নিজেকে বা নিজের কোনও পরিচিত জনকে যদি কেউ কল্পনা করে নেন তবে তাকে দোষ দেওয়া চলে না, বরং তার কল্পনাশক্তির প্রশংসাই করতে হয়। ১৮৭৩ সালে পণ্ডিত রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁর “বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাব”-এ ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’-র উচ্ছসিত প্রশংসা করলেও সমালোচনা করেছিলেন ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটিকার। একজন পরম বৈষ্ণবের পক্ষে এতখানি অধঃপতিত হওয়া অথবা যবনী-সংসর্গ করা সম্ভব বলে তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে মধুসূদনের প্রহসনটি ছিল ভ্রান্তিমূলক এবং সমাজের পক্ষে হানিকর। কার পক্ষে কী সম্ভব আর কী অসম্ভব আজ অবশ্য পরিষ্কার হয়ে গেছে পাঠকের কাছে।

          শিরোনামে জুড়ে দেওয়া ‘প্রয়াস’ শব্দটি নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে মধুসূদনের অধিকাংশ রচনাই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে পড়ে। কিছু না কিছু তাৎক্ষণিক আবেগ, তাগিদ, উৎসাহ বা প্ররোচনা থেকেই তাঁর সাহিত্য-সৃষ্টি। তাঁর নাটক, কাব্য বা অন্যান্য রচনা ফাইনাল প্রোডাক্ট বলতে যেমন বোঝায় ঠিক তেমন নয়। নিজের জীবনের মতোই তাঁর সবকিছুই যেন স্বতঃস্ফুর্ত, অসম্পূর্ণ এবং অসম্পাদিত। তিনি যদি আরও পাঁচ-সাতটি নাটক, আরও কয়েকটি প্রহসন, আরও কিছু মহাকাব্য ও সনেট রচনা করতেন তবে হয়তো আমরা তাঁর পূর্ণরূপে বিকশিত প্রতিভার প্রকাশ দেখতে পেতাম। তিনি যদি রবীন্দ্রনাথের মতো সুদীর্ঘ সৃষ্টিশীল আয়ু এবং একটা সুসংগঠিত জীবন পেতেন তবে হয়তো তাঁর তেজে ও দীপ্তিতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকেও কিঞ্চিৎ ম্রিয়মাণ মনে হত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। কিন্তু নানা কারণে সেই মহাজাগতিক স্ফুরণ সম্ভবপর হয়ে ওঠেনি। তাই তাঁর প্রায় সমস্ত রচনাতেই একধরণের অধীরতা ও অন্যমনস্কতা লক্ষ্য করি আমরা। তাই তাঁর সমস্ত রচনাই আজও জায়মান উত্তপ্ত এবং স্পন্দনশীল।    

সহায়ক গ্রন্থাবলী :

১) বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খণ্ড/ সুকুমার সেন, আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯৪।

২) বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, ৭ম খণ্ড/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, মডার্ন বুক এজেন্সি, ১৯৯২।

৩) মধুসূদন/ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৩।

৪) মধুসূদন: ব্যক্তি ও সৃষ্টি/ সম্পাদনা সুকুমার রায়, ঘোষ দস্তিদার পাবলিশিং কনসার্ন, ১৯৯৫।

৫) মধুসূদন রচনাবলী/ সম্পাদনা সব্যসাচী রায়, সাহিত্যম, ২০১৫।


Tuesday, October 1, 2019

উনি বলছেন


চুপ করুন, উনি কথা বলছেন। আসুন আমরা বাধ্য ছাত্রের মত ওঁর সম্মুখে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ি। এমনটা সচরাচর ঘটে না। এখন ঘটছে, আমাদের এই জীবদ্দশায়। আসুন আমরা গর্ব অনুভব করি। যেমন গর্ব অনুভব করা যায় বাংলা তথা ভারতবর্ষের খাঁটি বামপন্থী কয়েকজন মানুষকে জীবিত দেখেছি বলে। যেমন গর্বিত হওয়া যায় আমরা আমাদের জীবদ্দশায় জয় গোস্বামীর জায়মান কাব্য-কর্মের আস্বাদ নিতে পারছি বলে। অন্তত শেষ বয়সের ভীমসেন যোসীর ভীমপলশ্রী বা মালকোষ শুনেছি বলে। ঠিক তেমনই নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করব আমরা ওঁকে আমাদের সমসময়ে কথা বলতে শুনছি বলে, লিখতে দেখছি বলে। আমাদের সামান্য জীবনে বিরল ও অসামান্য এই প্রাপ্তি। উনি অবিরাম লিখছেন কথা বলছেন বাংলা আধুনিক গান নিয়ে বাংলা সঙ্গীত নিয়ে। এমন সহজ করে এত এত গভীর সব কথা কে বলেছেন আগে? ক্ষমাহীন মূর্খতায় আজকাল বড্ড বেশি কথা বলি আমরা, সীমাহীন অজ্ঞানতায় হয়ে পড়ি পণ্ডিতন্মন্য। এবার আমাদের নিশ্চুপ হয়ে বসতেই হবে।
          হ্যাঁ, কবীর সুমন। ঐতিহ্যের প্রতি এতখানি শ্রদ্ধাশীল গতানুগতিকতার এমন তীব্র বিরোধী অনুজদের প্রতি এত স্নেহার্দ্র অগ্রজদের প্রতি এত নির্মম এত গভীর ভাবে রাজনৈতিক, এত বড় প্রতিভাবান, এত খামখেয়ালী, এমন নিবিড় সুরেলা, এমন কঠোর প্রতিবাদী শিল্পী বাংলা সঙ্গীত জগত আগে কোনোদিন দেখেছে কি? কত অনায়াসে তিনি ধর্মান্তরিত হতে পারেন অথচ প্রথাগত ঈশ্বরের প্রতি তাঁর তেমন শ্রদ্ধাই নেই। তিনি বড়ে গুলাম আলি, আমির খান, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ কিংবা সচিন দেব বর্মণকে মনে করেন ঈশ্বরের চেয়ে বড়। তিনি পলিটিক্সের তর্জমা করেন লোকনীতি (রাজনীতি নয়)। আশিরপদনখ বামপন্থী হয়েও যোগদান করেন একটি চূড়ান্ত ঊশৃঙ্খল ডানপন্থী দলে। উদাসীন ভাবে প্রবেশ করেন ক্ষমতার অলিন্দে আবার অনায়াসে ফিরে আসেন নিজস্ব শিল্পিত অনুশীলনে। তাঁকে সমালোচনায় জর্জরিত করা যায়, নির্দয় ভাবে তাঁর দিকে এগিয়ে দেওয়া যায় বিদ্বেষের বিষ, তাঁকে ঘৃণা করা যায়, তাঁর বিনাসের চক্রান্ত করা যায়। কিন্তু এত সত্ত্বেও তাঁকে উপেক্ষা করা যায় না। অনিবার্য ভাবে প্রতিটি শিল্পরসিক মানুষকে তাঁর প্রতি মনোযোগী হতেই হয়। বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে তাঁর মত প্রতিভাবান সঙ্গীতকারের আবির্ভাব বা উপস্থিতি হয়ত বিরল নয় কিন্তু তাঁর মত এমন সুগভীর তাত্ত্বিক ও অনুপুঙ্খ ভাষ্যকার সত্যিই দুর্লভ।
          কয়েক দশকের খরাপীড়িত বাংলা আধুনিক গানে তিনিই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন প্রাণ, আর গান ফিরে পেয়েছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিনে তার হারিয়ে ফেলা প্রাসঙ্গিকতা। বেঁচে থাকার জন্য বাংলা গানের দিকবদল যে অনিবার্য হয়ে পড়েছিল তা অনুভূত হচ্ছিল বেশ কয়েক দশক ধরে। অনাগত কোনও একটা ফর্ম বা আঙ্গিকের জন্য অসহায় ভাবে অপেক্ষমাণ ছিল নবীন গায়কের কণ্ঠ শ্রোতার কান। কিন্তু সেই বহুপ্রতীক্ষিত নতুনের দেখা মিলছিল না কিছুতেই। চেষ্টা যে একেবারে হচ্ছিল না এমনটা নয়। বরাবরের মত তখনও গণসংগীতে চেনা গণ্ডি ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসার প্রবণতা। চিরাচরিত ভাবে লোকসঙ্গীতও নিজস্ব ধারায় প্রবহমান। কিন্তু আধুনিক বাংলা গান হয়ে পড়েছিল স্রোতহীন বদ্ধ জলাশয়ের মত। জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মত শক্তিমান কেউ কেউ একক ভাবেই নতুনের সাধনায় ব্যাপৃত ছিলেন। অভিনব বহুমাত্রিকতা নিয়ে উল্কার মত আবির্ভূত হয়েছিল মহিনের ঘোড়াগুলি। কিন্তু তবু কিছুতেই বাংলা মেনস্ট্রিম আধুনিক গানের অচলায়তন ভেঙ্গে পড়ছিল না। একদা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী সুমন সেই কর্তব্যে প্রথম মনোযোগী হলেন, এবং আমরা পেলাম একটি ঐতিহাসিক মাইলস্টোন “তোমাকে চাই”। তারপরের ইতিহাস আজ সর্বজনবিদিত, বাংলা মূল ধারার আধুনিক গানের আদলটাই আমূল বদলে গেল। এই নতুন শতাব্দীর সমস্ত প্রতিভাবান শিল্পীর কাছে তিনি অবশ্যই আধুনিকতার ভগীরথ। কিন্তু কবীর সুমনের সাংগীতিক প্রতিভাবা অবদান নিয়ে আলোচনা এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। আমরা পরিচিত হতে চাইব তাত্ত্বিক ও ভাষ্যকার সুমনের সঙ্গে।
          এখন প্রশ্ন উঠবে— যিনি একদা ছয় সাত বা আটের দশকের বাংলা গান ও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের নির্মম ভাবে আক্রমণ করেছেন, সমালোচনায় জর্জরিত করেছেন তিনি কীভাবে নিরপেক্ষ হতে পারেন তাঁর লেখায় কথায় বা সাক্ষাৎকারে? আমরা কী করে ভুলে যাই সেই নয়ের দশকের শুরুর দিনগুলির কথা, যখন নতুন ও পুরনোপন্থীদের মধ্যে তিক্ত বাদানুবাদে ভরে উঠছিল সংবাদপত্রের সাপ্তাহিক ক্রোড়পত্রগুলি। এমনকি সুমনের গান গাওয়ার অপরাধে স্নেহধন্যা হৈমন্তী শুক্লার সমালোচনা করতেও দ্বিধা করেন নি মান্না দে-র মত উদার মানুষ। তখন কেউ কেউ বলছেন, ‘ওগুলো গান নয়, আবৃত্তি’। মান্না দে বলছেন—‘... অবশ্য, “পেটকাটি চাঁদিয়াল” শুনতে মন্দ লাগছে না’। যার মানে দাঁড়ায় অন্য গানগুলি তেমন পাতে দেওয়ার যোগ্য নয়। আর এইসব বিরূপ সমালোচনায় রাগী সুমন আরও রেগে উঠছেন। সাবেকী বাংলা গানের প্রতি তাঁর আক্রমণ হয়ে উঠছে আরও বিদ্বেষপূর্ণ একরোখা।
সেই বিদ্বেষ একদিন বদলে গেল শ্রদ্ধায়, চরমপন্থি সুমন হয়ে উঠলেন দায়িত্ববান আলোচক। অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন শিল্প সংস্কৃতির জগতে অবশ্য খুব বে-নজির নয়। কল্লোলের লেখকেরা একসময় রবীন্দ্রনাথকে কম আক্রমণ করেননি। তরুণ বয়েসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও লিখেছিলেন, ‘তিন জোড়া লাথির ঘায়ে রবীন্দ্র রচনাবলী লুটোয় পাপোষে’। পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব বসু (একজন অন্যতম কল্লোল-কর্মী) লেখেন রবিন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন নিয়ে এক আশ্চর্য সুন্দর বই “সব পেয়েছির দেশে”। আর সুনীল লেখেন “প্রথম আলো”, যেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনীর থেকেও অধিক উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত। আসলে দৃষ্টিভঙ্গির এমন পরিবর্তন সম্ভব হয়ে ওঠে শিল্পী বা সাহিত্যিক জীবনের একটি বিশেষ বৃত্ত সম্পূর্ণ হলে। প্রথমে পুরনো যা কিছু তাকে ভেঙ্গে চুরমার করে দেওয়া, তারপর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মান করা আর্ট-ফর্মের আধুনিক ইমারৎ। প্রথম দিকের এই কালাপাহাড়ি উগ্রপন্থাটি অনিবার্য কেননা তা নাহলে নিজস্ব নতুন পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভবপর হয়ে ওঠে না, থেকে যায় পুনরাবৃত্তির ভয়, পূর্বজদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা। একজন প্রকৃত শিল্পীই পারেন এই বৃত্ত সম্পূর্ণ করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় উন্নীত করতে। এই পথেই কবীর সুমন আজ আধুনিক বাংলা গানের একজন অদ্বিতীয় ‘কাল্ট ফিগার’। বাংলা গান নিয়ে কিছু বলবার বা লিখবার জন্য তিনি অবশ্যই একজন অথরিটি।
সুমন যখন বাংলা গান নিয়ে কথা বলতে বা লিখতে শুরু করলেন আমরা পেলাম শান্ত স্তিতধি নিরপেক্ষ এবং প্রকৃত জ্ঞানী একজন সঙ্গীত ব্যাক্তিত্বকে। মঞ্চে পারফর্ম করার সময় অনর্গল কথা বলে যাওয়া তাঁর বরাবরের অভ্যেস। তবে আগে তিনি বলতেন মুলত রাজনৈতিক কথাবার্তা, যা হয়ে উঠত তাঁর বিস্ফোরক গানগুলির জন্য প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত প্রিলিউড বা ইন্টারলিউড। আর ইদানিং তিনি প্রধানত কথা বলেন বাংলা আধুনিক গান নিয়ে, গানের রক্তমাংস ও নির্মাণশৈলী নিয়ে। এমনিতে সুমন সুলেখক, সুবক্তাও। শুধু সঙ্গীত তো নয় সাহিত্যসংস্কৃতির অন্যান্য শাখাতেও তাঁর অশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ। এই মুহূর্তে তাঁর মত আর কে আছেন যিনি সমসময়ের চিত্রকলা, নাটক, কবিতা, কথাসাহিত্য বা সিনেমার খুঁটিনাটি বিষয়ে সচেতন ও চিন্তাশীল। সংস্কৃতিচেতনার এই ব্যাপ্তি তাঁর লেখালেখি বা কথাবার্তায় যোগ করেছে এক ভিন্নমাত্রা। মঞ্চে কখনও তিনি দুটি গানের মধ্যবর্তী বিরতিতে হঠাৎ আবৃত্তি করে ওঠেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তর কবিতা। আবার কখনও হয়ত সলিল চৌধুরীর একটি বিখ্যাত গান নিপুণ ভাবে ব্যবচ্ছেদ করে দেখিয়ে দেন সে-গানের গহনে লুকিয়ে থাকা বাংলা পদাবলী কীর্তনের ছায়াটিকে। আর শুধু মঞ্চ-অনুষ্ঠানের ফাঁকফোকর ভরানো কথা তো নয়, সাক্ষাৎকার টক-শো এমনকি ফোনালাপেও তিনি অক্লান্ত। কেবল কথা নয় তিনি লিখেও চলেছেন অবিরাম। সংবাদপত্রের জন্য সাপ্তাহিক কলাম, স্বয়ংসম্পূর্ণ বই, এবং নিজস্ব ব্লগে, এমনকি নিজের ফেসবুক পেজেও তিনি গানবাজনা সাহিত্য সংস্কৃতি রাজনীতি অথবা সমসাময়িক সমাজ নিয়ে মুখর।
অব্যর্থ শব্দ প্রয়োগ, অনবদ্য সেন্স অফ হিউমার, ভাবনার স্বচ্ছতা এবং তা প্রকাশের অনন্য কৃতকৌশল তাঁকে করে তুলেছে একজন অসামান্য লেখক বা কথক। তিনি বলেন, কণ্ঠের আগে প্রস্তুত করে তুলেছেন নিজের কান। তিনি বলেন, দুহাত পেতে কাঙালের মত তিনি আহরণ করেছেন বাংলা গানের চিরকালীন মণিমাণিক্য, কীর্তন থেকে টপ্পা, পুরাতনী থেকে রবীন্দ্র-অতুলপ্রসাদ-নজরুল। তিনি আরও বলেন, ‘কোনও নারীর প্রতি কখনও বিশ্বস্ত থাকি নি, বিশ্বস্ত থেকেছি সঙ্গীতের প্রতি’। এককালে অব্যবহিত আগেকার বাংলা সঙ্গীত ও সঙ্গীতকারদের প্রতি নিক্ষিপ্ত তাঁর বিষোদ্‌গার দেখেছি আমরা। আজ দেখি সেইসব অগ্রজদের প্রতি নিবেদিত তাঁর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা। তাঁর লেখা খবরকাগজের সাপ্তাহিক কলমগুলি বরাবরই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়ে এসেছে, সে আনন্দবাজার হোক বা আজকাল। এই সেদিন অবধি তিনি আনন্দবাজারের রবিবাসরীয় পাতায় “সুমনামি” নামে একটি অনুপম ধারাবাহিক লেখা লিখছিলেন। সে-লেখার প্রায় প্রতিটি কিস্তিই হয়ে উঠত বারংবার পাঠযোগ্য এক একটি মাস্টারপিস, পরে তা গ্রন্থাকারে সংকলিত হয়েছে।
রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী সময়ের গীতিকারেরা স্বকীয় দোষেই তাঁদের প্রাপ্য কবিখ্যাতি খুইয়ে বসেছিলেন, দিনের পর দিন তাঁদের রচনাগুলি হয়ে উঠছিল তরল থেকে তরলতর। অনেক অনেক কাল পর, সুমন একক প্রতিভা ও উদ্যমে পুনরুদ্ধার করেছেন গীত-রচয়িতাদের সেই হৃতগৌরব। এই সময়ের একটি অগ্রণী প্রকাশক অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে কাব্যগ্রন্থের সমান মর্যাদায় কয়েক খণ্ডে প্রকাশ করেছে তাঁর গানের সঙ্কলন। সমসময়ের অন্যতম প্রধান কবি জয় গোস্বামীর একাধিক কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে সুমনের নাম। এও এক অমূল্য স্বীকৃতি।ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীতের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ (যেহেতু তিনি একজন দক্ষ খেয়ালিয়া হিসেবেই নিজের শিল্পীজীবনের সূচনা করে ছিলেন) রেখেও তিনি রচনা করেছেন সুরের এক অভিনব বিনির্মাণ। আর এইসব অনন্য সাধারণ কীর্তিই তাঁকে দিয়েছে বাংলা আধুনিক গান নিয়ে কিছু লিখবার বা বলবার সুদৃঢ় ভিত্তি ও অটুট আত্মবিশ্বাস।
সুমন যখন একটি স্বল্পপরিচিত গানের আপাদমস্তক ব্যবচ্ছেদ করেন প্রায় শল্য-চিকিৎসকের নিপুণতায় তখন তুলনা হিসেবে একমাত্র মনে আসতে পারে “গোঁসাইবাগানে”-র জয় গোস্বামীকে। একজন অদীক্ষিত শ্রোতাও সে-লেখা পড়ে একটি গানের গভীর অন্তস্থলে বিরাজমান অপার রহস্যের খোঁজ পান এবং অভিভূত হন। স্বভাবতই, শ্রোতাকে শিক্ষিত করার বা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর গদ্য-রচনাগুলির ভূমিকা অনস্বীকার্য। গান নিয়ে তাঁর কথা বা লেখার সিংহভাগ জুড়ে থাকে বাংলা আধুনিক গানের বিবর্তন ও ইতিহাস। এবং সেই বিবর্তনের পথে তিনি যেসব প্রধান কারিগরদের নাম প্রায়ই সম্ভ্রমের সঙ্গে উল্লেখ করেন সেই নামগুলি মোটামুটি এইরকম— স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্র-নজরুল, হিমাংশু দত্ত, পঙ্কজ মল্লিক, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ, সচিনদেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী... । রবীন্দ্রনাথ তো আছেনই, তাছাড়া হিমাংশু দত্ত জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ অথবা সলিল চৌধুরীকে নিয়ে অনর্গল কথা বলে যেতে তাঁর কোনও ক্লান্তি নেই। চার পাঁচ বা ছয়ের দশকের কয়েকজন সুরকারের ব্যাপারে তাঁর অশেষ মুগ্ধতা। সেজ্ঞানপ্রকাশ,পঙ্কজ মল্লিক হোক কিংবা সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ। পূর্বজ কণ্ঠশিল্পীদের নিয়েও তাঁর গর্বের শেষ নেই, দিলিপ রায় উমা বসু থেকে পরবর্তীকালের হেমন্ত সতিনাথ উৎপলা মান্না সন্ধ্যা কিংবা অনতি-অতীতের জটীলেস্বর প্রতুল। আকাশবাণী কলকাতার “অনুরোধের আসর” কিংবা “রম্যগীতি”-র মত অবিস্মরণীয় অনুষ্ঠানগুলি নিয়েও কত মনোজ্ঞ আলোচনা তিনি আমাদের উপহার দিয়েছেন। প্রায় বিস্মৃত একেকটি মহামূল্যবান গান চিনিয়ে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘বন্ধু হে পরবাসী’ গানটির কথা। “জাতিস্মর” ছবির সঙ্গীত পরিচালনার সময় তিনি বারবার বলেছেন “অ্যান্টনি ফিরিঙ্গী”-র মান্না দের কথা। এই ছবিতেই শ্রীকান্ত রূপঙ্কর প্রমুখ অনুজ শিল্পীদের কতটা সস্নেহ তত্ত্বাবধানে তিনি অসাধারণ সব কম্পোজিশন গাইয়ে নিয়েছেন তা আমাদের ভুলে যাওয়ার কথা নয়।
এখন ওঁর ঊনসত্তর বছর বয়স। এবং উনি অবিরাম লিখছেন, কথা বলছেন। বাংলা গান নিয়ে তাঁর অন্তত পাঁচটি বই আমাদের হাতের কাছে— আজকাল প্রকাশনা থেকে “কোন পথে গেল গান” (২০০৬), দে’জ থেকে “মনমেজাজ” (২০১৩) এবং সপ্তর্ষি থেকে “আলখাল্লা” (২০০১), “দূরের জানালা” (২০১৫) আর “হয়ে ওঠা গান” (২০১৫) । তাছাড়া, সংবাদপত্রের পাতায় ছড়িয়ে থাকা অজস্র অসংকলিত রচনা, মাইল মাইল ব্লগ, ফেসবুকের নিয়মিত কথকতা তো আছেই। এবং ইউটিউবে প্রবহমান অসংখ্য সাক্ষাৎকার, কথাবার্তা বা ডেমনস্ট্রেশন-এর ভিডিও। বাংলা আধুনিক গান বা কবীর সুমনকে নিয়ে জ্ঞানগর্ভ গবেষণার প্রয়াস এই রচনার উদ্দেশ্য নয়। শুধুমাত্র হাতের কাছে ছড়িয়ে থাকা কবীর সুমনের এইসব বইপত্র অডিওভিসুয়াল-এর খবর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই এই অকিঞ্চিৎকর গদ্যটির অবতারণা। যেভাবে একটা ভালো বই বা ভালো মুভি দেখার পর তার অভিজ্ঞতা সুহৃদদের সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়ার জন্য ছটফট করে একজন এই লেখাটিও তেমনই এক তাড়না থেকে।

Wednesday, September 18, 2019

বিদ্যাসাগরের ধর্ম ও আমরা


শ্রীনিরদচন্দ্র চৌধুরীর নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় (রবিবাসরীয় নিবন্ধ, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ জুলাই ১৯৮৮) ঠাঁই জোটে নি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের। এই নির্বাচন যে বাঙালি মননে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল এবং ফলস্বরুপ শ্রী চৌধুরীকে যে কত ক্রোধমিশ্রিত সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল তা আমরা সবাই জানি। এই নির্বাচনের ছ’বছর পর একই পত্রিকায় প্রকাশিত (১ ও ৮ মে ১৯৯৪) অন্য দুটি নিবন্ধে শ্রী চৌধুরী কিছুটা যেন কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়াস করেন। তবে নির্বাচনের যথার্থতার প্রমাণ স্বরূপ তিনি যে কারণ গুলি উপস্থিত করলেন তার মধ্যে কয়েকটি অতি মামুলি, হাস্যকরও বটে। যেমন বঙ্গীয় ভট্‌চাজ পণ্ডিতদের মত বিদ্যাসাগরের ভুঁড়ি ছিল না; তিনি বঙ্গসমাজে তখনও অপ্রচলিত একটি কাজ-- নিজস্ব একটি লাইব্রেরী বানিয়েছিলেন; তাঁর চরিত্রে ‘আদর্শপরায়ণতা’, ‘কর্তব্যপরায়ণতা’, ‘নীতিপরায়ণতা’-র মত গুণাবলীর সন্নিবেশ ঘটেছিল, যে ধারণাগুলি নাকি (নিরদ সি-র মতে) ইংরেজি শিক্ষার ফলে এদেশে আমদানি হয়েছিল, এবং শব্দগুলি ছিল বাংলায় অপ্রচলিত, ইংরেজির অনুবাদ। যাই হোক, এই কৈফিয়ত দিতে গিয়ে কয়েকটি বিষয়ে বিদ্যাসাগরের মহত্ব তথা শ্রেষ্ঠত্ব তিনি মেনে নিতে বাধ্যই হয়েছিলেন। বাঙালিদের সঙ্গে আরও যে ব্যাপারটিতে মৌলিক মতভেব ছিল বিদ্যাসাগরের, অথবা অন্যভাবে বললে যা ছিল প্রধান প্রভেদ, তা হল তাঁর ধর্মমত ও ঈশ্বরভাবনা। নিরদ সি এই বিষয়ে বিশেষ বাক্যব্যায় করেন নি (নাকি সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছেন?), অন্য প্রসঙ্গে লিখিত একটি বাক্যে উল্লেখ টুকু আছে মাত্র। কিন্তু এই বিশেষ গুণটিই হতে পারত তাঁকে শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করার এক মস্ত অজুহাত।  
আজও সাধারণের মধ্যে বিদ্যাসাগরের অলৌকিক দয়া অথবা অবিশ্বাস্য সংবেদনশীলতা নিয়ে আলোচনা কিছুতেই শেষ হয় না। বিধবা বিবাহের প্রচলন, বহু বিবাহ রদ, নারী শিক্ষার প্রসার, কিংবা আদি বাংলা গদ্যের পরিকাঠামো রচনার মত বহু-চর্চিত বিষয়গুলি নিয়ে চর্চা করতে আমরা অক্লান্ত। তাঁর ধর্মমত অথবা ঈশ্বরবিশ্বাস বিষয়ক প্রশ্নগুলিই বরাবর থেকে গিয়েছে আমাদের অভ্যস্ত মনোযোগের বাইরে। কিন্তু ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের চিন্তাভাবনাকে এড়িয়ে চারিত্রিক দৃঢ়তা, অনমনীয় জেদ, অক্লান্ত কর্মতৎপরতা, সর্বোপরি মানুষের প্রতি তাঁর অপার করুণার মূলে নিহিত শক্তির সন্ধান সম্ভবপর নয়। সমসাময়িক মুষ্টিমেয় উদারপন্থী হিন্দু তাঁকে হিন্দু ভেবে আহ্লাদিত হয়েছেন, সংখ্যাগুরু গোঁড়ারা কেউ বলেছেন খ্রিষ্টান কেউ দেগে দিয়েছেন ব্রাহ্ম বলে, ওদিকে আবার ব্রাহ্মরা তাঁকে সতীর্থ বলে মেনে নেন নি। আর ঈশ্বরচন্দ্র একটি প্রায় নির্জন ধর্মমতের উপাসক হয়ে ক্রমাগত একা হয়ে পড়েছেন।
          ঈশ্বর ও ধর্ম বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্রের রচনা বা বক্তব্য খুবই বিরল, অথবা বলা চলে তিনি এই প্রসঙ্গে বরাবর নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছেন। এবং সেকারণে তিনি সমালোচিতও হয়েছেন। বিদ্যাসাগরের জীবনীকার বিহারিলাল সরকার প্রশ্ন তুলেছেন-- “অধ্যাপকের বংশে জন্ম লইয়া, ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের সন্তান হইয়া, হৃদয়ে অসাধারণ দয়া, পরদুঃখকাতরতা প্রবৃত্তি পোষণ করিয়া হিন্দু শাস্ত্রের প্রতি, হিন্দু ধর্মের প্রতি তিনি আন্তরিক দৃষ্টি রাখিলেন না কেন?” নানা সময়ে নানা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের মতামত বিচার করলে তাঁকে ঈশ্বর অবিশ্বাসী বলে মনে হয় না। কিন্তু জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে ঈশ্বরকে নিয়ে মাতামাতি যে তিনি পছন্দ করতেন না তা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়। ‘বোধোদয়’-এর প্রথম সংস্করণে নানা পার্থিব বিষয় নিয়ে শিশুপাঠ্য রচনা থাকলেও ঈশ্বর সংক্রান্ত কোনও কথাই ছিল না। ছিল না প্রত্যাশিত ভাবেই, কেননা জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা দিক যেখানে আলোচনার বিষয়, ঈশ্বর প্রসঙ্গ তো সেখানে অপ্রাসঙ্গিক হবেই। প্রথম সংস্করণ দেখে বিদ্যাসাগরের অনুরাগী বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এই বলে মৃদু সমালোচনা করেন যে, “মহাশয়, ছেলেদের জন্য এমন সুন্দর একখানি পাঠ্যপুস্তক রচনা করিলেন, বালকদের জানবার সকল কথাই তাতে আছে, কেবল ঈশ্বর বিষয়ে কোন কথা নাই কেন?” এই মতামতের প্রেক্ষিতে পরের সংস্করণে ঈশ্বর বিষয়ক একটি ক্ষুদ্র অংশ সংযোজন করে দেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু এই দৃষ্টান্ত একটি ব্যতিক্রম মাত্র, সারাজীবন তিনি ঈশ্বর প্রসঙ্গ বা ঈশ্বর বিষয়ক প্রশ্ন এড়িয়েই থেকেছেন বলা চলে। রামকৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলে তিনি তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান সহকারেই আপ্যায়ন করেছেন, ব্রহ্ম বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা শুনে নিজের মুগ্ধতাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু রামকৃষ্ণকে কথা দিয়েও তিনি দক্ষিণেশ্বরে যান নি, পরে তাই নিয়ে রামকৃষ্ণ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাছাড়া, বিদ্যাসাগর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা করতে গিয়ে আরও দুয়েকবার রুঢ় ও অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন রামকৃষ্ণ, যা স্মরণ করলে আজ তাঁর ভক্তরাও অস্বস্তিতে পড়বেন (দ্রষ্টব্য শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত)। যাক, সেবিষয়ে আলোচনা করা এই নিবন্ধের লক্ষ্য নয়। আসলে দুস্থ অসহায় মানুষের কল্যাণ সাধনের যে ব্রত পালনে ব্রতী হয়েছিলেন বিদ্যাসাগর, ঈশ্বর চিন্তায় মেতে উঠলে তাঁর সেই সাধনা ব্যহত হতে পারত। তাঁর কাছে দুস্থ অসহায় হতদরিদ্র মানুষ গুলিই ছিল ঈশ্বর। সম্মুখে উপস্থিত সেই শতশত ঈশ্বরকে উপেক্ষা করে পরম ব্রহ্মের উপাসনায় নিয়জিত হতে তাঁর মন সায় দেয় নি। বিদ্যাসাগরের জীবনী পাঠ করলে দেখা যায় তিনি প্রায়ই কেঁদে উঠছেন, অসহায় দীনদরিদ্র দুস্থ সংস্কারের শৃঙ্খলে বন্দী মানুষের কষ্টে সেই আপাত কঠোর দৃঢ়চেতা মানুষটি কিছুতেই অশ্রু সংবরণ করতে পারছেন না। যিনি দুঃখীর দুঃখে এমন ভাবে অস্থির কাতর, সহায়হীনের জন্য যার হৃদয়ে এতখানি করুণা, তিনি আর কী ঐশ্বর্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে নতজানু হবেন? আসলে মানুষই ছিল তাঁর কাছে সাক্ষাৎ ঈশ্বর, আর মানুষের কল্যাণের জন্য করা কর্মই ছিল তাঁর ধর্ম।
          ঈশ্বর বিষয়ে একান্ত নিজস্ব নিভৃত একটি মতামত থাকলেও ধর্ম বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন প্রচ্ছন্ন বিপ্লবী।  তাঁর অনুরাগী কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাঁকে বর্ণনা করেছেন একজন নাস্তিক রূপে, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বলেছেন ‘অজ্ঞেয়বাদী’। তিনি একবার এক কাশীবাসি ব্রাহ্মণকে বলেছিলেন যে তিনি কাশী মানেন না, বিশ্বেশ্বরও মানেন না। বেদ-বেদান্তে তাঁর তেমন আস্থা ছিল না, তিনি এগুলিকে বলেছেন “ভ্রান্ত দর্শন”, (“That the Vedanta and Sankhya are false system of philosophy is no more a matter of dispute”)। সংস্কৃত কলেজের পুনর্গঠন সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠাতে গিয়ে তিনি লেখেন, “True is that the most parts of the Hindu system in philosophy do not tally with the advanced idea of modern times.” এবং তাই তিনি সুপারিশ করেন এই কলেজে বেদান্ত ও সাংখ্য দর্শনের পাশাপাশি পাশ্চাত্য দর্শন পঠনপাঠনেরও সুযোগ ছাত্রদের দেওয়া উচিৎ। যাতে ছাত্ররা হিন্দু ধর্মের দোষত্রুটি গুলিও চিহ্নিত করতে পারে। তৎকালীন সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত হতাশ। তিনি তাঁদের তুলনা করেছেন সেই খালিফার সঙ্গে যার নির্দেশে একদা আলেকজান্দ্রিয়ার মহামূল্যবান লাইব্রেরিটি ধ্বংস করা হয়েছিল। বিদ্যাসাগরের কথায়—“I regret to say that I cannot persuade myself to believe that there is any hope of reconciling the learned of India to the reception of new scientific truths”। এক্ষেত্রে learned বলতে সনাতন পণ্ডিত সামজের কথাই বলা হয়েছে।
সেই যুগে বিদ্যাসাগর ছিলেন নির্মোহ যুক্তিবাদী এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন একজন বিরল প্রজাতির মানুষ। বিদ্যাসাগর ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন সেকুলার। এ প্রসঙ্গে গোপাল হালদার লিখেছেন, “এ দেশে ধর্ম বলতে যা বোঝায়, এবং ধার্মিক লোকেরা ঈশ্বর বলতে যা বঝেন—বিদ্যাসাগর তাতে আস্থা রাখতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল মানবিক ধর্মে। … বিদ্যাসাগরের সমস্ত জীবনের মধ্য দিয়ে আমরা এই মানবধর্মেরই স্বীকৃতি দেখতে পাই—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’ আর এ ‘মানুষ’ চণ্ডীদাসের আধ্যাত্মিক মানুষ নন, আধুনিক সভ্যতার সামাজিক মানুষ।” মাইকেল মধুসূদন বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর হলেন “প্রথম মানুষ”। নবজাগরণের কালে বাংলায় যে যুক্তিবাদী আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল বিদ্যাসাগর ছিলেন তার অন্যতম প্রধান পুরোহিত। তাঁর কঠোর যুক্তিবাদ ও তীক্ষ্ণ মেধা তাঁকে সমাজ সংস্কারের বৈপ্লবিক কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রাণিত করেছিল। সনাতন হিন্দু পণ্ডিতদের মত সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতা যদি তাঁর থাকত তবে তিনি প্রবল তেজস্বী সংস্কারক হয়ে উঠতে পারতেন না। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম যুগের একজন মানবতাবাদী। বলা চলে, ঈশ্বর ও প্রথাগত ধর্ম বিষয়ে নীরব ও উদাসীন ছিলেন বলেই তিনি তাঁর অভীষ্টে পৌঁছতে পেরেছেন। তাঁর আগে ভারতবর্ষে সনাতন হিন্দু ধর্ম ছিল, বেদ-বেদান্ত ছিল, সেসব দর্শনের সটীক ব্যাখ্যা প্রদানকারী মেধাবী হিন্দু পণ্ডিতও ছিলেন অগণন। কিন্তু কেউ অনুভব করেন নি অকাল-বিধবা একটি রমণীর দুঃখ যন্ত্রণা অসহায়তার কথা, কেউ মাথা ঘামান নি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা বা তা প্রচলনের উপায় নিয়ে, কারও মনে হয়নি বহুবিবাহ আসলে কোনও মহৎ কর্ম নয় একটি মূর্তিমান অভিশাপ যার হাত থেকে সমাজকে আশু মুক্ত করা প্রয়োজন। তথাকথিত এক নাস্তিক পণ্ডিতের জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল এইসব যুগান্তকারী বিপ্লবের সম্ভাবনা। অতএব একথা কি বলা যায় না যে, ভারতবর্ষের মত একটি অশিক্ষা কুশিক্ষা ও কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে থাকা ভূখণ্ডের পক্ষে নাস্তিকতাই অধিক প্রয়োজনীয়? নবজাগরণের প্রথম বিপ্লবী রাজা রামমোহন রায়ের যোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র এবং অক্ষয় দত্ত। আর বিদ্যাসাগরের উত্তরসূরি কে ছিলেন ? এ বিষয়ে প্রত্যয় নিয়ে কিছু বলবার আগে আমাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াতে হয় পরবর্তী ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি।
আজ ভেবে দেখার সময় এসেছে বিদ্যাসাগরের সেই বিপ্লবী চিন্তাধারার কিছুমাত্র মুল্য কি আমরা দিয়েছি? হাজার প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি যে জ্ঞান-বিজ্ঞান নির্ভর মুক্তচিন্তার বীজ বপন করেছিলেন এই অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশে, তার লালন পালন করা দূরে থাক আমরা তার প্রাপ্য মর্যাদা টুকুও দিইনি। বিদ্যাসাগর ছিলেন ভুল দেশে ধূমকেতুর মত দৈবাৎ আবির্ভূত হওয়া এক বৈপ্লবিক জ্যোতি। তাঁর উদ্দিষ্ট পথের কোনও অগ্রপথিক ছিল না, তাঁর অনুসারীও কেউ নয়। আমরা বিদ্যাসাগরের ধর্মে দীক্ষিত হতে পারি নি, তাঁর ধর্মের উত্তরাধিকারী আমরা নই। আজ আমাদের যা ধর্ম সেই ধর্মকে তিনি আজীবন ঘৃণা করে গেছেন। তাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পর থেকেই তাঁর প্রবর্তিত ও অনুসৃত নির্জন ধর্মমতটিকে যত্ন করার পরিবর্তে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেওয়াতেই আমাদের উৎসাহ ছিল বেশি। কঠোর ত্যাগ ও অধ্যবসায়ের বলে তিনি বিজ্ঞান নির্ভর নির্মোহ যুক্তিবাদের, স্বার্থহীন মানবসেবার, আপসহীন সংস্কার কর্মের যে উজ্জ্বল ধারার প্রবর্তন করে গেলেন আমরা তা আন্তরিক ভাবে আগলে রাখতে পারিনি। নির্বোধের মত সেই অমূল্য সম্পদ অবহেলায় হারিয়ে যেতে দিয়েছি। যে সামগ্রিক জাগরণের আকুলতায় নবজাগরণের স্বপ্ন দেখেছিলেন রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার, আশ্চর্যজনক ভাবে ঠিক তার বিপরীত দিকে যাত্রা করেছে বাঙালি সমাজ। নানা মাপের ছোট বড় মাঝারি অবতারদের সামনে রেখে দেশব্যাপী ভক্তিবাদের লহর বইয়ে দিয়েছি আমরা। বঙ্গীয় রেনেসাঁ শেষপর্যন্ত পর্যবসিত হয়েছে সনাতন হিন্দু ধর্মের নবজাগরণে। ফিরে এসেছে, বেদ-বেদান্ত, মনুসংহিতা, আর সংগঠিত ধর্মীয় আন্দোলনের যুগ। নিজের শেষ বয়সেই বাঙালির এই অধোগামিতা প্রত্যক্ষ করে গিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র।
সেই ট্র্যাডিশন সোৎসাহে বহন করে চলেছি আমরা। আজ একবিংশ শতকে পা রেখেও অশিক্ষা কুশিক্ষা সংস্কারাচ্ছন্নতায় আবিল আমাদের সমাজ। চারপাশে গোঁড়ামি আর ভণ্ডামির বেসাতি, অসংখ্য সম্প্রদায়, শত শত ছোটবড় অবতার, হাজার হাজার ধর্মীয় আশ্রম। সংবাদপত্রের পাতায়, দূরদর্শনের চ্যানেল চ্যানেলে দিনরাত প্রচারিত হতে থাকে জ্যোতিষ আর গ্রহরত্নের বিজ্ঞাপন, অব্যর্থ বশীকরণের হাতছানি। কিছু কিছু চ্যানেল তো ধর্মের বানী প্রচারের জন্যই নির্দিষ্ট। সমাজে স্বমহিমায় বিরাজ করে জাতপাত আর অস্পৃশ্যতার মত মধ্যযুগীয় অন্ধকার। জন্মের দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের ভেবে দেখার সময় হয়েছে তাঁকে স্মরণ করবার নৈতিক অধিকার আমাদের আছে কি না। রামেন্দ্রসুন্দর যথার্থ লিখেছেন, “... ঐ নাম গ্রহণ করিতে আমাদের কোনরূপ অধিকার আছে কি না, এ বিষয়ে ঘোর সংশয় আরম্ভেই উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা। বস্তুত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এত বড় ও আমরা এত ছোট, তিনি এত সোজা ও আমরা এত বাঁকা, যে তাঁহার নাম গ্রহণ আমাদের পক্ষে বিষম আস্পর্ধার কথা বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।”
বিদ্যাসাগর কোনও কালেই বাঙালির খুব পছন্দের মানুষ ছিলেন না। জীবদ্দশায় বঙ্গসমাজকে তাঁর জাগরিত করবার প্রয়াস যে কার্যত ব্যর্থ হয়েছিল তা ঐতিহাসিক সত্য। বঙ্গভাষীদের জনজীবনে তাঁর প্রভাব ক্ষয়ে যেতে যেতে মৃত্যুর মাত্র একশ আটাশ বছরের মধ্যে প্রায় শূন্যে এসে ঠেকেছে। কাব্য বা সঙ্গীতের জন্য রবীন্দ্রনাথ নজরুল, ধর্মভাবনার কারণে চৈতন্য বিবেকানন্দ, গল্পকার শরৎ বিভূতি আমাদের নিত্যদিনের অনুশীলন, আহ্লাদ। এঁরা আমাদের প্রাণের কাছাকাছি থাকা মানুষ, এমনকি প্রিয় গায়ক নায়ক অথবা ক্রিকেটারের তুলনাতেও এঁরা বোধকরি খুব দূরের নয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আমাদের মনের মানুষ নন, আমরা তাঁকে ঠাই দিয়েছি মাথার ওপরে, সহজ নাগালের বাইরে। ভালবাসা বা আত্মীয়তার বদলে আমরা তাঁর জন্য বরাদ্দ রেখেছি বাৎসরিক পূজার্চনার ফুল আর অসার ভক্তিময় গোলাকার স্তুতি। কেননা ভালবাসা বা আত্মীয়তার অনেক দায়, পূজা বা ভক্তির কোনও দায় নেই। তাঁর জন্মের এই দুশ’ বৎসর উপলক্ষ্যে রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষটিকে কল্পনা করতেও আমাদের ভয় করে, যেন সরাসরি মধ্যাহ্নের রোদ্রের দিকে তাকানো। তাঁকে তো ভুলে থাকবার বা অস্বীকার করার যো নেই আমাদের, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তাঁর উপস্থিতি সহ্য করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তাঁর মর্মর মূর্তি বানিয়ে মালা পরিয়ে দেওয়া বরং অনেক সহজ সমাধান। একটা প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন মনের মধ্যে জেগে ওঠে--আজ দুশ’ বছরের ব্যবধানে ঈশ্বরচন্দ্র যদি পুনরায় এই দেশে আবির্ভূত হয়ে নিজের মুদ্রাদোষে ‘সৃষ্টিছাড়া’ সব সংস্কার কর্মে মেতে ওঠেন তাহলে আমাদের সমাজে মহামান্য রাধাকান্ত দেবের খুব অভাব পড়বে কি?


সহায়ক গ্রন্থপঞ্জী

  1. বাংলা সাহিত্যে বিদ্যাসাগর/ অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। দে'জ পাবলিশিং 
  2. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ/ বদরুদ্দিন উমর। চিরায়ত প্রকাশন
  3. বিদ্যাসাগর/ চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। আনন্দধারা
  4. বিদ্যাসাগর/ বিহারিলাল সরকার। ওরিয়েন্ট বুক
  5. বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ/ বিনয় ঘোষ। বেঙ্গল পাবলিশার্স
  6. করুণাসাগর বিদ্যাসাগর/ ইন্দ্রমিত্র। আনন্দ পাবলিশার্স
  7. কবিতীর্থ পত্রিকার ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ সংখ্যা (জুন ২০১৮)/ উৎপল ভট্টাচার্য সম্পাদিত
  8. জিজ্ঞাসা পত্রিকার ‘বিদ্যাসাগর বিশেষ সংখ্যা’ (একত্রিংশ বর্ষ, তৃতীয়-চতুর্থ সংখ্যা, ২০১৩ - ২০১৪)/ স্বরাজ সেনগুপ্ত সম্পাদিত