Showing posts with label আধুনিক কবিতা. Show all posts
Showing posts with label আধুনিক কবিতা. Show all posts

Thursday, September 3, 2020

ক্ষোভের বাগান

 

Painting by Harpreet Singh









যশস্বিনী শুভ্রবাস গম্ভীর বড়োদিদিমণি

নিবেদিতা গার্লস

বকুল-ছাতিমে ঢাকা নিবিড় ছায়ার তপোবন

শ্যাওলা-শীতল

সারাদিন পাঠদান, অনুশীলনের শৃঙ্খলা

সকালে রেওয়াজ

নিয়মের তীক্ষ্ণধার, মা-বাবার সুখতন্দ্রাবেশ

পাষাণী আগল

চারপাশে সুনামের সুউচ্চ প্রাকার, উড়ে আসে

সাইকেলের বেল

কখনো উচ্ছল হাসি, এ ওর শরীরে ভেঙ্গে পড়ে

ভীরু রোদ্দুর

অনাহত বক্ষগুলি প্রথম পাতার মতো উদ্ভিদের

অধীর সবুজ

সমস্ত বাগান জুড়ে বর্ণময় লতা-ঝোপঝাড়

পোকা প্রজাপতি

কেবল মালীটি অন্ধ, চোখে কালো চশমা তার

নিঃসাড় দেহ।

 

প্রতিটি যত্নের ফাঁকে, প্রতিটি বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে

হিম অভিমান

গরবিনি বিদ্যালয়, দিনে দিনে পূর্ণ হয়ে ওঠে

ক্ষোভের বাগান।


Saturday, March 21, 2020

প্রফুল্ল পাল: একজন পরিচিত অপরিচয়ের কবি


দশকওয়ারি শ্রেণিবিভাগে প্রফুল্ল পাল গত শতকের সাতের দশকের একজন কবি। তিনি স্বভাবকবি নন, বাঙালি হিসেবে তাঁর কাব্য রচনার সূচনা কিছুটা বিলম্বেই। প্রথাগত শিক্ষায় বেশ খানিক অগ্রসর হবার পরই তাঁর কবিতাচর্চার হাতেখড়ি। কিশোরবেলার কোনও অস্ফুট অপরিণত প্রেম ও তজ্জনিত হাহাকার ও দীর্ঘশ্বাস থেকে যে তিনি কবিতা রচনায় অনুপ্রাণিত হননি সেকথা প্রমাণ সহকারেই পেস করা যায়। কেননা কবিতা মুসাবিদা করার আগেই তিনি সাফল্যের সঙ্গে প্রেম প্রণয় এবং পরিণয়ের ব্যাপারটি সংঘটিত করে ফেলেন এবং তদুপরি তাঁর মাত্র এক থেকে দেড় শতাংশ কবিতাই কেবল প্রেমের। সত্তরের দারিদ্র্যপীড়িত গ্রামবাংলার এক নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর কবিতা লিখতে আসা এবং লেখালেখির জগতে প্রবেসের পরই বামপন্থী রাজনীতির প্রতি অনুরাগ ও পক্ষপাত। পরবর্তী কালে যে রাজনীতির অনপনেয় চিহ্ন মুদ্রিত হয়ে থাকবে তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে। স্বাভাবিক ভাবে, তাঁর ক্ষেত্রে স্বপ্নে পাওয়া বা ঘোরের মধ্যে কবিতা লিখে ফেলার কোনও গল্প থাকার কথা নয়। এবং নিজের প্রতিটি শব্দ বাক্য অনুচ্ছেদে তাঁর প্রশ্নাতীত কর্তৃত্ব।
          তিনি লোকপ্রিয় কবি নন। প্রথাগত ছন্দকে তিনি প্রায় পাকাপাকি ভাবেই নির্বাসন দিয়েছেন। তাছাড়া তিনি এপিক লেখেননি, গীতিকবিতা লেখেননি, প্রথাগত প্রেমের কবিতাও লেখেননি। তাঁর কবিতাগুলি প্রধানত গদ্যময় ও পুরুষালি, সচেতন শব্দচয়নে তাঁর বাক্যগুলি উচ্চাবচ, আকৃতিগত দিক থেকে রচনাগুলি লাবন্যবর্জিত এবং মজবুত। অদ্যাবধি তাঁর প্রায় বারোটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যাও কম নয়। অর্থাৎ কবি হিসেবে তিনি স্বল্পপ্রজ নন। প্রায় সমস্ত মান্য ছোটকাগজ ও কিছু বাণিজ্যিক কাগজেও তাঁর রচনা নিয়মিত দেখতে পাওয়া যায়। সুতরাং বলা চলে বাংলা কবিতার লেখক পাঠক অনুরাগী কারবারি কারুর কাছেই তাঁর নামটি হয়ত খুব অপিরিচিত নয়। তবে তাঁর রচনার সঙ্গে কতজনের অন্তত অল্পবিস্তর আলাপ পরিচয় সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। অর্থাৎ, তিনি একজন পরিচিত অপরিচয়ের কবি।
          কমপক্ষে বারোটি কাব্যগ্রন্থ ও একটি গদ্যবই-এর লেখক তিনি। প্রথমজীবনে সম্পাদনা করেছেন “প্রতিবেশী” নামের একটি ছিমছাম ছোটকাগজ। তাঁর প্রথম দিককার একটি বই “যৌগিক পাতার রোদ”, মফস্বলের লেটার-প্রেসে ছাপা, কিন্তু প্রকাশনা পারিপাট্যের দিক থেকে সম্ভবত শ্রেষ্ঠতম। সে-বইয়ের প্রথম কবিতার প্রথম দুলাইন— “রোদ পড়েছে যৌগিক পাতায়/ প্রজাপতি শুঁয়োপোকা হতে চায় এইসময়”। এই পর্যন্ত পাঠ করে পাঠক অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেই পারেন, কেননা গড়পড়তা একজন কবিতা লিখিয়ের কাছ থেকে এমন রচনাই প্রত্যাশিত। আর প্রত্যাশিত জিনিস অনেকটা সুষম ধাপওলা সিঁড়ির মত, যেখানে প্রথম দুএকটি ধাপের পর না তাকিয়েও তরতর করে উঠে যাওয়া যায়। দীর্ঘদিন আধুনিক (জীবনানন্দোত্তর) কবিতাচর্চার ধারা বয়ে আসার পর বর্ণনার কিছু কিছু স্টাইল উপমা ব্যবহারের কিছু কিছু ধরণ একজন সাধারণ কবির কাছে আহারনিদ্রামৈথুনের মত অভ্যাসে পরিণত হয়, একই ঘটনা ঘটে পাঠকের ক্ষেত্রেও। এই তন্দ্রা উদ্রেককারী শান্তিপূর্ণ অবস্থা টালমাটাল হয়ে পড়ে কিছু একটা বিজাতীয় ঘটনা যদি ঘটে যায় আচমকা। প্রফুল্ল পাল তেমনই এক কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেন কবিতাটির তৃতীয় লাইনে— “ক্লোরোফিল থিকথিক করছে কফ ও থুতুতে”। পাঠকের প্রত্যাশিত মসৃণ যাত্রা এইখানে এসে ধাক্কা খেয়ে যায়। এবং তিনি বিরক্ত হয়ে অথবা খুশি হয়েই নড়েচড়ে বসেন। তাহলে বোঝা যাচ্ছে এই কবি খুব মিষ্টি নম্র স্বরে পেলব মসৃণ মনভোলানো কথা শোনানোর জন্য কবিতা লিখতে আসেন নি। তিনি সেই বিশেষ (বক্স অফিসের বিচারে ফ্লপ) ধারাটির একজন কর্মী একসময় যার শিরোমণি ছিলেন “খোয়াবনামা”-র আখতারুজ্জামান। রচনার আনাচকানাচে অপ্রীতিকর, কর্কশ, নিষ্ঠুর এবং ভালগার বাক্য বা শব্দবন্ধ গুঁজে দেওয়ার প্রবণতা প্রফুল্ল পালের একটি অব্যর্থ পরিচয়।
তাঁর কবিতা উচ্ছাসহীন। এ তাঁর মুদ্রাদোষ নাকি সচেতন চেষ্টার ফল তা গবেষণা সাপেক্ষ, তবে গুনটি তাঁকে সমসময়ের অন্য কবিদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। সম্মুখে কাল্পনিক পাঠককে বসিয়ে রেখে সেই পাঠকের আহ্লাদী মন যুগিয়ে কবিতা রচনা যে তাঁর কম্ম নয় তা বোঝা যায় প্রকাশিত বইগুলি পাঠ করলে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আবেগ তাঁর কোনও লেখাতেই নেই। যা বলার তা সরাসরি সপাট গদ্যের আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। সাত বা আটের জনপ্রিয় কবিদের সফল ফর্মুলাগুলিকে সযত্নে এড়িয়ে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব লিখন ভঙ্গিমা। বিশিষ্ট গদ্যকার কিন্নর রায় একবার বলেছিলেন প্রফুল্ল পাল একজন আদ্যন্ত নাগরিক কবি। হ্যাঁ এটিও তাঁর এক বিশেষ পরিচয়। জন্ম ও কর্মসূত্রে এতগুলি বছর গ্রাম-মফস্বলে কাটিয়েও তাঁর কবিতা গ্রাম্যতা বর্জিত। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতায় ঝকঝকে স্মার্ট গদ্যের সমাহার। বাণিজ্যিক পত্রপত্রিকার পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা জনপ্রিয় কাব্যধারাটির বাইরে বেশ কিছু ছোটকাগজ, এবং ছোটকাগজের বেশ কয়েকজন ডেডিকেটেড কবির একাগ্র পরিশ্রমে যে একটি (নাকি কয়েকটি?) প্যারালাল ‘কবিতাস্কুলে’-র সূচনা হয়েছে তিনি সেই ক্যাম্পাসেরই একজন। পাঠকপ্রিয় হওয়ার যে কবিজনোচিত স্বাভাবিক প্রবণতা- তার প্রতি একবগ্‌গা বিদ্বেষমূলক অবস্থানই প্রফুল্ল পাল ও তাঁর সহচর কবিদের শ্রেণিচরিত্র।
২০০০ সালে প্রকাশিত বই “সবুজ আলোর জল”, যার কবিতাগুলি রচিত হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ এর মধ্যে, সেখানে একটি নিরীহ কবিতায় একটি সাংঘাতিক লাইন দেখতে পাই আমরা— “.../বিশ্বস্ত কুমিরগুলির নিমিত্ত আজও খালকাটা হচ্ছে উদোম জ্যোৎস্নায়,/ প্রতি হাটবার তিন মাথার মোড়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সমাজ বদলের মুখস্ত বক্তৃতা, ...” এখানে বিশেষ করে খেয়াল করতে হবে লেখাটির রচনাকাল ও প্রকাশকাল। কর্তা খেপানো এমন বেয়াড়া লাইন লিখতে শুধু যে বুকের পাটা লাগে তাই নয় প্রয়োজন হয় এক নির্মোহ নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তথা দূরদর্শিতার। মনে রাখতে হবে কবি বামপন্থী এবং তাই বাজার অর্থনীতির একজন তীব্র সমালোচক। এবং সেকারণেই বামা ভাবাদর্শের শামিয়ানার ভেতর কুমিরদের আনাগোনা তাঁর নজর এড়িয়ে যায় নি। পরিতাপের বিষয়—শাসন ক্ষমতার হাতবদল হলেও জনজীবনে সেই কুমিরগুলি আজও বহাল-তবিয়ৎ। আরও লক্ষ্যনীয় ‘মুখস্ত’ শব্দটি। এই একটি মাত্র শব্দ তার গর্ভে তামাম পৃথিবীর বাম রজনীতির ব্যর্থতার ইতিহাস ও তার সম্ভাব্য কারণসমূহ ধারণ করে আছে। অসম্ভব শক্তিশালী এরকম অজস্র পঙক্তি ছড়িয়ে আছে প্রফুল্ল পালের কাব্য সংকলন গুলিতে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় তিনি সাধারণ পাঠাভ্যাসের খাসতালুক থেকে কিছুটা দূরে তাঁর কবিতার জগত নির্মাণ করেছেন বলে তা অবহেলিত ও নির্জন।
আরেকটি সুশ্রী বই “উৎসর্গপত্রের নীরবতা”-য় (২০০০) ‘শুকনোপাতা উড়ে যায়’, ‘মাটির কথা’, ‘আখমাড়াই মেসিন’, ‘বুথদখলের কোলাহল এড়িয়ে’, ‘নগরপত্তনের প্রশ্নমালা’-র মত অসাধারণ কিছু কবিতার দেখা মেলে। এই বইয়েরই একটি কবিতায় আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই যখন কবি লেখেন— “সব কিছু বুঝে ওঠার আগেই জীবন শেষ হয়ে গেলে/ আরেক জীবনের জন্য আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যেতে থাকে,” তারপর, কয়েক লাইন পেরিয়ে- “ঝড় উঠলে ক্ষতিপূরণের কথা ভেবে ছুটে যাই,/ কমরেডরা প্রস্তুত থাকে লাল অভিনন্দনের জন্য”।
অতিসম্প্রতি প্রকাশিত (২০১৮) “গাধা” নাম্নী পুস্তিকাটির ৫ ক্রমাঙ্কের কবিতা যার নাম হতে পারত ‘মহাভারত’, পাঠ করে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত ‘মহাভারত’ কবিতাটির কথা মনে পড়বে। না, প্রভাবের কথা বলা হচ্ছে না, দুটি কবিতাই মহান এপিকটিকে পশ্চাৎপটে রেখে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছে ভারতবর্ষের সিল্যুয়েট, দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। এখানেও কয়েকটি চমকপ্রদ লাইন কিছুতেই ভোলা যায় না। “নিটোল কাহিনির কান্না মেশানো পরিণতি হোল রামায়ন/ .../ একটা লম্বা অন্ধদের মিছিল হোল মহাভারত।/ .../ ... হস্তিনাপুরসহ/ সমগ্র মহাভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতীক ছিল গাধা/ .../ পাণ্ডবের ছলচাতুরি আর কৌরবদের বোকা অহমিকায়/ এখনও কুরুক্ষেত্র অধ্যায় জুড়ে শোনা যায় গাধার অট্টহাসি/ ...।” সমগ্র কাবিতার ভরকেন্দ্র অবস্থান করে “পাণ্ডবের ছলচাতুরি আর কৌরবদের বোকা অহমিকা” এই বাক্যাংশটিতে, যা সেই মধ্যযুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কালে ভারতবর্ষের পরিচয় প্রদানকারী অসামান্য ন্যারেটিভ।
          ২০১০ এ প্রকাশিত “এবং বিষাদ” বইয়ের একটি কবিতায় তিনি লিখলেন— “কী করে বোঝাই শুধু বক্তৃতার জোরে ফসল ফলবে না/ একটার পর একটা আলোচনা শেষেও কৌশল ঠিক হল না আজও/ অর্থাৎ কৌশল করে করে যতদিন বেঁচে আছি তারই নাম জীবন/ ...” রাজ্যের জেলায়-জেলায়, শহরে-শহরে সমস্ত ঐতিহাসিক সমাবেশের উন্নয়নী সুভাষিত অথবা রেডিও প্রচারিত সাপ্তাহিক ‘মনের কথা’ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হতোদ্যম হয়ে পড়া মানুষের কাছে খুব প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে কবিতাটি। এই বইয়েরই অন্য একটি কবিতায় হঠাৎই এক আশ্চর্য অনুভুতির মুখোমুখি হই আমরা। ঠিক যেন উৎসবের শেষে ম্যারাপ খুলে ফেলার পরবর্তী নীরবতা এসে গ্রাস করে আমাদের। সামান্য মনখারাপ কিছুটা প্রশান্তির ভাব অথবা একটু হয়ত বিরতির পরিসর। “লিখে এবং বলে আর পারছি না/ তাই তোমার উদ্দ্যেশে পাঠালাম নীরবতা”
          “পাঠক” প্রকাশিত “সকালবাড়ি ও গগন” বইতে তিনি লিখছেন— “লিখতে লিখতে ঘুম এসে যায়/ কখনও-বা ঘুমের পাশেই শুয়ে থাকি একা একা জেগে/ আমি যে ঘরটিতে থাকি, সংলগ্ন থাকে আরও একজন/ মিথ্যে নয় আজ এই সূর্যাস্তসময়ে আমাদের ফারাক যোজন যোজন” এ এক অকপট স্বীকারোক্তির কবিতা। আবার এই কবিতাটির পাশেই রাখতে ইচ্ছে করে কয়েকবছর আগে প্রকাশিত “উটের গ্রীবায় শীতের ছায়া” কবিতার এই লাইনটি— “বিশ্বাস করুন এতদুর আসাটা বোধ হয় ঠিক হয় নি”। আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত গাছপালা পরিবেশ ছেড়ে খনিক দূরে সরে গিয়ে কবির এই ফিরে আসার আকুলতা। কবিতা মানেই তো আসলে কনফেসন, পেঁয়াজের খোসার মত নিরন্তর নিজেকে ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে বল্কলমুক্ত করে যাওয়া, নিজেকেই আবিষ্কারের লক্ষ্যে। কবি প্রফুল্ল পাল নিজেকে আবিষ্কার করেছেন, কিন্তু আমরা তাঁকে সময়মত খুঁজে নিতে পারিনি। প্রায় নীরবেই আজ তাঁর কবিতাচর্চার অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত।
লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রায় বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েও আমরা অনেকেই অনেকের কাছে কেবল মুখচেনা হয়ে থেকে যাই। তাদের কথাই একটু বেশি জানি যাদের চোখে পড়বার মত চেহারা অথবা যাদের দরাজ গলায় সুর আছে অথবা যাদের কর্মজীবনের সাফল্য অসাধারণ। কবিদের বেলাতেও তাই। প্রফুল্ল পাল একজন সাধারণ চেহারার সাধারণ কবি, যিনি ভিড়ের মধ্যে মিশে থেকেই স্বচ্ছন্দ বোধ করে এসেছেন জীবনভর। তাঁকে আমরা চিনি কিন্তু জানিনা। তাঁকে আমাদের এবার জানতেই হবে, নিরুপায় পাঠকের দায় নিয়েই তাঁর রচনার মুখোমুখি হতে হবে আমাদের। স্বল্পদৈর্ঘের এরকম একটি সামান্য রচনায় কোনও কবির পরিচয় দেওয়া প্রায় অসম্ভব। শুধুমাত্র তাঁর কবিসত্তার একটি ভাসাভাসা রেখাচিত্র আঁকবার চেষ্টা করা হয়েছে এখানে। আমাদের আশা- কোনও একদিন কবি প্রফুল্ল পালের রচনা নিশ্চয়ই সমর্থ হবে কোনও অগ্রণী পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে নিতে।

Friday, February 14, 2020

শিমুল-সরণি



সরকারি খরচে মস্ত স্টেডিয়াম বানানো হল
অথচ সম্ভাবনাময় একজন খেলোয়াড়ও উঠে এল না
ব্যাপারটা সেরকমই।

ফেব্রুয়ারি পড়েছে কি পড়েনি
একটি একটি করে কুঁড়ি ফাটছে শিমুলের
খড়গপুর থেকে কাঁসাই অবধি রেলপথের দুপাশে হাতে হাত-ধরা গাছের সারি।

যারা অঙ্কে ভালো তারা বর্ণান্ধ অথবা তাদের চোখে পাওয়ার
অন্যরা চোখ তুলে বাইরে তাকাবার ফুরসতই পাচ্ছে না।
আর কজন? যাত্রী তো মূলত এই দু-শ্রেণির

আশ্চর্য সময়ানুবর্তী শিমুল।
আসলে সবসময় পরিকাঠামোকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়
প্রকৃত প্রতিভাও চাই। 


Friday, January 24, 2020

পাপ

হেডমাস্টার দিলেন বিদ্যার দেবী গড়বার বরাত,
আর স্কুলের মুক্তমঞ্চে কুমোর যে মেয়েটিকে
জ্যোৎস্নার মত হালকা শুভ্র বসনে সাজিয়ে দিয়ে গেছে
তার বয়স পনেরো-ষোলোর বেশি নয়।
তখন ফেব্রুয়ারি মাস,
লাল সাইকেলে বাসন্তী প্রজাপতির মতো
ক্লাসরুম থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে তেত্রিশ ঝাঁক সরস্বতী।
ঠাকুর দেখতে এসে নাইন-টেন-ইলেভেনের ছাত্ররা
মনে মনে সবাই পাপ করে গেল,
সেই নির্দোষ পাপে পাঠের ভগ্নাংশ মনোযোগ
উড়ে গেল দামাল হাওয়ায়।

তাই কি দেবীকে শাস্তি, শোধ নিলেন অভিভাবকেরা?
সুযোগ মত মণ্ডপের বাইরে একা পেয়ে
দুচারজন প্রতিনিধি
রক্তাক্ত করে দেন ভারতীর অমল বসন—
মাধ্যমগুলি প্রায়ই সাতসকালে এমন খবর ফিরি করে।

Wednesday, October 2, 2019

তিনটি কবিতা
















উদারীকরণ

নতুন রং করা সাদা, কলেজ অফিস হাসপাতালে
সিঁড়ির দেয়ালগুলি দেখে সেই কিশোরীদের মুখ
মনে পড়ে যেতে পারে যারা অচিরেই
নির্মম হুড়কোয় বিদীর্ণ হবে।
এখন মুক্ত বিশ্ব, বুলাদি বোঝেন
পানের দোকানগুলি নিষিদ্ধ করা হাস্যকর এবং কঠিন।
তার চেয়ে সহজ—
বরাত দিয়ে সোনাগাছি থেকে
প্রচুর পিক্‌-দান আনা হোক
রাখা হোক গোলাপ-টবের পাশে পাশে।

ভাড়া করা পালা

কম বয়সে আমরা একটি যাত্রাদল করেছিলাম
পার্টিতে ঢুকবার পর সে-দল ভেঙে গেল,
তারাপদ বিবেকের গান গাইত
পার্টির লোকজন হাটের মাঝখানে তার ছেলের
মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে
বাধা দিতে পারিনি,
পূর্ণেন্দুবাবুকে ঘায়ের মত ঘৃণা করি
তবু ঠিক পালে মিশে গিয়ে
তার সঙ্গে মিছিলেও কদম মেলাই।

এখন বছরে একবার বাইরে থেকে যাত্রাদল আসে গ্রামে
ভাড়া করা পালা শুনি,
কথায় বলে—
কেনা চালের ভাতে চাষিদের পেট ভরে না।


















১৭ অঘ্রাণ ১৪০৮

সাতদিন পদার্থ বিজ্ঞান।

ঘেউ ঘেউ করতে করতে বনবাদাড়ে এক চক্কর ঘুরে আসবার পর
মাল-বাহক গাড়ির জোয়ালে কাঁধ দিতে হল। ফিরবার পথে
ঝামেলা। অন্য একটা পাঁঠার সঙ্গে হয়ে গেল এক হাত। তারপর
ঘাস চিবোতে চিবোতে পুকুরের দিকে গেলাম। জল খেয়ে ফিরছি,
সামনেই—উহ্‌, কী ভয়ংকর! আলের পাশে মুখ লুকিয়েছি।
ভয় সরে যাবার পর গুচ্ছ গুচ্ছ ধান বইছিলাম লম্বা সুড়ঙ্গ বেয়ে
ভাঁড়ারের দিকে।

অর্ণবদা’ কবিতা চাইলেন। আমি হাতের ধান ফেলে, ঠোঁটের
মাছ ফেলে, ঝগড়া ফেলে, ঘেউ ঘেউ ফেলে, হারিয়ে যাওয়া ডানা
দুটি খুঁজে বার করে ঊর্দ্ধশ্বাসে উড়তে উড়তে ইউক্যালিপটাসের
মগডালে উঠে এলাম। এখন মুদ্রাদোষে ডানা দুটি আবার হারিয়ে
ফেলার আগে অবধি নিজের সাধ্যমত এই নিচুর নীলে খানিকক্ষণ
উড়ান দিতে পারব।

(কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছিল "মাটির থিওরি" কাব্যগ্রন্থে, ২০০৯ সালে। তারও আগে প্রথম কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল "কবিতা সীমান্ত" পত্রিকায় আর তৃতীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল অর্ণব পণ্ডা সম্পাদিত "রৌদ্র-ছায়া"তে। দ্বিতীয়টির কথা মনে নেই।)