Friday, February 14, 2020

শিমুল-সরণি



সরকারি খরচে মস্ত স্টেডিয়াম বানানো হল
অথচ সম্ভাবনাময় একজন খেলোয়াড়ও উঠে এল না
ব্যাপারটা সেরকমই।

ফেব্রুয়ারি পড়েছে কি পড়েনি
একটি একটি করে কুঁড়ি ফাটছে শিমুলের
খড়গপুর থেকে কাঁসাই অবধি রেলপথের দুপাশে হাতে হাত-ধরা গাছের সারি।

যারা অঙ্কে ভালো তারা বর্ণান্ধ অথবা তাদের চোখে পাওয়ার
অন্যরা চোখ তুলে বাইরে তাকাবার ফুরসতই পাচ্ছে না।
আর কজন? যাত্রী তো মূলত এই দু-শ্রেণির

আশ্চর্য সময়ানুবর্তী শিমুল।
আসলে সবসময় পরিকাঠামোকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়
প্রকৃত প্রতিভাও চাই। 


Friday, January 24, 2020

পাপ

হেডমাস্টার দিলেন বিদ্যার দেবী গড়বার বরাত,
আর স্কুলের মুক্তমঞ্চে কুমোর যে মেয়েটিকে
জ্যোৎস্নার মত হালকা শুভ্র বসনে সাজিয়ে দিয়ে গেছে
তার বয়স পনেরো-ষোলোর বেশি নয়।
তখন ফেব্রুয়ারি মাস,
লাল সাইকেলে বাসন্তী প্রজাপতির মতো
ক্লাসরুম থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে তেত্রিশ ঝাঁক সরস্বতী।
ঠাকুর দেখতে এসে নাইন-টেন-ইলেভেনের ছাত্ররা
মনে মনে সবাই পাপ করে গেল,
সেই নির্দোষ পাপে পাঠের ভগ্নাংশ মনোযোগ
উড়ে গেল দামাল হাওয়ায়।

তাই কি দেবীকে শাস্তি, শোধ নিলেন অভিভাবকেরা?
সুযোগ মত মণ্ডপের বাইরে একা পেয়ে
দুচারজন প্রতিনিধি
রক্তাক্ত করে দেন ভারতীর অমল বসন—
মাধ্যমগুলি প্রায়ই সাতসকালে এমন খবর ফিরি করে।

Saturday, October 19, 2019

দুটি কবিতা








কবিতার কাগজের জন্য

কবিতার কাগজের জন্য মৃত নীল ধোঁয়া
পোড়া সলতে, তেল-শূন্য মাটির প্রদীপ
অর্থাৎ আলো নয়, আলোর স্মারক।

আমার বুকের সূর্য, আলোকিত ক্ষণটুকু,
কাল মুছে দেয়া নেশা, মুহূর্তের ব্রহ্ম ছুঁয়ে আসা—

এইসব কীকরে পাঠাই!












খামারবাড়িতে


আঙিনায় হেলাফেলা শব্দ পড়ে থাকে।

নক্ষত্রকুচির মত সেই সব, খুঁটে আনতে গিয়ে
শব্দরত্ন-উদাসীন গৃহস্বামীর সঙ্গে দেখা।

তাঁকে দেখে দ্বিধাগ্রস্ত, কী প্রার্থনা করি—
শব্দভিক্ষা না কি তাঁর সিংহাসনখানি!

Tuesday, October 15, 2019

বিকেলের শিলাবতী



দুদিকের জনপদ থেকে কত যে কলস
বেড়াতে বেরোল আজ বিকেলবেলায়

ঘাটালের মফস্‌সল সম্পূর্ণ আড়াল হয়ে
কলসিতে জলের শব্দ শোনা যায় ছলক ছলক

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিলাবতী পিত্তল আধারে বন্দি হয়ে
নিরন্তর ঢেউ তোলে, উছলে পড়তে চায়

বন্যার উল্লাসে নদী ঢুকল প্লাবনভূমিতে
বিকেলে শ্রাবণ নামল এ নদীর বুকের ওপর


গ্রীষ্ম, ২০০১
প্রথম প্রকাশ – “মাটির থিওরি”, ২০০৯

Monday, October 14, 2019

ওহ্ ইসমাইল, তুমি তাকে বোঝাও



মির জালাল (Mir Cəlal Paşayev, 1908-78)


শোনা যায়, উৎকোচ আদানপ্রদান রোধে নানা ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। সেটা কিছুটা সত্যিও বটে। এখন সমস্যা হল—উৎকোচের সংজ্ঞা ও সীমা নির্ধারণ করা। উৎকোচ হল কোনও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীর দাবি যা নীতিসংগত নয়। আমি চাহিদামত কিছু অর্থ দিলাম আর তিনি আমার কোনও একটা কাজ করে দিলেন (আইনের বাধা এড়িয়ে), উৎকোচ বলতে কি কেবল এই?
          অন্য একধরণের উদাহরণও আছে, আমার হয়তো কোনও মন্ত্রী বা আমলার সঙ্গে বিশেষ জানাচেনা, বাড়িতে কোনও বিশেষ ভোজ হলে আমি তাঁকে ডিনারে নেমন্তন্ন করলাম। এক শ্রেণির পণ্ডিত বলেন, এ এক ভিন্ন প্রকারের হারামি। অর্থের বদলে এখানে বস্তু বা সেবার বিনিময় ঘটছে।

[দুদিকে দুই অন্ধ, গোঁড়া ইসলামি রাষ্ট্র ইরান আর কমিউনিস্ট শাসন-ধন্য সোভিয়েত; দুদিকে দুই উদ্দত থাবা, সংক্রামক ধর্মীয় গোঁড়ামি আর দীর্ঘ-দীর্ঘকাল সম্পাদনাহীন স্থবির একটি বিশালবপু রাজনৈতিক মতবাদ। মাঝখানে তৈলভাণ্ডারে সমৃদ্ধ এবং সামরিক ও রাজনৈতিক ভাবে প্রায় নির্বল একটি ভূখণ্ড। যেন প্রাণভয়ে প্রহর গুণতে থাকা একটি খরগোশ। সহজ কথায় এই হল আজারবাইজানের ইতিহাস। দেশটির ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বহু গভীরে শেকড় চারিয়ে দিয়েছে রুশ ও ইরানি প্রভাব। অথচ কী আশ্চর্য, কামারশালায় অত্যন্ত অসহায় ভাবে হাতুড়ির ঘায়ে নতুন আকার পেতে থাকা লৌহপিণ্ড থেকে ছিটকে ওঠা এক একটি লৌহকণিকার মত প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে রয়েছে আজেরি সাহিত্যে ও শিল্পে।
          মির জালাল পাসাইয়েভ (Mir Cəlal Paşayev)-এর জন্ম ২৬ এপ্রিল ১৯০৮ ইরানে এবং মৃত্যু বাকু শহরে ১৯৭৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর। তাঁর লেখালেখির নাম ‘মির জালাল’ সাহিত্যে জগতে অধিক পরিচিত। ছাত্রজীবনেই মির জালালের লেখালেখির হাতেখড়ি, সংবাদপত্রের ফিচার লিখে তাঁর সাহিত্য রচনার শুরুয়াত।
মূল আজেরি থেকে ইংরেজি অনুবাদ – বেটি ব্লেয়ার]


Thursday, October 3, 2019

আষাঢ় ও মা-মুদ্রা




















আষাঢ়

বিপুল শ্যামল বক্ষ
স্নেহভার নত হয়ে আসে,
নিষেক-উত্তর ছায়া।

ব্যথায় অধীর বৃন্ত
গর্ভে নবীন ওষ্ঠ
খুব ধীরে বিকশিত হয়।

পৃথিবী প্রমাণ ভাণ্ড,
চরাচর মুছে দিয়ে
স্বচ্ছ অমৃত ঝরে পড়ে।

শিশুর অমূল্য পুষ্টি,
ঈষৎ ঘর্ষণে বজ্র
রমণের তন্দ্রা ছিঁড়ে যায়।




















মা-মুদ্রা

বসে আছ,
অগ্নিময় বক্ষ পার হয়ে
অলীক শীতল ছায়া—
এত স্নেহ ঊরুতে উদরে
দুচোখ আচ্ছন্ন হল
রচিত হয়েছে স্নিগ্ধ কোল।
অভ্যস্ত প্লাবন মুছে, আজ দেখি
শান্ত পলি-চর,
ওই তৃণে একদিন আমার সন্তান
নতুন আকাশ পাবে
হাওয়া জল মাটি,
স্বপ্নে ভাবি।


(মাটির থিওরি, ২০০৯)

Wednesday, October 2, 2019

তিনটি কবিতা
















উদারীকরণ

নতুন রং করা সাদা, কলেজ অফিস হাসপাতালে
সিঁড়ির দেয়ালগুলি দেখে সেই কিশোরীদের মুখ
মনে পড়ে যেতে পারে যারা অচিরেই
নির্মম হুড়কোয় বিদীর্ণ হবে।
এখন মুক্ত বিশ্ব, বুলাদি বোঝেন
পানের দোকানগুলি নিষিদ্ধ করা হাস্যকর এবং কঠিন।
তার চেয়ে সহজ—
বরাত দিয়ে সোনাগাছি থেকে
প্রচুর পিক্‌-দান আনা হোক
রাখা হোক গোলাপ-টবের পাশে পাশে।

ভাড়া করা পালা

কম বয়সে আমরা একটি যাত্রাদল করেছিলাম
পার্টিতে ঢুকবার পর সে-দল ভেঙে গেল,
তারাপদ বিবেকের গান গাইত
পার্টির লোকজন হাটের মাঝখানে তার ছেলের
মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে
বাধা দিতে পারিনি,
পূর্ণেন্দুবাবুকে ঘায়ের মত ঘৃণা করি
তবু ঠিক পালে মিশে গিয়ে
তার সঙ্গে মিছিলেও কদম মেলাই।

এখন বছরে একবার বাইরে থেকে যাত্রাদল আসে গ্রামে
ভাড়া করা পালা শুনি,
কথায় বলে—
কেনা চালের ভাতে চাষিদের পেট ভরে না।


















১৭ অঘ্রাণ ১৪০৮

সাতদিন পদার্থ বিজ্ঞান।

ঘেউ ঘেউ করতে করতে বনবাদাড়ে এক চক্কর ঘুরে আসবার পর
মাল-বাহক গাড়ির জোয়ালে কাঁধ দিতে হল। ফিরবার পথে
ঝামেলা। অন্য একটা পাঁঠার সঙ্গে হয়ে গেল এক হাত। তারপর
ঘাস চিবোতে চিবোতে পুকুরের দিকে গেলাম। জল খেয়ে ফিরছি,
সামনেই—উহ্‌, কী ভয়ংকর! আলের পাশে মুখ লুকিয়েছি।
ভয় সরে যাবার পর গুচ্ছ গুচ্ছ ধান বইছিলাম লম্বা সুড়ঙ্গ বেয়ে
ভাঁড়ারের দিকে।

অর্ণবদা’ কবিতা চাইলেন। আমি হাতের ধান ফেলে, ঠোঁটের
মাছ ফেলে, ঝগড়া ফেলে, ঘেউ ঘেউ ফেলে, হারিয়ে যাওয়া ডানা
দুটি খুঁজে বার করে ঊর্দ্ধশ্বাসে উড়তে উড়তে ইউক্যালিপটাসের
মগডালে উঠে এলাম। এখন মুদ্রাদোষে ডানা দুটি আবার হারিয়ে
ফেলার আগে অবধি নিজের সাধ্যমত এই নিচুর নীলে খানিকক্ষণ
উড়ান দিতে পারব।

(কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছিল "মাটির থিওরি" কাব্যগ্রন্থে, ২০০৯ সালে। তারও আগে প্রথম কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল "কবিতা সীমান্ত" পত্রিকায় আর তৃতীয়টি প্রকাশিত হয়েছিল অর্ণব পণ্ডা সম্পাদিত "রৌদ্র-ছায়া"তে। দ্বিতীয়টির কথা মনে নেই।)